প্রচ্ছদ রাজনীতি *আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব আর বিএনপিতে ঝড়*

*আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব আর বিএনপিতে ঝড়*

86
*আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব আর বিএনপিতে ঝড়*

*করোনা সঙ্কটে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ছন্দ হারিয়ে ফেলেছেন আবার অনেক নেতা পাদপ্রদীপে এসেছেন, জনগণ এবং দলের নেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশেষ করে নেতা এবং তৃণমূলের কাছে আস্থাভাজন হয়েছেন। সঙ্কটকালীন সময়ে যারা জনগণের পাশে থাকে, কর্মীদের পাশে থাকে তাঁরাই আলোচিত হন এবং তাঁদেরকে ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে ধরা হয়। আওয়ামী লীগে অবশ্য কাউন্সিল অধিবেশন হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে এবং কাউন্সিল অধিবেশনে দ্বিতীয়বারের মতো দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে দ্বিতীয়বারের পর ওবায়দুল কাদেরের আর সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আর কোন সুযোগ নেই এবং এরপরে আগামী কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ নতুন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করবে।*

*সেটা অনেক দূরের ব্যাপার হলেও এখন থেকেই আগামী সাধারণ সম্পাদক কে হতে পারে সেটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয় এবং এটাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির তাৎপর্যপূর্ণ দিক। এই বিবেচনায় যারা বেশি জনবান্ধব, যারা বেশি কর্মীবান্ধব এবং যারা বেশি তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তাঁদেরকেই এগিয়ে রাখা হয়। তাছাড়া এবারের করোনা সঙ্কটে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, হৃদরোগের অসুস্থতার পর ওবায়দুল কাদেরের চলাফেরা, দায়িত্ব পালন সবই সীমিত করা হয়েছে এবং তিনি এই করোনা সঙ্কটের পুরোটা সময় ধরে ঘর থেকে বের হননি। এটা তাঁর নিজের দোষ নয়, এটা স্বাস্থ্যগত বাস্তবতা এবং এই কারণেই আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্বের সূচণা হয়েছে। এই করোনা সঙ্কটে আওয়ামী লীগে কয়েকজন নেতা সামনে চলে এসেছেন যারা বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং কর্মকাণ্ডে তৃণমূল, জনগণ এবং নেতাকর্মীদের নজরে এসেছেন। এই কারণে আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্বের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। নতুন নেতৃত্বে কারা কি অবস্থানে আছে একটু দেখে নেয়া যাক-*

*ড. আব্দুর রাজ্জাক: ড. আব্দুর রাজ্জাক আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এবারের করোনা সঙ্কটে যাঁদেরকে সবথেকে বেশি সপ্রভিত এবং ব্যস্ত দেখা গেছে তাঁদের মধ্যে ড. আব্দুর রাজ্জাক অন্যতম। ড. আব্দুর রাজ্জাক মন্ত্রণালয়ের কাজের ক্ষেত্রে যেমন দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। সবসময় সামনে দেখা গেছে। তেমনি দলের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ এবং কৌশল নির্ধারণেও তাঁকে ব্যস্ত দেখা গেছে। ড. আব্দুর রাজ্জাক ধান উত্তোলন এবং কৃষকরা যেন ধান-চালের ন্যায্য মূল্য পান তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে হাওড় এলাকায় যখন ধান কাটা নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছিল, তখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেখানে সহায়তা পাঠানো এবং ধান কাটা যেন নির্বিঘ্নে হয় তা নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে কৃষকরা যেন ন্যায্য মূল্য পায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রেখেছেন। যেহেতু আওয়ামী লীগ একটি কৃষি বান্ধব দল এবং কৃষকরাই আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি, সেজন্য কৃষিমন্ত্রী হিসেবে ড. আব্দুর রাজ্জাকের এই পদক্ষেপ কর্মীদের মাঝে সাড়া ফেলেছে এবং তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধান কাটায় অংশগ্রহণ করেছে এবং সরকারি কার্যক্রমের সঙ্গে দলকে সম্পৃক্ত করেছেন।*

*জাহাঙ্গীর কবির নানক: জাহাঙ্গীর কবির নানক মন্ত্রী বা এমপি নন। কিন্তু করোনা সঙ্কটের সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের ঘরে বাতি জ্বালিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা যখন ঘরে ঢুঁকে গেছেন তখন তিনি অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যলয়ে নিয়মিত বৈঠক করে সারাদেশের মনিটরিং করা, ত্রাণ তৎপরতাসহ নানারকম কার্যক্রম কিভাবে হচ্ছে সে ব্যাপারে তদারকি করার উদ্যোগ নেন। সারাদেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগযোগ করেন এবং এই যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি নিজেকে পুনরায় প্রমাণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি নতুন নেতৃত্বের বড় দাবিদার হয়েছেন।*

*ড. হাছান মাহমুদ: ড. হাছান মাহমুদ একাধারে মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক। এবার তিনি পদোন্নতি পেয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ন সম্পাদক হয়েছেন। করোনা সঙ্কটের সময় যাঁদেরকে বেশি সপ্রতিভ দেখা গেছে, উজ্জ্বল দেখা গেছে তাঁদের মধ্যে ড. হাছান মাহমুদ অন্যতম। একদিকে যেমন তিনি গণমাধ্যমের বিভিন্ন সঙ্কট নিয়ে কথা বলেছেন, অন্যদিকে তেমনি তিনি বিরোধী দলের বিভিন্ন সমালোচনার জবাব দিতে কার্পণ্য করেননি। বিরোধী দলের বক্তব্য খণ্ডন করার ক্ষেত্রে তিনি মূখ্য কুশীলভের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এর ফলে তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্রে পরিণত হয়েছেন।*
*এই তিনজনই নিজ যোগ্যতা এবং গুণে করোনা সঙ্কটকালীন সময়ে পাদপ্রদীপে এসেছেন এবং আগামী সময়ে যদি তাঁরা তাঁদের আদর্শ এবং নীতি নিয়ে টিকে থাকতে পারেন তাহলে অবশ্যই তাঁরা বিবেচিত হতে পারেন।*

*পরিবর্তনের ঝড় আসছে বিএনপিতে*
*ঈদের পর বিএনপিতে বড় ধরণের পরিবর্তন আসছে। বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন যে বিএনপিতে পরিবর্তনের ঝড় আসছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির পর হঠাৎ চাঙ্গা হওয়া দলটির নেতা-কর্মীরা উদ্যমী হলেও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ প্রায় অচল এবং অকেজো হয়ে আছে। বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া দুজনই মনে করছেন যে দলকে চাঙ্গা করতে হলে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে যারা দলীয় কার্যক্রমে অনুপস্থিত, দলের কোন কর্মকাণ্ডে পাওয়া যায় না তাঁদেরকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্বের প্রবাহ সৃষ্টি করতে হবে। আর তাই করোনা সঙ্কটে নতুন করে প্রাণ পাওয়া বিএনপিতে এখন পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে।*

*বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি বেগম খালেদা জিয়া এখন বেশ সন্তুষ্ট। ২৫ শে মার্চ বেগম খালেদা জিয়া জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কয়েকদিন পরপরই তাঁকে গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে এবং সরকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছেনে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলেই বিএনপির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিএনপির আরেক নেতা সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব রুহুল কবির রিজভিও বেশ সরব ছিলেন। বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণসহ সরকারের সমালোচন করতে তাঁকে অত্যন্ত সরব দেখা গেছে।*

*এই দুই নেতার বাইরে বিএনপির অন্যান্য নেতাদের তেমন দেখা যায়নি। এছাড়া নজরুল ইসলাম খান মাঝে মাঝে এসেছেন, কিছু কথাবার্তা বলেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে পর্দার আড়ালে থাকতে দেখা গেছে। বেগম খালেদা জিয়া যেদিন মুক্তি পায় সেদিন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাসকে দেখা গেলেও এর কয়েকদিন বাদে তাঁরা লাপাত্তা হয়েছেন এবং দলের হাইকমান্ড এই জিনিসগুলো দেখেছেন। বিএনপির একজন নেতা বলেন যে, বেগম খালেদা জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন তিনি অনেককিছুই জানতেন না, দেখতেন না এখন তিনি সব খোঁজখবর নিচ্ছেন। লণ্ডনে পলাতক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়াও এখন সবকিছু দেখছেন।*

*যে সমস্ত নেতারা অকেজো, যারা দলের জন্য কোন কাজই করতে পারছেন না এবং কোন অবদান রাখতে পারছেন না তাঁদেরকে বাদ দিয়ে কাজ করতে পারে এরকম তরুণদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অনেকদিন যাবত বিবেচনায় ছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে এই কর্মসূচীগুলো বন্ধ হয়ে যায়। একজন নেতা আভাস দিয়েছেন যে, বিএনপির কাউন্সিল দীর্ঘদিন যাবত হয়না। এখন করোনা সঙ্কটকালে কাউন্সিল আয়োজন সম্ভব না হলেও প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সঙ্কট কেটে গেলে কাউন্সিল করে যেন নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হয় সে ব্যাপারে অনেক তৃণমূলের নেতাকর্মীরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।*

*অন্য একটি সূত্র বলছে যে, কাউন্সিল না হলেও দলের যেসব নেতাকর্মীরা অলস বসে আছেন, কাজ করছেন না বা দল করার কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না তাঁদেরকে আস্তে আস্তে সরিয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট মাহবুবুর রহমান নিজেই দলের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। ব্যরিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াঁ অসুস্থতার জন্য দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন না। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এই আছেন, এই নেই। তারপরেও তিনি দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তাঁকে এখনই দলের স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে না দলের হাইকমান্ড। কিন্তু অন্যান্য নেতৃবৃন্দ দলের কাজে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না।*

*কাজেই বিএনপিতে একটি বড় ধরণের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে স্থায়ী কমিটিসহ অন্যান্য অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোতে কর্মক্ষম এবং কাজ করতে পারদর্শী এমন নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে। বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন যে, বেগম খালেদা জিয়া এখন মুক্ত এবং বিএনপির সংগঠন গোছানোর এটাই শ্রেষ্ঠ সময় এবং সংগঠন গোছানোর ক্ষেত্রে যারা পারফর্মার তাঁদেরকেই গুরুত্ব দিবে বিএনপি। কারণ করোনা সঙ্কট নিয়ে সামনে আওয়ামী লীগ আরো চাপের মধ্যে পড়বে এবং তখন যদি বিএনপির সংগঠিত হয়ে সরকারকে ঝাঁকুনি দিতে চায় তাহলে নেতৃত্বের পরিবর্তন দরকার সবার আগে।*