প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য *দেশে দেশে স্বৈ’রশাসকদের যত নি’র্মম প’রিণতি*

*দেশে দেশে স্বৈ’রশাসকদের যত নি’র্মম প’রিণতি*

15
*দেশে দেশে স্বৈরশাসকদের যত নির্মম পরিণতি*

*এশিয়া থেকে ইউরোপ কিংবা আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা, সেনা শাসকদের আবির্ভাব ঘটেছে প্রায় সব অঞ্চলেই। আমাদের এই উপমহাদেশেই যেমন একাধিকবার সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু চোখে পড়ার মতো একটি বিষয় হলো, গত শতাব্দীর চেয়ে এই শতাব্দীতে সেনা অভ্যুত্থানের প্রবণতা অনেকটাই কম বলে মনে হচ্ছে। দেশে দেশে সেনা শাসকদের করুণ পরিণতিই কি এর মূল কারণ?*
*হাতে গোনা কয়েকটি দেশ বাদে প্রায় সব জায়গাতেই সেনা শাসকদের ভাগ্যে জুটেছে নির্মম মৃত্যু। বাংলাদেশের সেনা শাসক জিয়াউর রহমানকে তারই সৈন্যদের হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে। পাকিস্তানেও আমরা সেনাশাসকদের করুণ পরিণতি দেখেছি। শুধু আমাদের এই উপমহাদেশই নয়, বিভিন্ন দেশের অনেক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বৈরশাসকেরই নির্মম পরিনতি দেখেছে বিশ্ব। এখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের ডাকাবুকো কিছু স্বৈরশাসকের শেষ পরিণতিটাই তুলে ধরা হলো-*

*অ্যাডলফ হিটলার: অ্যাডলফ হিটলারকে ভাবা হয় সর্বকালের সবচেয়ে নৃশংস স্বৈরশাসক। ফ্যাসিবাদের জনক হিটলারের রাজ্য জয় ও বর্ণবাদী আগ্রাসনের কারণে লাখ লাখ মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়। ৬০ লাখ ইহুদিকে পরিকল্পনা মাফিক হত্যা করা হয়। ইহুদি নিধনের এই ঘটনা ইতিহাসে হলোকস্ট নামে সবাই জানে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে হিটলার বার্লিনেই ছিলেন। রেড আর্মি যখন বার্লিন প্রায় দখল করে নিচ্ছিল সেরকম একটা সময়ে তিনি ইভা ব্রাউনকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই তিনি ফিউরার বাংকারে সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেন।*

*বেনিতো মুসোলিনি: ইতালির মুসোলিনিও হিটলারের মতো নিষ্ঠুরতার পথ অনুসরণ করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিণতি তাকেও বরণ করতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সবদিক থেকে বিধ্বস্ত ইতালির ভিক্টর ইমানুয়েলের গণতান্ত্রিক সরকার ও জার্মানির হিন্ডেনবার্গ সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনিও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর হিটলারের মতো তার চেহারাও পাল্টে যায়। পরবর্তীতে স্বৈরাচারী ও একনায়ক হিসাবে আবির্ভূত হন। মুসোলিনি সুইজারল্যান্ডে পালাবার সময় কমিউনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন, পরে তাকে হত্যা করা হয়। হিটলার এবং মুসোলিনি দু’জনের রাজনৈতিক দলই আজ দুদেশে নিষিদ্ধ।*

*নেপোলিয়ান: ফ্রান্সের নেপোলিয়ানের বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিলো মাদ্রিদ থেকে মস্কো পর্যন্ত। ফ্রান্সসহ প্রায় অর্ধেক পৃথিবীর সম্রাট হয়েছিলেন তিনি। অনেকেই ভাবেন, ফরাসী জাতি আজ সারা বিশ্বে যে একটি সম্মানিত জাতি, আর ফ্রান্সের যে এত সফলতা, এর নেপথ্য নায়ক হলেন নেপোলিয়ান। নিজের দেশে তিনি ছিলেন মর্যাদাবান। কিন্তু বাইরের দেশে তার রূপ ছিলো ভিন্ন। সম্রাটের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অন্য দেশের জন্য হুমকি বলে মনে করা হত। তাই তারা তাকে ভাল দৃষ্টিতে দেখতে পারেনি। তাই সম্রাটের বিরোধী দলগুলো জোট বাঁধে নেপোলিয়ানের বিরুদ্ধে। নিজ দেশের জনমতকে উপেক্ষা করে তার সম্রাজ্য সাম্প্রসারণের প্রধান শত্রু ব্রিটেন, ক্রোয়েশিয়া ও রাশিয়াকে ধ্বংস করে দেশ দখলের চেষ্টায় নেপোলিয়ান ৫ লাখ সৈন্য নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেন। কিছু দেশ তার আয়ত্বে চলে আসে। রাশিয়া, ব্রিটেন ও ক্রোয়েশিয়া নেপোলিয়নের বেপরোয়া সম্রাজ্য সম্প্রসারণ ঠেকাতে চুক্তিবদ্ধ হয়। শক্র বাহিনীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আক্রমণে নেপোলিয়ান পরাজিত হয়ে পড়েন এবং এক সময় তিনি রাজত্ব হারান। ক্ষমতাধর নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্রের মসনদ তাকে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে অপদস্থ ও অপমানিত করে স্বৈরশাসকদের তালিকায় যুক্ত করেছে। ক্ষমতার নেশা তার অভূতপূর্ব জনকল্যাণকর কাজগুলোকে ম্লান করে দেয়।*

*সাদ্দাম হোসেন: ইরাকের স্বৈরাচারী একনায়ক সাদ্দাম হোসেনের শেষ পরিণতিটা আমাদের কারওরই অজানা নয়। বলা হয়ে থাকে একনায়তান্ত্রিক শাসন ও অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে পশ্চিমা বিশ্ব। আর তাই ২০০৩ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। বিদেশী প্রভুদের যতই হস্তক্ষেপ থাকুক না কেন জনগণ যদি তার সাথে থাকত তাহলে হয়তবা এই পরিণতি হত না তার। সাদ্দামের কর্তৃত্বপরায়নতার কারণে মার্কিনীরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করলেও জনবিচ্ছিন্ন বেপরোয়া শাসননীতির কারণে ইরাকী জনগণও তার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। তার স্বৈরনীতির শেষ ফল হিসেবে মার্কিন সেনারা তাকে টেনেহিঁচড়ে গর্ত থেকে বের করে এবং ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলায়।*

*মুয়াম্মার গাদ্দাফি: লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি জনপ্রিয় ‘ব্রাদারলি লিডার হলেও তিনি মূলত একনায়ক, স্বৈরশাসক হিসেবেই পরিচিত। দীর্ঘ ৪২ বছর তিনি এক হাতে শাসন করেছেন উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া। দেশ-বিদেশে সুনামের পাশাপাশি তাকে নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। গাদ্দাফি ফিলিস্তিনের ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’র একজন ভক্ত হলেও পশ্চিমাবিরোধী নীতির কারণে গাদ্দাফিকে পশ্চিমারা সব সময়ই নেতিবাচক চোখে দেখেছে। কূটনৈতিক অঙ্গনেও তার প্রতি দৃষ্টি তেমনই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান নিজেই গাদ্দাফিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের পাগলা কুকুর’ বলে অভিহিত করেন। তারা একাধিকবার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ বিদ্রোহীরা তার বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদ দখল করে নেয়। সেখান থেকে তার আগেই পালিয়ে যান মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও তার পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্য দিয়েই মূলত গাদ্দাফির পতন ঘটে। তারপরও তার অনুগতরা লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। সর্বশেষ তারা তার জন্মশহর সির্তে অভিযান চালায়। সেই অভিযানেই গুলিবিদ্ধ হন গাদ্দাফি। জেনারেল গাদ্দাফির পতনের জন্য তার কাছের লোকরাই শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছিল।*

*হোসনী মোবারক: মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলীর পর হোসনী মোবারক সে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক। আরব বিশ্বে লম্বা সময় দেশ শাসন করছেন অনেকে। হোসনী মোবারক তাদের অন্যতম। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর সেনাবাহিনী এক সদস্য কর্তৃক তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা’দাত নিহত হওয়ার পর হোসনী মোবারক ক্ষমতায় আসেন। জাতীয় নির্বাচনে পার্লামেন্ট অনুমোদিত মাত্র একজন প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন সেই প্রার্থী ছিলেন হোসনী মোবারক। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার দায়ে বিশ্বজুড়ে তিনি নিন্দিত। মিসরে গণজাগরণের মাধ্যমে তাকে লাঞ্ছিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। বর্তমানে মিসরের রাজনৈতিক উত্তপ্ততার জন্য তাকেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দায়ী করেন। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই শাসক এ বছর ফেব্রুয়ারিতে অনেকটা নীরবে নিভৃতেই এক হাসপাতালে মারা যান।*

*পারভেজ মোশাররফ: ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। তাকে এখন পর্যন্ত নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়নি, এটা সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই দণ্ড বাতিল করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পারভেজ মোশাররফ এখনও নির্বাসনেই আছেন। নিজ দেশে ফিরতে পারছেন না তিনি। দুরারোগ্য আসুখে আক্রান্ত সাবেক এই স্বৈরশাসক এখন পরবাসে বসেই মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।*