প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য *পঁচাত্তরে কেন প্রতিবাদ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ?*

*পঁচাত্তরে কেন প্রতিবাদ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ?*

67
*পঁচাত্তরে কেন প্রতিবাদ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ?*

*আগস্ট মাস বাঙালির শোকের মাস। আগস্ট মাস এলেই বাঙালি যেমন শোকে মুহ্যমান হয়ে উঠে তেমনি অনেকগুলো প্রশ্ন জাতির সামনে আসে। এই প্রশ্নগুলো শুধু যে সাধারণ মানুষ করে তা নয়, আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই প্রশ্নগুলো করেন।*
*পঁচাত্তর নিয়ে যখনই আলোচনা হয় তখনই সবচেয়ে প্রথমে প্রশ্নটি আসে আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে। সে সময় আওয়ামী লীগ কেন প্রতিবাদহীন ছিলো? কেন বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার প্রতিবাদে নেতারা রাস্তায় নামতে পারেনি? কেন নেতারা সেদিন পলায়নপর হয়েছিল? কেন নেতারা সেদিন যে যার মতো ছুটে বেরিয়েছিল? আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার এই প্রশ্ন করেছেন। তিনি বলেছেন, এত বড় সংগঠন এত নেতা তারপরও বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার পর একটা প্রতিবাদ হয়নি! এই প্রশ্নটা আমাকে সবসময় পীড়িত করে। আর এ নিয়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি সবসময় আক্ষেপ করেন। সঙ্কটাকালীন সময় এত বৃহত্তর রাজনৈতিক দল কিভাবে ভেঙ্গে পড়ে তা নিয়ে গবেষণা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আত্নজিজ্ঞাসা।*

*পঁচাত্তরে কেন প্রতিবাদহীন ছিলো আওয়ামী লীগ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মোটা দাগে ৫টি কারণ পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:*
*দলের ভেতর ষড়যন্ত্র: স্বাধীনতার পর থেকেই খুনী খন্দকার মোশতাক চক্র দলের ভেতর ষড়যন্ত্র করেছিলো। মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, কেএম ওবায়দুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ এই ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলো। বঙ্গবন্ধুকে হ’ত্যা নিছক একটি হ’ত্যাকাণ্ড ছিলো না, এটি একটি দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ ছিলো। এই পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের একটি অংশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলো। দলের শীর্ষ নেতাদের একাংশ ছিলো বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার ষড়যন্ত্রের অংশ। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার পর খু’নী মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যারা শপথ নিয়েছিলো তারা সবাই ছিলো আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা। কাজেই দলের ভেতর ষড়যন্ত্র থাকার ফলে দলের নেতৃত্ব যেমন বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার প্রতিবাদের জন্য নির্দেশনা দিতে পারেনি, ঠিক তেমনি দলের কর্মীরাও ছিলো বিভ্রান্ত।*

*দলের বিশ্বস্তদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যারা বিশ্বস্ত ছিলেন, যাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান করেছিলেন, যাদের সঙ্গে নিয়ে সত্তরের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করেছিলেন, যাদের নিয়ে তিনি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন- স্বাধীনতার পর তাদের সঙ্গে আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব তৈরী হয়। এই দূরত্বও ছিলো ষড়’যন্ত্রের একটি অংশ। তাজউদ্দীন আহমেদের মতো বিশ্বস্ত অনুচররা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দূরে সরে যান। এখানেই সুযোগ পায় ষড়যন্ত্রকারীরা। বঙ্গবন্ধুর চারপাশে চাটুকাররা ভীড় জমায়। ফলে জাতির পিতাকে প্রকৃত অবস্থা বুঝতে দেওয়া হয়নি। সংগঠন হয়ে পড়ে দুর্বল।*

*জাতির পিতার ওপর একক নির্ভরতা: মূলত উনসত্তর সাল থেকে আওয়ামী লীগের একক নেতায় পরিণত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার ওপর এককভাবে নির্ভর ছিলো পুরো দলটি। তৃণমূলের সমস্ত নেতাকর্মীরা শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে মানতেন এবং শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই শুনতেন। অন্য নেতাদের প্রতি যেমন তাদের আস্থা ছিলো না তেমনি অন্য নেতাদের নির্দেশে কর্মীরা ঝাপিয়ে পড়বে সেরকম নির্দেশনা ছিলো না। জাতির পিতার ওপর এই একক নির্ভরতার কারণে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত হতে পারেনি এবং প্রতিবাদ করতে পারেনি।*

*চার পাশের ঘনিষ্ঠদের বিচক্ষণতা এবং দুরদৃষ্টিতার অভাব: বঙ্গবন্ধুর চারপাশে যারা ছিলো, যারা প্রিয়জন আস্থাভাজন ছিলো এদের মধ্যে কিছু আমলা কিছু রাজনীতিবিদ ছিলেন। তারা কেউই সঙ্কটের সময় যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তাদের বিচক্ষণতার অভাব ছিলো। তাদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ছিলো। তারা যে ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলো তা নয়, কিন্তু তারা ব্যর্থ ছিলো। বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন তিন সেনাপতি ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমদসহ ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদদের ভূমিকা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। তারা সে সময় বিচক্ষণতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।*

*আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার করা হয়েছিলো। মূল ধারার গণমাধ্যমকেও এই অপপ্রচারে ব্যবহার করা হয়েছিলো। সারাদেশে মৌল্লাবাদী শক্তি এবং বিভিন্ন সর্বহারা পার্টিগুলোসহ প্রশাসনের একটি মহল বিভিন্ন রকম নোংরা কুৎসা এবং অপপ্রচার করেছিলো। যার ফলে মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরী হয়েছিলো আওয়ামী লীগ সম্পর্কে। যে কারণে সংগঠন তো নয়ই, সাধারণ মানুষও সে সময় প্রতিবাদ করেনি। তারা নীরবে অশ্রু বিসর্জন করেছে বা নীরবে দুঃখ করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হ’ত্যার জন্য যে প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিলো সেই প্রতিবাদ কখনোই হয়নি।*
*একটি বড় সংগঠনেও যদি দিক নির্দেশনা না থাকে, প্রকৃত লোকজন যদি প্রকৃত জায়গায় না থাকে, চাটুকাররা যদি চারপাশে ঘিরে থাকে এবং যদি একক নেতৃত্বের ওপর দল নির্ভরশীল হয় তাহলে সঙ্কটে যে দল উঠে দাড়াতে পারে না, যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে না পঁচাত্তর তার বড় প্রমাণ।*