প্রচ্ছদ রাজনীতি বিএনপির মনোনয়ন বাণিজ্য ও কমিটি বাণিজ্য কেলেংকারী

বিএনপির মনোনয়ন বাণিজ্য ও কমিটি বাণিজ্য কেলেংকারী

107
বিএনপির মনোনয়ন বাণিজ্য ও কমিটি বাণিজ্য কেলেংকারী

মনোনয়ন বাণিজ্য এবং কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগে অশান্ত হয়ে উঠেছে বিএনপি। ইতিমধ্যে ফখরুলের বাড়ীতে ডিম নিক্ষেপের অভিযোগে ১২ জনকে বিএনপি থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। ঢাকার দুই মহানগরীসহ সব মহানগরী কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। আর এসব ঘটনায় তৃনমূল ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। উত্তরা থানা বিএনপি, অবিলম্বে ১২ জনের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করার দাবী জানিয়েছে। তা নাহলে, মির্জা ফখরুল ইসলামকে উত্তরা থেকে বহিস্কারের হুমকি দেয়া হয়েছে। বিএনপির তৃণমূলের নেতা কর্মীরা এখন বিএনপিতে মনোনয়ন বাণিজ্য এবং কমিটি বাণিজ্য নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন।

জানা গেছে, বিএনপির একাধিক নেতা উত্তরা এবং যাত্রাবাড়ী আসনে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছেন। ঢাকা-৫ আসনে মনোনয়নের জন্য সালাউদ্দিন আহমেদ মির্জা ফখরুলকে নগদ ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। ফখরুলের গাড়ীতে উঠে, ঐ টাকার প্যাকেট হস্তান্তর হয়েছে। গুলশানে দলীয় কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত, বিএনপির একজন কর্মী ঐ ঘটনার সাক্ষী বলে জানিয়েছেন। উত্তরার মনোনয়নের জন্য এস.এম জাহাঙ্গীর ফখরুলকে দিয়েছেন ২০ লাখ টাকা। শুধু ফখরুল একা নয়, বিক্ষুদ্ধ বিএনপির কর্মীরা জানিয়েছেন, ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এই তিন নেতাই মনোনয়ন দেবার আশ্বাস দিয়ে টাকা নিয়েছেন। নয়া পল্টনে বিএনপির উত্তরার একজন কর্মী বলেছেন ‘বিএনপির নেতারা টাকা ছাড়া কিছু চেনে না। তাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও প্যাকেট নিয়ে যেতে হয়। ’

অন্য একজন নেতা বলেছেন ‘নজরুল ইসলাম খানের বাসায় খালি হাতে যাওয়া যায় না। মাছ, মুরগী নিয়ে যেতে হয়।’ অন্য একজন বলেছেন ‘গয়েশ্বর দাদাকে ফোন করেছিলাম, দেখা করবো বলে। তিনি (গয়েশ্বর) বললেন, ‘একটা বোতল (মদ) নিয়ে এসো।’ এই হলো বিএনপি নেতাদের চরিত্র।’ অন্য একজন বলেছেন ‘এখন দুই মহানগরী কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হবে টাকার ধান্ধায়। উত্তরে তাবিথ বড়লোক, দক্ষিণে ইশরাকের বাপের প্রচুর টাকা রেখে গেছে। দুইটাই দুধের গাই। এদের বসালে নেতারা নিয়মিত টাকা পাবেন। এজন্যই কমিটি ভাঙ্গার চিন্তা।’
অন্য একনজ কর্মী বলেছেন ‘বিএনপির নেতাদের এখন আর রোজগারের প্রধান পথ হলো কর্মীদের পকেট কাটা।’ ঐ কর্মী বলেন ‘রিজভী পর্যন্ত এখন টাকা চায়।’ এজন্যই বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা নেতাদের ঘেরাও করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খুব শীঘ্রই এ ব্যাপারে তারা কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন বলে জানা গেছে।

ঢাকাসহ বিএনপির ১১ মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে
বিএনপির ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ১১টি মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এরপর সবগুলোতেই নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এসব আহ্বায়ক কমিটি সংশ্লিষ্ট মহানগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা কমিটি পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করবে। এরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে।
দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিমধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক শুরু করেছেন। এর মধ্যে চট্টগাম ও বরিশাল মহানগরের নেতাদের সঙ্গে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্কাইপিতে বৈঠক করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চট্টগ্রাম ও বরিশাল মহানগর কমিটি ভাঙার মধ্য দিয়ে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

পর্যায়ক্রমে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হবে। প্রথমবারের মতো কুমিল্লা মহানগরে নতুন করে বিএনপির কমিটি গঠন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন, কমিটি পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে তৃণমূলের কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মহানগর কমিটি গঠন করা হবে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, মহানগর কমিটির মধ্যে যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এগুলো অবশ্যই পুনর্গঠন করা হবে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা বিএনপির কমিটি, ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট শাহাদাত হোসেনকে সভাপতি ও আবুল হাসেম বকরকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাজশাহী মহানগর, ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নাসিম হোসেনকে সভাপতি ও বদরুজ্জামান সেলিমকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক এবং আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ ও অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলীসহ ১০ জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৬০ সদস্যবিশিষ্ট ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু তার ৩ মাসের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

২০১৩ সালের অক্টোবরে মজিবর রহমান সরোয়ারকে সভাপতি ও কামরুল আহসান শাহিনকে সাধারণ সম্পাদক করে বিএনপির বরিশাল মহানগর কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৪ সালে সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান শাহিন মৃত্যুবরণ করলে দলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন সিকদারকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে সভাপতি ও মনিরুজ্জামান মনিকে সাধারণ সম্পাদক করে খুলনা মহানগর কমিটি, ২০১৭ সালের ২৬ মে রংপুর মহানগর এবং ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি গঠন করা হয়।

মজিবর রহমান সরোয়ার জানান, ১৯৯১ সালে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করি। এরপর নতুন মহানগর গঠিত হলে সেখানেও দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এখন দেশের বিভিন্ন জেলা কমিটি পুনর্গঠন হচ্ছে। আমরাও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছি বরিশাল মহানগর কাউন্সিল করার জন্য। নতুন কাউন্সিলে কে নেতা হবেন তা নির্ধারণ করবে বরিশাল মহানগরের কাউন্সিলররা। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর খুলনার সার্কিট হাউস ময়দানে মহানগর বিএনপির সম্মেলন হয়েছিল। ওই সম্মেলনে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে সভাপতি এবং মনিরুজ্জামান মনিকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ওই সময় মঞ্জু ছিলেন সদর আসনের এমপি। পরে মনিরুজ্জামান মনি খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।

২০১৬ সালের ৬ আগস্ট ডা. শাহাদাত হোসেনকে সভাপতি ও আবুল হাসেম বকরকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম মহানগরের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ১০ জুলাই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়। সম্প্রতি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভার্চুয়াল উপায়ে একজন একজন করে চট্টগ্রাম নেতাদের মতামত নেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলনকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্যবিশিষ্ট রাজশাহী মহানগরের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেট মহানগরের সভাপতি নাসিম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক পদে বদরুজ্জামান সেলিম নির্বাচিত হন। এই কমিটির মেয়াদ চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল শেষ হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৬ মে মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেনকে সভাপতি ও শহীদুল ইসলাম মিজুকে সাধারণ সম্পাদক করে ঘোষণা করা হয়েছে রংপুর মহানগর বিএনপি কমিটি। সভাপতি মোজাফফর এরই মধ্যে মারা গেছেন। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল। ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক এবং আবু ওয়াহাব আকন্দ ও অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলীসহ ১০ জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ৬০ সদস্যবিশিষ্ট ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির কমিটি অনুমোদন করা হয়। এসব কোনো কমিটিরই মেয়াদ নেই। এখন এসব মহানগরের কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন করে কমিটি করার দিকে আগাচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড।