প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *বাংলাদেশের ক’রোনা টে’স্ট করতেই লাগবে ৬ বছর!*

*বাংলাদেশের ক’রোনা টে’স্ট করতেই লাগবে ৬ বছর!*

47
*বাংলাদেশের করোনা টেস্ট করতেই লাগবে ৬ বছর!*

*বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা মোকাবেলায় যে প্রধান উপায় বাতলে দিয়েছিল, সেই উপায়ের কাছাকাছিও আমরা যেতে পারছি না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে করোনা মোকাবেলার সবথেকে ভালো উপায় হলো টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট।*
*প্রথম দিনই বলা হচ্ছিল যে, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে হলে দ্রুত পরীক্ষা করতে হবে এবং সংক্রমিত আর সুস্থ মানুষদের আলাদা করতে হবে। এটা না করা গেলে করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে কোনভাবেই পারা যাবে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যেভাবে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে, সেভাবে করোনা পরীক্ষা করলে কতদিনে উপসর্গবাহী মানুষ এবং সংক্রমণের আশঙ্কায় থাকা মানুষদের পরীক্ষা সম্পন্ন হবে তা অনিশ্চিত।*

*সাধারণত বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় যে, একটি দেশে যে পরিমাণ আক্রান্তের হার, সেই শতাংশ জনগোষ্ঠীকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হয়। এটাই হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বতঃসিদ্ধ ধারণা। আর সেই বিবেচনা থেকে বাংলাদেশে এখন প্রতিদিন গড় সংক্রমণের হার ২১ শতাংশের বেশি।*
*আমরা যদি ধরে নেই যে, আমাদের ২০ ভাগ মানুষ নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্ত হচ্ছে। এখন যদি আমরা ধরি যে, আমাদের ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই দেশ, তাহলে বর্তমান হিসেবে আমাদের পরীক্ষা করতে হবে অন্তত ৩ কোটি ২০ লক্ষ মানুষকে। আমরা এখন গড়ে ১৫ হাজারের কম পরীক্ষা করছি। আমরা যদি দৈনিক ১৫ হাজার করেও পরীক্ষা করি তাহলে এই ৩ কোটি ২০ লক্ষ মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে সময় লাগবে অন্তত ৬ বছর! আর বাংলাদেশে এই ৩ মাসে এখন পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪ লক্ষ ২৫ হাজার ৫৯৫ জনের। এই পরীক্ষাতে শনাক্ত হয়েছে ৭১ হাজার ৬৭৫ জন। কাজেই এখন বাংলাদেশে সামাজিক সংক্রমণ যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।*

*আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে, যখন সামাজিক সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে তখন পরীক্ষার কোন বিকল্প নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আজকের ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে যে, মোট ৫৫ টি ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর আর অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে যে, পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন, অনেকে নমুনা দিতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়ছেন, নানারকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং কাউকে না ধরলে টেস্ট করানো যাচ্ছেনা। যাদের উপসর্গ আছে শুধু তারাই টেস্ট করাতে যাচ্ছেন এবং টেস্ট করাতে গিয়ে নানারকম ভোগান্তি এবং হয়রানির মুখে পড়ছেন।*

*আবার অন্যদিকে বলা হচ্ছে, যে ল্যাবগুলোতে টেস্ট করা হচ্ছে সেই ল্যাবগুলোতে প্রচুর চাপ থাকার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য নমুনা সংগ্রহ করা হলেও তার ফলাফল দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। এরকম নমুনা জমা দিয়েও ফলাফল পাননি এমন মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পরীক্ষা করা এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, নতুন করে পিসিআর ল্যাব বসিয়ে পরীক্ষা করা অনেক কঠিন ব্যাপার, ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। সেই সময় আমাদের হাতে আছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তবে সরকারের একটি সূত্র বলছে যে, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ যখন শুরু হয় তখন একটি ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জনের পরীক্ষা করা হতো।*

*এখন বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজারের বেশি পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং এই হার আরো বাড়ানো হবে। তবে যতই বাড়ানো হোক না কেন, এই হারে পরীক্ষা করেও বাংলাদেশে যে পরিমাণ শঙ্কাযুক্ত ব্যক্তি তাদের সকলের পরীক্ষা করা সম্ভব হবেনা। সবথেকে বড় কথা হচ্ছে যে, ৬৪ টি জেলার এই দেশে মাত্র ৫৫ টি ল্যাব রয়েছে। তার মানে অনেক জেলাতে এখনো ল্যাব নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তো নেইই। আর সমস্যাটা হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে যারা উপসর্গ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হচ্ছে। এজন্যেই টেস্টের বিকল্প কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা এবং এটা দ্রুতই করতে হবে। কারণ যত বেশি মানুষ পরীক্ষার আওতার বাইরে থাকবে তত বেশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।*

*ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে যে পরিমাণ পরীক্ষা হচ্ছে তাতে প্রতি পাঁচজনের একজন সংক্রমিত হচ্ছে এবং এজন্য এখনই যে এলাকাগুলোতে সংক্রমণের মাত্রা বেশি, সেই এলাকাগুলোতে পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া উচিত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন শুধু এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ ল্যাব এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকা দরকার তা না থাকার কারণে বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, যদি এই গতিতে টেস্ট করতে হয় তাহলে ২০ শতাংশ বা ৩ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের টেস্ট করাতে লাগবে ৬ বছর। তাহলে কি এতদিন আমাদের করোনার সঙ্গে বসবাস করতে হবে?*

*করোনা নিয়ে পথহারা বাংলাদেশ*
*করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ কি পথ হারিয়ে ফেলেছে? একের পর পর সিদ্ধান্তহীনতা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং সমন্বয়হীনতার কারণে করোনা সংক্রমণ মোকাবেলা নিয়ে বাংলাদেশের এখন কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ তা জানেনা কেউ। বিশেষজ্ঞরা একেকজন একেক রকম মতামত দিচ্ছেন, কিন্তু আসলে বাস্তব পরিস্থিতি কি বা করোনা সংক্রমণ কতদিনে যাবে, মানুষ কবে স্বাভাবিক জীবনে যাবে, কিভাবে করোনা মোকাবেলা করা হবে এবং করোনা সংক্রমণকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে এই নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।*

*গতকাল নিউজিল্যান্ড নিজেদেরকে করোনামুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। করোনা সংকট শুরুর সাথে সাথে নিউজিল্যান্ড সরকারের তরফ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল এবং ধাপে ধাপে সেই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা করোনা সংক্রমণ থেকে দেশকে মুক্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন করোনা মোকাবেলার জন্য একের পর এক যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেই পদক্ষেপগুলো আদৌ কতটুক কাজ করছে বা করছে কিনা তা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে না। এমনকি করোনা মোকাবেলার এক্সিট প্লান কি তাও সুস্পষ্ট নয়। একেকবার একেকরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে করোনা মোকাবেলায়। আর এর ফলে এই প্রশ্ন উঠেছে যে, বাংলাদেশ কি পথ হারিয়ে ফেলেছে?*

*টেস্ট নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক কোন পরিকল্পনা নেই: এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনার যে হারে সংক্রমণ হয়েছে সেই তুলনায় পরীক্ষার হার খুবই কম। গত ১ মাস যাবত বাংলাদেশে মোট পরীক্ষার ২০ থেকে ২১ শতাংশ হারে করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনার পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৪ লক্ষের কিছু বেশি। ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশে ৪ লক্ষ পরীক্ষা কোন পরীক্ষাই নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরীক্ষার হার বাড়ানো নিয়ে সবসময় বলা হচ্ছে এবং এখন ধারণা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশে এখন র‍্যাপিড টেস্টের কোন বিকল্প নেই। কারণ প্রচুর নমুনা জমা পড়ছে, মাত্র ৫৫ টি ল্যাবে এত পরীক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিলম্বের কারণে করোনা পরীক্ষার ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ কিভাবে সামনের দিনগুলোতে পরীক্ষা করা হবে, পরীক্ষার বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা কি এই সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেই।*

*চিকিৎসা পরিকল্পনা অস্পষ্ট: করোনা চিকিৎসা কি- এটা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। বলা হচ্ছে বাড়িতে বসে চিকিৎসা নিতে, মনোবল শক্ত রাখতে বা গরম চা খেতে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসার পদ্ধতি কি এই ব্যাপারে একেক হাসপাতালে একেক রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সবথেকে বড় কথা হচ্ছে, কখন একজনকে আইসিইউতে নিতে হবে বা কখন একজনকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হবে- সেই বিষয়গুলো নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছেনা।*

*হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ত্রুটিপূর্ণ: এখন পর্যন্ত হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ত্রুটি বের করতে পারিনি অথচ করোনা সংক্রমণের আমরা তিন মাস পার করেছি। সরকারী হাসপাতালগুলোতে যাচ্ছেতাই অবস্থা। করোনার চিকিৎসা লাভজনক মনে করে এখন বেসরকারী হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসায় মনোযোগ দিয়েছে। ফলে অন্যান্য চিকিৎসাতে ঝুঁকি বেড়েছে, অন্যান্য চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম নিয়েছে। করোনা চিকিৎসাও যে খুব একটা কার্যকরভাবে হচ্ছে এমন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছেনা কোন রোগীর কাছ থেকে।*

*ওষুধ এবং চিকিৎসা সামগ্রীর লাগামহীন উর্ধ্বগতি: এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনা সঙ্কটের সময় এদের মুনাফার লোভ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস তুলেছে। আর এই পরিস্থিতি যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনই নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে তাহলে এটা আরেকটি দূর্ভাগ্যজনক অধ্যায়ের সূচনা করবে।*
*করোনা নিয়ে নিরীক্ষা: করোনা নিয়ে শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট করছে। সেই এক্সপেরিমেন্টে মানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে গিনিপিগ হিসেবে। প্রথমে বলা হলো যে, বাড়িতেই আইসোলেশনে থাকতে, এখন আবার আইসোলেশন সেন্টার বানানো হচ্ছে। এরপর প্রথমে বলা হলো যে, সাধারণ ছুটি, এখন আবার সেই ছুটি শিথিল করা হলো। এখন আবার এলাকাভিত্তিক লকডাউন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছে। তাই জনভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, করোনা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপপরিকল্পনা দরকার। যে পরিকল্পনা নিয়ে করোনা মোকাবেলার একটি কৌশল নির্ধারণ করা দরকার বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।*