বাড়ি রাজনীতি *আওয়ামী লীগ পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসছে* 

*আওয়ামী লীগ পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসছে* 

তিন উপনির্বাচনে পরিবারের কেউ মনোনয়ন পাননি বিগত উপনির্বাচনেও প্রার্থী ছিলেন পরিবারের বাইরে

8
*আওয়ামী লীগ পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসছে* 

*দলের ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে। এর আগে দলের মনোনয়নে এমপি পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়া হলেও এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসছে ক্ষমতাসীন দলটি।*

*গতকাল তিনটি উপনির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব আসনে প্রয়াত এমপিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্ত্রী, ভাইসহ অনেকেই মনোনয়ন চাইলেও শেষ পর্যন্ত কেউই পাননি। ঢাকা-১৪ আসনে আগা খান মিন্টু, সিলেট-৩ আসনে হাবিবুর রহমান, কুমিল্লা-৫ আসনে আবুল হাসেম খানকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটির সংসদীয় বোর্ড। তিনটি আসনেই দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ করছেন এমন ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনগুলোয়ও এমপি পরিবারের বাইরে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।*

*বিগত কয়েক বছর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মনোনয়নের ক্ষেত্রে যোগ্য ও পরীক্ষিতদের বদলে এমপি পরিবারের কাউকে বাছাই করা হয়েছে। পরিবারের যোগ্য কেউ না থাকলে অন্য কাউকে বেছে নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পরিবারকে প্রাধান্য দিয়ে মনোনয়ন দিতে হয়েছে। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যতগুলো উপনির্বাচন হয়েছে তার অধিকাংশতেই এমপি পরিবারের বাইরে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সকালে গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সংসদীয় বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটির সংসদীয় বোর্ডের এক সভায় এসব নেতাকে আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। বৈঠকে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদের, কাজী জাফরউল্লাহ, ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান প্রমুখ অংশ নেন।*

*আসলামুল হক আসলামের মৃত্যুর পর ঢাকা-১৪ আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। সিলেট-৩ আসন শূন্য হয় মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী ইন্তেকাল করায়। আর কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত আবদুল মতিন খসরু। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে এ তিন আসনের উপনির্বাচনে ২৮ জুলাই ভোট গ্রহণ হবে। অবশ্য এর আগে ১৪ জুলাই এ তিন আসনের উপনির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। পরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়।*

*উপনির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ৪ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বিক্রি করে। তিন আসনে ৯৪ জন দলীয় ফরম কেনেন। এর মধ্যে তৃণমূল নেতা, কেন্দ্রীয় নেতা, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীরাও ছিলেন। তবে শুরু থেকেই দলের মধ্যে আলোচনা ছিল, এবার তৃণমূল নেতারাই মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যেসব উপনির্বাচন হয়েছে এর বেশির ভাগেই দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা কিংবা উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা।*

*বৈঠকের সূত্রগুলো জানান, তিন আসনের উপনির্বাচনে ৯৪ জন প্রার্থী থাকলেও বৈঠকে শুধু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা হয়। তিনটি আসনেই প্রয়াত এমপি পরিবারের সদস্যরা আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও দীর্ঘদিন ধরে দল করছেন এমন নেতাদের পক্ষেই সমর্থন দেন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা। দলের নেতাদের মূল্যায়ন হলে সংগঠন শক্তিশালী হয় বলেও আলোচনা হয়।*

*সূত্রমতে ঢাকা-১৪ আসনে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঢাকার আদি বাসিন্দা ও শাহ আলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আগা খান মিন্টুর প্রতি সমর্থন জানান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আগা খান মিন্টু স্বাধীনতার আগে মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।*

*সিলেট-৩ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাবিবুর রহমানকে বেছে নেন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা। হাবিবুর রহমান আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনপ্রবাসী হলেও রাজনীতিতে সক্রিয়। লন্ডন ও সিলেটে নিয়মিত দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। প্রার্থী হওয়ার আগে তিনি যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট সারেন্ডার করে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েছেন। এসব বিষয় বৈঠকে আলোচনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা তাঁকেই প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেন।*

*সূত্রগুলো জানান, কুমিল্লা-৫ আসনে বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসেম খানকে প্রার্থী মনোনীত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিন ধরে দল করার বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর আগে তিনি বুড়িচং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেলেও দলের একটি অংশের বিরোধিতার কারনে নির্বাচিত হতে পারেননি। এ বিষয়টিও মনোনয়ন বোর্ডের সভায় ওঠে। পরে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা দলের পুরনো এই নেতাকে মূল্যায়ন করার পক্ষে সমর্থন দেন।*

*সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাবনা-৪, ঢাকা-৫, নওগাঁ-৬, ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী করা হয় যথাক্রমে নুরুজ্জামান বিশ্বাস, কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, আনোয়ার হোসেন হেলাল ও হাবিব হাসানকে। পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী) আসনে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ২৪ বছর আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন মরহুম শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। গত বছরের ২ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করায় আসনটি শূন্য হয়। এ আসনে মনোনয়ন পান পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ঈশ্বরদী উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস। যদিও ডিলুর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, জামাইসহ পরিবারের আটজন সদস্য মনোনয়ন চেয়েছিলেন।*

*রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলী থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা পাঁচবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান হাবিবুর রহমান মোল্লা। চারবার তিনি জয়ী হন। তাঁর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু। আসনটিতে মোল্লার ছেলে ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল মনোনয়নের দাবিদার ছিলেন।*

*নওগাঁ-৬ আসনে তিনবারের সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম। এ উপনির্বাচনে ইসরাফিল আলমের স্ত্রী সুলতানা পারভীন মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়ন পাওয়া আনোয়ার হোসেন হেলাল বিগত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন।*

*ঢাকা-১৮ আসনে মনোনয়ন পাওয়া হাবিব হাসান ঢাকা মহানগরী উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক। শূন্য হওয়া এ আসনটিতে সাহারা খাতুনের ভাতিজা আনিসুর রহমান, ভাগনে মজিবুর রহমানসহ ৫৬ জন মনোনয়নপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত তারা মনোনয়ন পাননি।*

*এ ছাড়া এমপির মৃত্যুতে শূন্য হওয়া যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার। মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন এ আসনের এমপি ইসমত আরা সাদেকের কন্যা নওরীন সাদেক। গাইবান্ধা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হন কৃষক লীগ সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি। সাবেক এমপি ইউনুস আলী সরকারের ছেলে ড. ফয়সল ইউনুস মনোনয়ন চেয়েও পাননি। বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের উপনির্বাচনে এমপি হন আমিরুল আলম মিলন। সাবেক এমপি ডা. মোজাম্মেল হোসেনের পুত্রবধূ ইসমত আরা শিরিন চৌধুরী মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ২০১৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হকের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান বদরুদ্দোজা মো. ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম।*

*ফরিদপুর জেলা কমিটির ওপর ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা: ফরিদপুর জেলা কমিটির ওপর আবারও ক্ষুব্ধ হলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে জেলা সভাপতি সুবল সাহা ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হেসেনের মধ্যে বিরোধ চলছে। তাদের মিল না হলে প্রয়োজনে জেলা আওয়ামী লীগ কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। গতকাল গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এ নির্দেশ দেন সভানেত্রী। ওই জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে বসে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয় করার কথাও বলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। বিরোধ নিষ্পত্তি, সমন্বয় করার চেষ্টা বিফলে গেলে সিনিয়র সহসভাপতিকে আহ্বায়ক করে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করে দিতে বলেন তিনি।*

*করোনাকালে নির্বাচনের বিপক্ষে আওয়ামী লীগ: মনোনয়ন বোর্ডের সভায় করোনা পরিস্থিতিতে যে কোনো ধরনের নির্বাচন না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। পাশের দেশ ভারতের উদাহরণ টেনে মনোনয়ন বোর্ডের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনার সময় নির্বাচনের কারণেই ভারতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচন কমিশনের ওপর হস্তক্ষেপ করবেন না তাঁরা।*