প্রচ্ছদ স্পটলাইট বাংলাদেশকে আফগান বানানোর স্বপ্ন দেখেন মামুনুল হক

বাংলাদেশকে আফগান বানানোর স্বপ্ন দেখেন মামুনুল হক

128
বাংলাদেশকে আফগান বানানোর স্বপ্ন দেখেন মামুনুল হক

মামুনুল হক দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষ্য সকল ভাষ্কর্য ভেঙ্গে ফেলতে চান। স্বাধীনতা দিবসে বা বিজয় দিবসে এদের কখনো দেখা যায় না, অথচ এরাই কথায় কথায় হাজার মুসলমানের রক্তের উপর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের দোহাই দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরকালের ব্যাপারে অতিচিন্তায় থাকা মামুনুল হককে অতীতে কখনো তার নাম স্মরণ করতে দেখা যায়নি।
গতকাল রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা জটে পড়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে বলেন তিনি রাষ্ট্রপরিপন্থী কোন বক্তব্য দেননি। অথচ তার জনপ্রিয় একটি বক্তব্যে ড. জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবির, প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম এবং রাশেদ খান মেননকে নিয়ে মানহানিকর মন্তব্য করেছেন। মামুনুল হকের জনসভা থেকে “জিহাদ জিহাদ জিহাদ চাই, জিহাদ করে বাঁচতে চাই” স্লোগান ভেসে আসে। উনি নিজেও মাঝে মাঝে জিহাদের ডাক দেন। এই জিহাদ কিসের বিরুদ্ধে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে? দেশের কষ্টার্জিত গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে? মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরুদ্ধে? ইতিহাস বই উল্টালে পাওয়া যাবে ইয়াহিয়া খান প্রশাসনও ১৯৭১ সালে মুসলিম বিশ্বে জিহাদের কথা বলে সাহায্য চেয়েছিল।

এই বকধার্মিকদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নতুন কিছু নয়। উপমহাদেশের ইতিহাসে ধর্মীয় ফতোয়ার নামে ধর্মের অপব্যাখা শত বছর ধরে চলে আসছে। স্যার সৈয়দ আহমদ খান যখন সর্বভারতীয় মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে বললেন তখন তাকে এমনকি ‘ইসলামের শত্রু’ হিসেবে ফতোয়া দেয়া হল। তার হাত ধরে যে আলিগড় আন্দোলনের সূচনা তা পরবর্তীতে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গড়তে স্পষ্ট প্রভাব রেখেছে। আলীগড়ের ছাত্ররাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে যার ফলশ্রুতিতেই বাংলাদেশ সৃষ্টি।
ফতোয়াবাজেরা এখানেই থেমে থাকেনি, তারা ইংরেজি শিক্ষার বিরোধীতা করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, টেলিভিশন দেখা, ছবি তোলা যা কিছুই নতুন, বাস্তববাদীতার বিরোধী। তবে বিড়ম্বনা হল, পরবর্তীতে তারা গ্রহণ করেছে। সারা বিশ্বের বিস্ময়বস্তু স্মার্টফোন, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ব্যবহারে সমস্যা নেই, কিন্তু ভাস্কর্যে তাদের গাত্রদাহ। মামুনুল হকেরা প্রতিটা ভাষ্কর্য ভেঙ্গে ফেলতে চান।

যেমন সন্তান তেমনি তার পিতা, বিতর্কিত বক্তা মামুনুল হকের মতই তার পিতা আল্লামা আজিজুল হকের বক্তব্যও ছিল অশ্রাব্য। “আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান” এ শ্লোগান দিয়ে আফগানিস্থান-ফেরত একদল ৩০ এপ্রিল ১৯৯২ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঘোষনা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশ (হুজিবি)। যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মওলানা আব্দুস সালাম এবং অন্যান্যের কর্তা ব্যক্তিদের অন্যতম হিসেবে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকও ছিলেন। আল কায়েদার অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা।
খেলাফত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন আজিজুল হক। দলের লক্ষ্য ছিল ‘খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষে গণ আন্দোলন গড়ে তুলুন’। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে আহমেদ আব্দুল কাদেরের যুব শিবিবের সাথে মিলে হয় খেলাফতে মসলিশ। যা বর্তমান বিশ্বের প্রথা এবং বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী। মজার ব্যাপার ইরাক সিরিয়ার আই এসের লক্ষ্যও কিন্তু খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা।

জীবদ্দশায় এই আজিজুল নারীবাদী লেখিকা তাসলিমা নাসরিনকে প্রকাশ্যে নগ্ন করতে চাওয়া কিংবা জীবন্ত পুড়িয়ে মারার মত অদ্ভুত সব ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাই হতভাগী লেখিকা ভারতে পালিয়ে বেঁচে গেছেন। নারী নেতৃত্ব নিয়ে ওয়াজে ওয়াজে বিষেদগার করা আজিজুল হক শেখ হাসিনাকে ২০০০ সালে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ আখ্যা দেন। আবার ইসলামি ঐক্যজোটের ব্যানারে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি, জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশের সাথে চার দলীয় জোট গঠন করেন।
ভাষ্কর্য, মূর্তি আর প্রতিমার মাঝে তারা ইচ্ছাকৃত বিভেদ রেখা তুলে দিয়ে দেশের মাঝে বিভেদের দেয়াল দাড়া করিয়েছেন। আর যদি মূর্তিও হয় দেশে কি মূর্তিপূজারীরা থাকবেনা? বাংলাদেশ কি মূর্তিপুজারীদের দেশ নয়, তারা কি দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেনি। মৌলবাদীরা কি তাদের মূর্তির সাথে সাথে আইএসের জংগীদের মত গণহত্যা করতে চায়। ১৯৯৩ সালে, ২০০১ সালে ঐ শক্তিই দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি ধ্বংস করে বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিলো।

বাংলাদেশ এখন শক্ত অর্থনীতির ভিতের দাঁড়িয়ে, পদ্মাসেতুও প্রায় বাস্তবায়নের পথে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক থাকলে দেশজ প্রবৃদ্ধির বাড়বাড়ন্ত থাকবে এটাই বাস্তব। ঠিক এই মুহূর্তকেই বেঁছে নিয়েছে মধ্যযুগীয় গোষ্ঠী, কারণ এরপরে দেশের এগিয়ে যাওয়ার গতি এতটা বেড়ে যাবে, তাকে আর রোধ করা যাবে না। মামুনুল হকেরা আহমেদ ছফার আলী কেনানের মত, ফায়দা বুঝে মানুষের ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে চাষাবাদ করেন। আলী কেনান রাতের আঁধারে পালিয়েও যায়, পরিচয় গোপন করে নিজের সুসময়ের প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে।