প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য *বিশ্বাসঘাত’কতা করে আওয়ামী লীগ ছা’ড়ল যারা*

*বিশ্বাসঘাত’কতা করে আওয়ামী লীগ ছা’ড়ল যারা*

638
*বিশ্বাসঘাতকতা করে আওয়ামী লীগ ছাড়ল যারা*

*বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি বয়সে কয়েক যুগ পেরিয়ে যেন আজ শতাব্দীর পথে। চলমান এই পথে, রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় আওয়ামী লীগকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম ও চড়াই উৎরাই। ফলে আওয়ামী লীগে উত্থান পতন ছিল সত্য কিন্তু ভেঙে পড়েনি। বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু দলটির সময়ে অসময়ে, উত্থান পতনে অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে যান। আবার কেউ কেউ তো বিশ্বাসঘাতকতা করে দলের সাথে। অবশ্য দল ছেড়ে যাওয়াও তো এক রকমের বিশ্বাসঘাতকতা। চলুন জেনে নেই বিশ্বাসঘাতকতা করে আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাওয়া কয়েকজনের সম্পর্কে।*

*খন্দকার মোশতাক: বিশ্বাসঘাতকতা করে আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে যাওয়াদের মধ্যে অন্যতম হল খন্দকার মোশতাক। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারে তিনি পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে তিনি বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তাকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বাকশালের কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। কিছু সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নি’হত হবার পর মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। তার শাসনামলে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মোঃ মনসুর আলী ও এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর সেনাবিদ্রোহের দ্বারা অপসারিত হন। এসব কারণে তিনি জাতীয় বেইমান হিসেবে সর্বজন নিন্দিত। ধারণা করা হয় যে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হ’ত্যার পিছনে তিনিও জড়িত ছিলেন। ১৯৭৬ সালে মোশতাক আহমেদ ডেমোক্র্যাটিক লীগ নামক এক নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেন।*

*এ কে এম ওবায়দুর রহমান: কে এম ওবায়দুর রহমান ১৯৬২-১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে তিনি আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৩ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন সমর্থন করেন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। তিনি ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ১৯৬৬-১৯৭১ সালে সমাজকল্যাণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরে তিনি ভারতে চলে যান। তখন তিনি আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩-১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও তার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর, তিনি খোন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের জেল হ’ত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন।*

*তাহের উদ্দিন ঠাকুর: তাহের উদ্দিন ঠাকুর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত, সমালোচিত এক নাম। ঠাকুর দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে খুবই সুপ্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে সাংবাদিক ঠাকুর সম্বোধন করে ডাকতেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে কুমিল্লায় আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনীতিক ও ছাত্রনেতাদের নেতৃত্ব দেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। তিনি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিপরিষদে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার অভিযোগে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট ঠাকুরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি মা’মলা থেকে খালাস পেয়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২০ শে অক্টোবর, মেট্রোপলিটন দায়রা জজ আদালত ঠাকুরকে জেল হত্যা মামলার অপর অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়। বৃক্কের রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে মারা যান।*

*ড. কামাল হোসেন: ড. কামাল হোসেনের জন্ম বরিশালের শায়েস্তাবাদে। তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা দের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২-এর ৮ই জানুয়ারি শেখ মুজিবের সঙ্গে তাকেও মুক্তি দেয়া হয়। ড. কামাল হোসেন শেখ মুজিবের সঙ্গে ১০ জানুয়ারি লন্ডন হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় ১৯৭২ সালে আইনমন্ত্রী এবং ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর অনেকটা হঠাৎ করেই বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ছেড়ে চলে যায় ড. কামাল হোসেন। আর গণফোরাম নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠাতা করে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে যে জোট গড়ে উঠেছে সেটির নেতৃত্বে আছেন ড. কামাল।*