প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় এমপি নিক্সনকে নিয়ে বিভক্ত আওয়ামী লীগ

এমপি নিক্সনকে নিয়ে বিভক্ত আওয়ামী লীগ

45
এমপি নিক্সনকে নিয়ে বিভক্ত আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশে এই মুহুর্তে সবচেয়ে আলোচিত নাম ফরিদপুরের এমপি নিক্সন চৌধুরী। ধর্ষণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় ফরিদপুরে প্রশাসন বনাম জনপ্রতিনিধির লড়াই। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করেছে। পাবলিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন সভা করে, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিচার দাবী করেছে। নিক্সন চৌধুরী অফিসিয়ালি আওয়ামী লীগের কেউ নন। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে, ২০১৮র ৩০ ডিসেম্বর তিনি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহকে পরাজিত করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে আওয়ামী লীগ না করলেও নিক্সন চৌধুরীকে আওয়ামী লীগ অস্বীকারও করতে পারেন না। নিক্সন চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আত্মীয়। জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ তার আপন ভাই। ফরিদপুর-৪ আসনের আওয়ামী লীগের মূল চালিকা শক্তি তিনি।

তাই আওয়ামী লীগ না হয়েও নিক্সন চৌধুরী আওয়ামী লীগার। তাই নিক্সনকে নিয়ে আওয়ামী লীগের মাথাব্যথা থাকতেই হবে। দুটো কারণে আওয়ামী লীগ তার বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারে না।
প্রথমত: আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। তাই একজন এমপির সঙ্গে একজন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তার বিরোধ এবং তা নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের আলটিমেটাম, ক্ষমতাসীন দলের জন্য অবশ্যই ভাবনার বিষয়।
দ্বিতীয়ত, নিক্সন চৌধুরী আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। আর একারণেই নিক্সন চৌধুরীকে নিয়ে চলমান ঘটনা প্রবাহে আওয়ামী লীগের অবস্থান কি, আওয়ামী লীগের নেতারা কি ভাবছেন, তা জানার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বিষয়টিকে ‘স্পর্শকাতর’ বলে আওয়ামী লীগের কোন নেতাই এসম্পর্কে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজী হননি।

কিন্তু নাম প্রকাশ না করার শর্তে, আওয়ামী লীগের নেতারা, নিক্সন ইস্যুতে পরস্পর বিরোধী মন্তব্য করেছেন। আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন ‘নিক্সন জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন তা অনাকাংখিত এবং দুর্ভাগ্যজনক। একজন জনপ্রতিনিধির কাছে এধরনের আচরন প্রত্যাশিত নয়। যে বাড়াবাড়ি করেছে এর ফলে মাঠ প্রশাসনে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্যই তার শাস্তি হওয়া দরকার।’ তিনি বলেন ‘এর ফলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে।’ কিন্ত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যে এব্যাপারে ভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে। ঐ প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেছেন ‘ঘটনার পর জেলা প্রশাসক এবং ইউএনও যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাতে মনে হচ্ছে ডাল মে কুছ কালা হায়।’ তার মতে ‘বিষয়টি নির্বাচন সংক্রান্ত। নির্বাচন কমিশন এনিয়ে মামলাও করেছে। কিন্তু এটাকে আমলারা একটি ইস্যু বানাচ্ছেন। এটাও তো ঠিক নয়।’ তিনি বলেন ‘নিক্সন ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে আমলারা বিরাজনীতিকরন প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন করছেন কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।’ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করেন, ঘটনা নিয়ে দুপক্ষই বাড়াবাড়ি করছে।

আমলাতন্ত্র কি ফ্রাক্রেনস্টাইনের দানব হয়ে উঠছে?
সরকারের নতুন মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আমলাতন্ত্র। আমলারা এখন যেন স্পর্শকাতর এক প্রেসার গ্রুপে পরিণত হয়েছে। কথায় কথায় আলটিমেটাম দিয়ে চাপ সৃষ্টির কৌশলে আমলারা এখন যেন সিবিএ নেতাকেও হার মানিয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের দ্বন্দ্ব এক পুরনো বিষয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই দ্বন্দ্ব জবাবদিহিতা তৈরী করে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু অনেক সময় এই দ্বন্দ্ব শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করে। যেমনটি হয়েছে ফরিদপুরে। এরকম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য আইন আছে, বিচার আছে। কিন্তু, আমলা এবং জনপ্রতিনিধিদের কেউ যদি এটাকে নিয়ে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেটি রাষ্ট্রের উপর অনাস্থার সামিল। এটি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের শৃংখলা বিধিরও লঙ্ঘন।

গত কিছু দিন ধরেই বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের বাড়বাড়ন্ত। অনেক আমলা এখন যেন আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, আমলাদের একটি অংশ আওয়ামী লীগার হওয়ার প্রতিযোগীতায় নামেন। এক আমলা, যিনি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আবেগঘন কবিতা লিখেছিলেন, তিনি তথ্য সচিব হন। তার কাব্যকাহিনী ফাঁস হয়ে গেলে তাকে সরে যেতে হয়। কিন্তু এসময় ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগ হয়ে যাওয়া আমলাদের এক মহামারী সৃষ্টি হয়েছিল। এই ধারা এখন আরো বেড়েছে। অথচ এটা হওয়াই উচিত ছিলো না। কারণ, আমলা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নন।

এরপর আমলাদের রাজনৈতিক আচরন বাড়তে থাকে। অনেক আমলা আওয়ামী লীগ কিভাবে চলবে, কমিটি কিভাবে হবে এসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে থাকেন। ২০০৮ এ আওয়ামী লীগ অপেক্ষাকৃত আনকোরা এবং নবীন মন্ত্রীসভার সুযোগে আমলাদের কর্তৃত্ব এ খবরদারি বেড়ে যায়। আমলারা আধা রাজনৈতিক চরিত্র ধারন করে, পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধির মতো সুবিধা গুলো হাতিয়ে দেন। সব স্বাধীন, স্বতন্ত্র এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গুলোতে নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অবসরের পর হয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, না হয় কোথাও চেয়ারম্যান, সদস্য ইত্যাদি প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় নামেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ব্যাংক গুলো এখন প্রাক্তন আমলাদের দখল। সরকারও আমলাদের ন্যায়-অন্যায় সব স্বাদ…আহ্লাদ মিটিয়ে ‘সন্তুষ্ট’ রাখার নীতি নেন। আমলারা পক্ষে থাকলে, সরকার নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারে এরকম একটি বিবেচনা থেকেই গত এক দশকে সরকার আমলা তোষণ নীতি নিয়েই এগুচ্ছে।

এর ফলে অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীরা ক্ষমতাহীন। করোনার সময় জেলার দায়িত্বে একজন করে সচিবকে দিয়ে রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে খর্ব করা হয়। জনপ্রতিনিধিদের বদলে জেলা প্রশাসক বা ইউএনও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। আসল দ্বন্দ্বের শুরু এখানেই। এসময় আমলাদের অনেকে ভুলে যান, যে তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, জনগনের চাকর মাত্র। তাদের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী সর্বগ্রাসী মনোভাব তৈরী হয়। তাদের কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারবে না- এরকম একটি প্রশাসনিক ভাবনা ছড়িয়ে দেয়া হয়। এরফলে, বিপুল জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক সরকারের ঘরে আমলাতন্ত্রের দানব রূপ তৈরী হয়। সরকার তার দেশে পরিচালনার পথ মৃশন করতে আমলাদের আদর যত্নে লালন করেছে। এখন সেই আমলারাই যেন ডক্টর ফসাসের ফ্রাক্রেস্টাইনের মতো দানব হয়ে উঠেছে। ফরিদপুরের এমপি যেমন অন্যায় করেছেন। সভা করে বিচার দাবী করে আমলারাও কম অন্যায় করেছেন কি?