প্রচ্ছদ রাজনীতি যাদের জন্য আওয়ামী লীগের দরোজা আর কখনো খুলবে না!

যাদের জন্য আওয়ামী লীগের দরোজা আর কখনো খুলবে না!

204
যাদের জন্য আওয়ামী লীগের দরোজা আর কখনো খুলবে না!

আওয়ামী লীগে এখন শুদ্ধি অভিযান চলছে, চলছে কমিটি গঠনের তোড়জোড়। পাশাপাশি দল থেকে যারা মান অভিমান করে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তাদেরকে সচল করা, ত্যাগী পরীক্ষিতদের খুঁজে বের করে আনার কাজও চলছে সমান্তরাল গতিতে। আর আওয়ামী লীগের এই নীরব পুনঃগঠন প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত হয়েছেন অনেকে। যারা এক সময় আওয়ামী লীগ করতেন, আওয়ামী লীগের অনেক নামিদামি নেতাও ছিলেন কিন্তু নিজেদের বিভ্রান্তির কারণে দল ত্যাগ করেছেন। এখন প্রায় অস্তিত্বহীন বা অপাংক্তেয়। এই সমস্ত কিছু সুপরিচিত নেতারা এখন আওয়ামী লীগে ফেরার জন্য চেষ্টা করছেন- এমন খবর চাউর হয়েছে আওয়ামী লীগের মধ্যে।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগের ত্যাগী বেশ কয়েকজন নেতা এখন আবার আওয়ামী লীগে ফেরার জন্য নানা রকম চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ফিরতে পারবেন কিনা- সেটি অনিশ্চিত। যারা এখন আওয়ামী লীগে ফেরার জন্য মরিয়া হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন;

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়ভাজন হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। বীর এই মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭৫ সালের পর বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিশোধ নেওয়ার পক্ষে সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন জনগণকে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার টানাপোড়েন তৈরি হয়। সেই বাস্তবতায় তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি দলত্যাগ করেন। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেন। কিন্তু পৃথক অবস্থান নিয়ে তিনি রাজনীতিতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি। কিছুদিন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন গত নির্বাচনের আগে। নির্বাচনের পরেই তিনি ইউটার্ন নিয়েছেন। এখন তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমালোচনা করেন। একটি জাতীয় দৈনিকের বিভিন্ন কলামে তিনি সরকারের বন্দনায় মুখর। অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের অনেকেরই তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন যে, তার লেখাগুলো প্রমাণ করে যে তিনি আওয়ামী লীগে ফেরার জন্য মুখিয়ে আছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে নেবে কিনা সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

মোস্তফা মোহসীন মন্টু: আওয়ামী লীগ থেকে মোস্তফা মোহসীন মন্টু বেরিয়ে গিয়েছিলেন ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দূরত্ব এবং আওয়ামী লীগে দল উপদল কোন্দল ইত্যাদি করছিলেন তিনি দীর্ঘদিন ধরে। শেখ হাসিনার অসম্ভব সহ্য ক্ষমতার কারণেই যুবলীগের সাবেক এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সেই সময়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেননি। এরপর তিনি গণফোরাম করেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু ড. কামাল হোসেনের সঙ্গেই তার এখন মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার এখন আগের মতো সখ্যতাও নেই। এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ মোস্তফা মোহসীন মন্টু আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে প্রায় প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করেন। শেষ জীবনে এসে ‘নিজের দলে’ ফিরতে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। মোস্তফা মোহসীন মন্টুকে সর্বশেষ গণফোরামের কমিটিতে রাখা হয়নি এবং তিনি নিজেও পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগে ফিরতে পারবেন কিনা সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: অধ্যাপক আবু সাইয়িদ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এসেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। ’৭৫ এর পরে যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মোহ গবেষণা করেছিলেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। কিন্তু আব্দুর রাজ্জাকের হাত ধরে তিনি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পর বাকশালে গিয়েছিলেন। আবার বাকশাল থেকে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তাকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল। তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জাতির পিতার ইতিহাস অন্বেষণ, জাতির পিতার হারিয়ে যাওয়া ভাষণগুলো উদ্ধার এবং এ সংক্রান্ত ভিডিওগুলো উদ্ধারের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি সংস্কারপন্থী হয়ে উঠেছিলেন। আর এই কারণেই ২০০৮ এর নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পান নাই। ২০১৪ সালে মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন। ২০১৮ তে এসে তিনি জাতীয় গণফোরামে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তারপর তাকে কিছুদিন সক্রিয় দেখা গেলেও ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার আবার মনোমালিন্যের খবর পাওয়া গেছে। এখন তিনি আবার আওয়ামী লীগে ফিরতে চান এমন আভাস দিচ্ছেন তার ঘনিষ্ঠরা। অনেকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগেরও চেষ্টা করছেন।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর: সুলতান মোহাম্মদ মনসুরও আওয়ামী লীগ সভাপতির অনেক প্রিয়ভাজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। শেখ হাসিনা যাদেরকে নিজের হাতে টেনে তুলে ছিলেন তাদের মধ্যে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর অন্যতম। তাকে ডাকসু নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ডাকসু’র ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনীতিতে তিনি লাইমলাইটে আসেন। এরপর তিনি আওয়ামী লীগের এমপি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইত্যাদি নানা পদ গ্রহণ করেন কিন্তু ওয়ান ইলেভেন তাকেও বিভ্রান্তিতে ফেলে। ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি সংস্কারপন্থী হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর মনোনয়ন না পেয়ে পৃথক অবস্থান নেন এবং সবশেষে তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেন। তবে কোন রাজনৈতিক দলের কোটায় নয় স্বতন্ত্র্য ব্যক্তি হিসেবে গণফোরামে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। এরপর গণভবনে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে দেখা করেন। এই নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগের অনেকের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। আর সুলতান মোহাম্মদ মনসুরও বুঝেছেন এক ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে তিনি রাজনীতিতে কিছু করতে পারবেন না। এজন্য তিনি আওয়ামী লীগে ফিরতে মরিয়া এই রকম আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এই রকম আরও অনেকেই আছেন যারা নানা রকম বিভ্রান্তির কারণে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেছিলেন। তারা এখন আবার আওয়ামী লীগে ফিরতে চান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দরজা তাদের জন্য খুলবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।