প্রচ্ছদ জীবন-যাপন হাজী সেলিম খিলি পান বিক্রেতা থেকে শীর্ষ ধনী

হাজী সেলিম খিলি পান বিক্রেতা থেকে শীর্ষ ধনী

270
হাজী সেলিম খিলি পান বিক্রেতা থেকে শীর্ষ ধনী

রাজধানীর পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের সামান্য খিলি পান বিক্রেতা থেকে দেশের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম। তার উত্থান নিয়ে রয়েছে বহু গল্প। এসব গল্পের মধ্যে অন্ধকার অংশই বেশি। ভূমি দখল, দুর্বলদের সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে কেনা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন হাজী সেলিম।
গত সপ্তাহে তার ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর এরফান সেলিম নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে মারধর করে আলোচনায় আসেন। পরে র‌্যাব হাজী সেলিমের দেবীদাসঘাট লেনের বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখান থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও ওয়াকটকি উদ্ধার করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত এরফান সেলিমকে কারাদণ্ড দেন। এরপর শুরু হয় হাজী সেলিমের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাজী সেলিমের সম্পদের ব্যাপারে খোঁজ নেবে বলে জানিয়েছে।

হাজী সেলিমের কব্জা থেকে পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের ১৪ কাঠা জমি উদ্ধার করেছে অগ্রণী ব্যাংক। এখনও হাজী সেলিমের দখলে রয়েছে মিটফোর্ডে ভাওয়াল রাজার বিশাল সম্পতি। রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল। এসব সম্পত্তি উদ্ধারে তৎপর হয়ে উঠেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশ স্বাধীনের আগে থেকে সোয়ারীঘাট এলাকায় পান বিক্রি করতেন হাজী সেলিমের বাবা চান মিয়া ওরফে চান্দু। সংসারের হাল ধরতে বাবার সঙ্গে ব্যবসায় যুক্ত হন সেলিম। স্বাধীনতার পরও ওই ব্যবসা চলতে থাকে। পরে নিজেই খিলি পানের ব্যবসা শুরু করেন হাজী সেলিম। এরপর তারা সেভেন আপের এজেন্টশিপ নেন। একপর্যায়ে নিজেরাই সেভেন আপ নকল তৈরি শুরু করেন। বিষয়টি টের পেয়ে ওই সময় হাজী সেলিমের বাবা চান মিয়া ও বড় ভাই কায়েস মিয়াকে আটক করে পুলিশ। সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে সিমেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। বাদামতলী থেকে জমাটবাঁধা সিমেন্ট কিনে তা ক্র্যাস করে বিক্রি শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে সিমেন্ট কারখানা খুলেন। কিন্তু সিমেন্টের ব্যাগে বালি ও মাটি মিশিয়ে বাজারজাত করতে থাকে তার প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নিয়ে ওই সময় পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছিল।

তবে হাজী সেলিসের কিছু ভালো গুণও ছিল। সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতেন। এজন্য তার সাহসের প্রশংসাও ছিল। মাদকের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্ছার ছিলেন। এলাকার মাদক বিক্রেতাদের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ান হাজী সেলিম। এরপর বাদামতলী এলাকায় ফলের ব্যবসা শুরু করেন। পরে বাদামতলী, ওয়াইজঘাট, সদরঘাটের নিয়ন্ত্রণ নেন হাজী সেলিম। নব্বই দশকে হাজী সেলিম গাভী মার্কা প্রতীকে ওয়ার্ড কমিশনার পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করেন। পরেরবার তার স্ত্রী গুলশান আরাকেও ওয়ার্ড কমিশনার প্রার্থী করেন।
তবে প্রতাপশালী এ সংসদ সদস্য বর্তমানে বাকরুদ্ধ। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হাজী সেলিম ব্রেন স্ট্রোকজনিত সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু বাকশক্তি আর ফিরে পাননি। ফলে দৈনন্দিন কাজ-কর্ম, পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিশাল সাম্রাজ্য সবই ইশারা-ইঙ্গিতে পরিচালনা করছেন মদিনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজী সেলিম। এসব বিষয়ে তাকে সহায়তা করছেন বড় ছেলে সোলায়মান সেলিম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে হাজী সেলিম মদিনা ট্রেডিং করপোরেশন নামে সিমেন্টের ব্যবসা শুরু করেন। পুরান ঢাকার বাদামতলী ঘাটে বড় বার্জে তার সিমেন্ট বিদেশ থেকে আসত। তিনি ঘাটের পাশ থেকেই বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন। ১৯৯০ সালের দিকে তিনি বিএনপি নেতা মীর শওকতের হাত ধরে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর দুটি ওয়ার্ডে গরুর গাড়ি মার্কায় কমিশনার নির্বাচিত হন।
জানা গেছে, মদিনা গ্রুপের অধীনে রয়েছে মদিনা ট্রেডিং করপোরেশন প্রাইভেট লিমিটেড, মদিনা সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, মদিনা পলি ফাইবার লিমিটেড, মদিনা সিমেন্ট মিলস লিমিটেড, মদিনা মেরিটাইম লিমিটেড, মদিনা ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, মদিনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, মদিনা পাম্প অ্যান্ড ফাউন্ডি, মদিনা হিমাগার, মদিনা ফ্রটস লিমিটেড, ফ্লিট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বিসমিল্লাহ নেভিগেশন, এমএমআর (বাংলাদেশ), চাঁদ সরদার কোল্ড স্টোরেজ। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাজী সেলিম।

এছাড়া তিনি ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিদিন বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন। তবে কোথাও কোনো কথা বলছেন না। যে কোনো প্রয়োজনে ইশারা-ইঙ্গিত কিংবা কাগজে লিখে কর্ম সম্পাদন করছেন।
শুধু ১৪টি প্রতিষ্ঠানেই মালিক নন তিনি। এছাড়া তার রয়েছে শতাধিক বাড়ি, পেট্রোল পাম্প, পুরান ঢাকার নবাববাড়ীতে গুলশান আরা সিটি, চকবাজারে একাধিক মার্কেট, দেবীদাসঘাট ও সোয়ারীঘাটে রয়েছে চারটি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ননগোলায় দুটি ভবন, আরমানিটোলা এলাকায় এমটিসি টাওয়ার, পোস্তায় মদিনা টাওয়ার, মনিদা আশিক টাওয়ার, হাজী সেলিম টাওয়ার। তবে যেসব মার্কেটে দোকান ও ভবনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। তার অধিকাংশই তিনি পজিশন বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে। জানা গেছে, হাজী সেলিম বাদামতলী-বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি ও বাদামতলী ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হন। ঢাকার লালবাগ, হাজারী ও কামরাঙ্গীরচর থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকায় ভোটে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এরপর থেকে তার ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা সামনে এগিয়ে চলা আর থেমে থাকেনি। তবে ২০০১ সালে বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর কাছে স্বল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নেতা ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় হাজী সেলিমকে।
জানা গেছে, হাজী সেলিমের নাম শুনলে কিংবা তিনি যে এলাকা দিয়ে চলাচল করতেন, সেখানে মানুষ ভয়ে থাকতেন। কিন্তু তিনি বাকরুদ্ধ হওয়ার পর থেকে মানুষের মনে ভয়ভীতি কিছুটা কমে এসেছে। তবে তিনি আগের মতো সুস্থ-সবল রয়েছেনÑএমনটি বোঝাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন মাত্র।