প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *শাহেদের সাম্রাজ্যে মক্ষিরানীগণ*

*শাহেদের সাম্রাজ্যে মক্ষিরানীগণ*

101
*শাহেদের সাম্রাজ্যে মক্ষিরানীগণ*

*শাহেদ করিম। নামে নয় তার তীক্ষ্ণতা আর দুরদর্শিতার তুলনা হয় না। যে কোন লোকের তুলনায় তিনি ধূর্ত ও চতুরতার ছিলেন অতুলনীয়। জীবনের সব ধরনের ইনজয় তিনি করেছেন। সেই শাহেদ সমাজের হেন গুনিজন নেই যার সাথে ছিলনা তার সখ্যতা। মন্ত্রী, এমপি, সেলিব্রেটি, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আমলা, ব্যবসায়ী নেতা, রাজনৈতিক নেতা এমনকি সাংবাদিক বড় বড় নেতাদের কাছে তিনি ছিলেন মহিরুহ। তিনি ছিলেন টাকার জোড়ে মধ্যমনি। টক শোতে কই ফোটাতেন শাসক দলের পক্ষে। এখন সময় এসেছে সকলে মিলে সেই শাহেদকে খোঁজে বের করার। তাকে আইনের হাতে তুলে দেয়ার।*

*হেন কাজ নেই যা তিনি করেননি। সেই রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এক জীবনে কোনো ব্যক্তি এত প্রতারণা করতে পারে তা অবিশ্বাস্য! বহুরূপী শাহেদ তার সাম্রাজ্য শাসনে ব্যবহার করেছেন সুন্দরী নারীদেরও। শয্যা সঙ্গী করেছেন আর মেহমান হিসেবে পাঠিয়েছেন অনেক নামী দামী মানুষের কাছে। শাহেদের অন্যরকম জীবনের সাথী ছিলেন এমন পাঁচজন সুন্দরীর তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। এর মধ্যে তিনটি নাম ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। তারা হলেন- লিজা, হিরা মণি ও সাদিয়া। তাদের সন্ধানে কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানাগেছে।*
*শাহেদ বিভিন্ন প্রতারণায় শাহেদ করিম সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহার করত। শাহেদ তরুণীদের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে কাজ বাগিয়ে নিত। অনেক সময় সরবরাহকারীদের দিয়ে কাজ করিয়ে বিল দিতেন না। লিজা, সাদিয়া ও হিরা মণির মতো অন্তত চার-পাঁচ তরুণী শাহেদের হয়ে কাজ করত। এমন অভিযোগের বিষয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ আমরাও পেয়েছি।*

*সেই শাহেদ: জানা গেছে শাহেদের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অফিস দখলে রাখা, আর মাসের পর মাস ভাড়া বকেয়া রাখার অভিযোগ রয়েছে রিজেন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে। মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে এখনো অর্ধকোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি ভবন মালিকের। আর উত্তরায় রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের ভাড়া বকেয়া রয়েছে ৮ মাসের। উত্তরা শাখা সিলগালা করে দেয়ার পর রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর শাখাও এখন বন্ধ। হাসপাতাল ভবনের নিচতলায় ঝুলছে তালা। চলে গেছেন রোগীরা। শাখার প্রধান নির্বাহী রাশেদসহ অন্য কর্মকর্তারাও হাসপাতাল থেকে লাপাত্তা। উত্তরায় রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে নাম ভাঙান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের।*

*নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল হিসেবে পরিচয় দেন মোহাম্মদ শাহেদ, এমন অভিযোগ ভবন মালিকের। জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও দখলে রেখেছে রিজেন্ট গ্রুপ। বকেয়া রয়েছে ৮ মাসের ভাড়া। টাকা চাইলে দেয়া হতো হুমকি। বাড়ির মালিক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়েছেন। এবং উনি যখন আসে তখন সঙ্গে অস্ত্র নিয়ে কয়েকজন থাকে।*
*র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, আমরা শুরুতে ভুয়া টেস্টের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু এখন দিন যতই যাচ্ছে দেখছি অসংখ্য জঘন্য অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল শাহেদ। যাদের সঙ্গে তার ব্যবসা ছিল, তাদের সঙ্গেই প্রতারণা করেছে। অভিযানের পর অসংখ্য মানুষ আমাকে কল করে তার প্রতারণার ফিরিস্তি তুলে ধরছে। পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তার থেকে পদ্মাসেতু প্রকল্পের জন্য নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে সাপ্লাই দিয়ে আর টাকা দেয়নি। সিলেটের জৈন্তাপুর থেকে একজন কল করে জানিয়েছে, তার থেকে বালু এনে সাপ্লাই দিয়ে সে টাকা আর পরিশোধ করেনি।*

*কে ওই সুন্দরী তরুণী…*
*এছাড়া বিভিন্ন নিয়োগ ও বদলির কথা বলে কোটি কোটি টাকা সে হাতিয়ে নিয়েছে। অবাক করা বিষয় হল পুলিশের এসপি পদমর্যাদার একটি বদলির জন্যও সে প্রতারণা করেছে। র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সফিউল্লাহ বুলবুল গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা সাধারণত এ ধরনের অভিযান পরিচালনার আগে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে গোয়েন্দা তদন্ত করি। এই অভিযানের আগেও আমরা টানা চার-পাঁচদিন তদন্ত করেছি।*
*লেফটেন্যান্ট কর্নেল সফিউল্লাহ বুলবুল বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ ছিল, হাসপাতালটিতে পিসিআর মেশিন না থাকার পরেও টেস্ট করে রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে। বিনিময়ে নেয়া হচ্ছে টাকা। এরপর কিছু ভুয়া পরীক্ষার প্রমাণ আমরা পাই। কিছু সার্টিফিকেট আমাদের হাতে আসে সেগুলো আইইডিসিআরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু সেখানে এসব রিপোর্টের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। মূলত এ দু’টি অভিযোগ নিয়ে অভিযান পরিচালনা করলেও পরে তার প্রতারণা দেখে বিস্মিত হই।*

*এদিকে শাহেদের নারী কেলেঙ্কারী নিয়ে আরো তদন্ত শুরু হয়েছে। জানা গেছে কাজ ভাগানোর নামে শাহেদ ব্যবহার করতো সুন্দরী তরুণীদের। এসব বিষয়ে গ্রেপ্তারকৃতরা কিছু তথ্য দিয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো এই ভয়ংকর ‘সুশীল’ বুদ্ধিজীবী নিজের অপকর্মকে বিঘ্নহীন রাখতে ব্যবহার করতো নারীদের।এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন রিজেন্ট গ্রুপের একজন সাবেক নারী কর্মকর্তা।*
*রিজেন্ট হাসপাতালে দুইটি শাখাতেই যোগ্যতা যাই হোক না কেন, দেখতে শুনতে ভালো মেয়েদের নিয়োগ দিতেন জানিয়ে শাহেদের সাবেক এক নারী সহকর্মী বলেন, তার রুমে মেয়েদের যাতায়াত ছিল অবাধ। মেয়েদের তিনি নানা জায়গায় তদ্বিরের জন্য পাঠাতেন। কেউ ওসব কাজে যেতে না চাইলে শাহেদের রুমে নিয়ে তাদের মারধর করা হতো। নারী স্টাফরা ছাড়াও অনেক রকমের মেয়েরা আসতো তার অফিসে। আমি তার খারাপ চরিত্র দেখার পরেই চাকরি ছেড়ে দেই।*

*ছবি তোলা ছিলো নেশা:*
*এমএলএম ব্যবসা থেকে শুরু করে নানারকম জালিয়াতি-প্রতারণার ডজন ডজন মামলার খবর ঢেকে রেখে টেলিভিশনের টকশোসহ গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ভিআইপিদের মাঝখানে হাজির হতে বেগ পেতে হয়নি রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ শাহেদের। সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সরকারি আমলাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা অসংখ্য সেলফি তার ফেসবুক পেজের শোভা বর্ধন করে চলেছে।*
*মোবাইল ফোনের ফটো গ্যালারিতে সংরক্ষিত ছবিতে প্রভাবশালী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজেকে দেখিয়ে নিজের প্রভাব জানান দিতেন তিনি। তার মালিকানাধীন হাসপাতালের গেটেও সেসব ছবি টাঙানো থাকত বড় করে। শুধু শাহেদ নন তার স্ত্রী সাদিয়া আরবি রিম্মি যেতেন সবখানে ভিআইপিদের সাথে তুলতেন ছবি।*

*খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার নিচতলায় স্ত্রী সাদিয়া আরাবি রিম্মি ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন প্রতারক শাহেদ। ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৯০ হাজার টাকা। রিম্মির মা বিটিভির সাবেক প্রযোজক শাহিদা আরবী। পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট রিম্মি লোভে পড়ে বিয়ে করেছিলেন শাহেদকে। পরিবারও বিয়ে দিয়েছিলেন অবৈধ সম্পদের লোভে। সাইরেন বাজানোর হুটার লাগানো গাড়িতে দেহরক্ষী নিয়ে চলতেন শাহেদের স্ত্রী। শাহেদের পাপের টাকায় তিনি ভোগ-বিলাসী দাম্ভিক জীবনযাপন করতেন। প্রতারক শাহেদের মতো ছবি তোলা ছিলো স্ত্রীরও নেশা।*

*ধরাছোঁয়ার বাইরে ডা. সাবরিনা:*
*রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। শাহেদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় তার নাম নেই। তবে তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে গ্রেফতার করার আশ্বাস প্রশাসনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার চিকিৎসক হিসেবে চাকরিরত থেকেই জেকেজি’র চেয়ারম্যান পদে ছিলেন ডা. সাবরিনা। কিভাবে, কার মাধ্যমে তিনি এ কাজ হাতিয়েছেন, সে ব্যাপারে চলছে অনুসন্ধান। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সাবরিনাকে গ্রেফতার করা হবে।*

শাহেদ ও ডা. সাবরিনা:
*এদিকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার চিকিৎসক হিসেবে চাকরিরত থেকেই জেকেজির চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়ে এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদফতর। উল্লেখ্য, করোনা পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় র‌্যাব। পরে শাহেদ ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ জুন জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে প্রতারক আরিফসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের ২ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।*

*সাবরিনার বিষয়ে ওই থানার পরিদর্শক আবুল হাসনাত খোন্দকার গণমাধ্যমকে বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। আমি নিজেও একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্তে ডা. সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে মামলায় আসামি দেখানো হবে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানান, সাবরিনার বিষয়টি হাসপাতালের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।*
*শাহেদের রক্ষিতা হিসেবে কাজ করে এমন পাঁচজন সুন্দরী নারীর তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। এর মধ্যে তিনটি নাম ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। তারা হলেন- তরুণী লিজা, সাদিয়া ও হিরা মণি। বিভিন্ন প্রতারণায় শাহেদ করিম সুন্দরী তরুণীদের ব্যবহার করত। শাহেদ তরুণীদের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে কাজ বাগিয়ে নিত। অনেক সময় সরবরাহকারীদের দিয়ে কাজ করিয়ে বিল দিতেন না। লিজা, সাদিয়া ও হিরা মণির মতো অন্তত চার-পাঁচ তরুণী শাহেদের হয়ে কাজ করত। এমন অভিযোগের বিষয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ আমরাও পেয়েছি।*