প্রচ্ছদ স্পটলাইট *তবে কি জরুরি অবস্থা জারি করতে যাচ্ছে সরকার!*

*তবে কি জরুরি অবস্থা জারি করতে যাচ্ছে সরকার!*

284
*তবে কি জরুরি অবস্থা জারি করতে যাচ্ছে সরকার!*

*বাংলাদেশে করোনা সঙ্কটে প্রায় ৮০ দিন পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত করোনা সমস্যা সমাধানের কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং একের পর এক পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত, মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং অসচেতনতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন করোনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। করোনা সঙ্কটের শুরু থেকেই সরকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষকে সচেতন করে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে চেয়েছিলেন এবং সেজন্যেই সরকার কারফিউ বা লক ডাউনের পথে না গিয়ে সাধারণ ছুটির পথে গেছে। কিন্তু দেখা গেছে যে, মানুষ এই সাধারণ ছুটিকে খুব হালকাভাবে নিয়েছে। মানুষ এখনো করোনার ভয়াবহতা নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ সচেতন নয় বলেই মনে করা হচ্ছে এবং এই বাস্তবতায় সামনের দিনগুলোতে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে অনেকে।*

*অনেকেই মনে করছেন যে অনেক হয়েছে, এখন সরকারকে জরুরি অবস্থা জারি করা প্রয়োজন। কারণ জরুরি অবস্থা জারি না করলে মানুষকে এই করোনা সঙ্কটের ভয়াবহতা নিয়ে উপলব্ধি করানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে ১৪১ এর ‘ক’ তে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিসাক্ষরের ভিত্তিতে জরুরী অবস্থা জারি করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই জরুরি অবস্থা জারির সর্বোচ্চ সময়সীমা ১২০ দিন। এটা বহিরাক্রমণ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সঙ্কটের কারণে জরুরী অবস্থা জারি করা যায় বলে সংবিধানের ১৪১ এর ‘ক’ তে বলা হয়েছে। আর এই বিবেচনায় অনেকে মনে করছেন বহুত হয়েছে, এখন জরুরী অবস্থা জারি করা দরকার। কেন জরুরী অবস্থা জারি করা দরকার? কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা একাধিক কারণ দেখাচ্ছে। তাঁর মধ্যে হচ্ছে-*

*১. দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ: করোনার জন্যে জরুরি অবস্থা জারি করলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। এই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা এখন জরুরী এবং অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, প্রধানমন্ত্রীকে এখন আরো বেশি কঠোর হতে হবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। যেভাবে তিনি ছোট মন্ত্রীসভা গঠনের মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি করে ভার্চুয়াল আদালত গঠন করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে করোনা মোকাবেলায় অন্যান্য সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে।*

*২. কারফিউ জারি করা: করোনা মোকাবেলার জন্য সাধারণ ছুটি নয়, বরং কারফিউ জারি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর জরুরী অবস্থা জারি করলে কারফিউ জারি করা নিয়ে কোন আইনগত সমস্যা তৈরি হবেনা এবং যেহেতু জরুরী আইনে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর দাবি সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। কাজেই অবাধ চলাফেরা করা, ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ মৌলিক স্বাধীনতাগুলো যদি বন্ধ করা যায় তাহলে কারফিউ জারি করা সহজ হবে।*
*৩. গুজব ঠেকানো: করোনা সঙ্কটের থেকেও বড় সঙ্কট হিসেবে দেখা যাচ্ছে গুজব সন্ত্রাস। গুজব ছড়িয়ে সমাজের নানা স্তরে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে এবং এই জন্যেই জরুরী অবস্থা জারি করলে এই গুজব সন্ত্রাস ঠেকানো সহজ হবে।*

*৪. অযাচিত সমালোচনা বন্ধ করা: করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যর্থতা অবশ্যই আছে। কিন্তু কিছু কিছু সমালোচনা করা হচ্ছে অযৌক্তিক এবং অযাচিত। জরুরী অবস্থা গ্রহণ করলে এই অযৌক্তিক এবং অযাচিত সমালোচনা বন্ধ করা যাবে। কারণ এখন যে সঙ্কট সেই সঙ্কটে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখন সমালোচনা বা বিরুদ্ধাচারণের সময়ে নেই। বরং এখন সময় ঐক্যবদ্ধভাবে করোনা সঙ্কট এবং এই সঙ্কটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলা করা। কাজেই এই জন্যে এইসব অযাচিত সমালোচনা বন্ধের জন্যে জরুরী অবস্থা জারি করা প্রয়োজন।*

*৫. মানুষকে সঙ্কটের গভীরতা বোঝানো: মানুষ এখনো মনে করছে যে, করোনাতে তাঁর কিছুই হবেনা। মানুষজন ইচ্ছেমতো ঢাকার বাইরে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। মানুষ বাজারহাটে যাচ্ছে, কারণে অকারণে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্থাৎ এই করোনা সংকটটি কি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে তা মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে না। আর একারণে মানুষকে সঙ্কটের গভীরতা বোঝানোর জন্যে হলেও জরুরী অবস্থা জারি করা প্রয়োজন।*
*বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, এখন আমরা সবথেকে খারাপ সময়ে চলে এসেছি। এখন আমাদের সময় দ্রুত সময় ফুরিয়ে আসছে, আমাদের করোনা মোকবেলার সবগুলো অস্ত্র শেষ হয়ে যাচ্ছে- এই অবস্থায় আমাদের জরুরী অবস্থা জারির কোন বিকল্প নেই। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার সেই কঠিন পথে হাঁটবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।*

*দীর্ঘস্থায়ী যে সঙ্কটের মুখে বাংলাদেশ*
*করোনা সঙ্কট অন্যান্য দেশগুলোর জন্য এসেছে একটি আপদকালীন সমস্যা হিসেবে। ৩ মাস, ৫ মাস বা ৬ মাসের সঙ্কট হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য করোনা সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদি বহুমাত্রিক কিছু সঙ্কট সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এবং বাংলাদেশের জন্য চটজলদি এই সঙ্কটগুলো থেকে উত্তরণ করা জটিল হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশে গত মার্চ মাস থেকে যে করোনা সঙ্কট শুরু হয়েছে তা এখনো চলছে এবং এই সঙ্কট কতদিন চলবে সে সম্পর্কে কোন ধারণা পাওয়া যাচ্ছেনা। আর করোনা সঙ্কট শুধু একা আসছে না, সঙ্গে আনুষাঙ্গিক অনেক সমস্যা নিয়ে আসছে। বিশেষত অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভয়ঙ্কর স্থবিরতা নিয়ে এসেছে। আর একারণেই বাংলাদেশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে বলেই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি কিছু সঙ্কটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বা ইতিমধ্যে পড়া শুরু করেছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা যে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটগুলোর আশঙ্কা করছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-*

*১. চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে: করোনা সংক্রমণের কারণে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আভাস দিয়েছেন চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন যে, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা খুব শীঘ্রই ভেঙে পড়বে। কারণ করোনা রোগীর সংখ্যা যখন বাড়বে তখন হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগী ছাড়া অন্য রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবেনা। তাছাড়া তাঁরা মনে করছেন যে, বাংলাদেশে এখন বিপুল পরিমাণ চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। যত করোনা রোগী বাড়বে তত আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়বে। ফলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাঁরা এটাও মনে করছেন যে, করোনা চিকিৎসার জন্য টেস্টিং কিটসহ উপকরণ সঙ্কট দেখা দিবে এবং আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের ভেতর পড়বো। অনেকে মনে করছেন যে, ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত এই সঙ্কট আমাদের দেশে চলতে পারে।*

*২. অর্থনৈতিক সঙ্কট দীর্ঘ হবে: করোনা সঙ্কট শুরুর সাথে সাথেই অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরু হয়েছে। বিশ্বের সব দেশের জন্যেই এটা প্রযোজ্য যে, করোনা সঙ্কট একা আসে না, সাথে অর্থনৈতিক সঙ্কটও নিয়ে আসে। কারণ করোনা মোকাবেলায় লকডাউন এবং অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহ বন্ধ করে দিতে হয় এবং একারণেই আমাদের অর্থনৈতিক সঙ্কট ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং এই সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এই মানুষরা সহসা চাকরি পাবে এমন আশা করা যাচ্ছে না। বেশকিছু দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সমস্যা একটি বড় সমস্যা।*

*যদি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, যতদিন করোনা সমস্যা না যাবে ততদিন পর্যন্ত প্রান্তিক, দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দেয়া অব্যহত রাখা হবে। কিন্তু সরকার কতদিন সহায়তা দিবে? যদি করোনা সঙ্কট চার মাসের বেশি সময়ে গড়ায় তাহলে এই সহায়তা দেয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারি এমনকি কিছু বৃহৎ শিল্পের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হবে এই প্রত্যাশা করা যাচ্ছেনা। বাংলাদেশের করোনার আগের মতো অবস্থায় ফিরে যেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।*

*৩. রেমিটেন্স প্রবাহ সহসা ভালো হচ্ছে না: বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবথেকে বড় হাতিয়ার হচ্ছে বিদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিটেন্স। বৈশ্বিক করোনা সঙ্কটে বাংলাদেশের অভিবাসনে ধ্বস নেমেছে এবং বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কটের পথে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অভিবাসীরা খুব সহজেই বিদেশে যেতে পারবে এমন আশা করা দুরাশার নামান্তর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে যদি ঈদের কারণে কিছু রেমিটেন্স বেড়েছে, তবে তা আগামী মাসেই আবার কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমাদের অভিবাসন খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদী সঙ্কট তৈরি হবে তা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।*

*৪. রপ্তানী আয় হোঁচট খাবে: ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পোষাক খাতসহ বিভিন্ন খাতে ধ্বস নেমেছে এবং এই ধ্বস দীর্ঘমেয়াদী হতে যাচ্ছে। কারণ অন্যান্য দেশগুলো সঙ্কট কাটিয়ে উঠলেও তাঁদের যে অর্থনৈতিক সঙ্কট, সেই সঙ্কটের জন্য তাঁরা ক্রিচ্ছতার পথে যাবে এবং বাংলাদেশ থেকে পোশাকসহ যে অন্যান্য পণ্য আমদানি করবে, তা কমে যেতে পারে।*
*৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি: করোনা সঙ্কটের কারণে ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন সবথেকে বেশি সংক্রমিত হয়েছে। ফলে করোনা সঙ্কটের কারণে চুরি-ডাকাতি সহ অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে এবং সামগ্রিকভাবে একটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্কট তৈরি হবে এবং এই সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদী হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।*
*এই দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কটগুলো কাটিয়ে উঠে কবে বাংলাদেশ স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে সে এক কঠিন প্রশ্ন। তবে সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণের চটজলদি এবং সহজ কোন পথ নেই বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।*