প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *শিথিল ছুটির চরম মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশকে?*

*শিথিল ছুটির চরম মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশকে?*

66
*শিথিল ছুটির চরম মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশকে?*

*বাংলাদেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা শনাক্তের নতুন রোগীর সংখ্যা। করোনায় মৃত্যুর সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। আমরা যতই বলছি যে, বাংলাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে, বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু শনাক্ত, মৃত্যু কোনোটাকেই দাবিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এখন স্পষ্টত করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ বাংলাদেশে চোখ রাঙাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, ২৬ মার্চ থেকে যে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই ছুটি যথাযথভাবে পালিত না হওয়ার কারণে করোনার সামাজিক সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।*

*বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এটাকে ছুটি না বলে যদি লকডাউন বলা হতো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেত, তাহলে এই ছুটি হয়তো ভালো কাজে লাগতো। তারপরও ২৬ মার্চ থেকে ঘোষিত ছুটির প্রথম দিকে মানুষ ঘরে থাকলেও ক্রমশ ঘর থেকে বের হতে থাকে। এই ছুটির বারোটা বাজে যখন গার্মেন্টসসহ কলকারখানাগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সাথে সাথে সরকারি অফিস আদালত বা অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুলে দেওয়া হয়।*

*বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, ছুটির আসলে প্রথম ফাঁটল ধরে গত ৫ এপ্রিল যখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিজিএমইএ’র বৈঠকে গার্মেন্টসগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবং সে সময় গার্মেন্টস না খুললেও হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক ঢাকা শহরে আসতে শুরু করে। এখান থেকেই সামাজিক সংক্রমণের যে মহামারী, সেটার সূত্রপাত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পরবর্তীতে ২৬ এপ্রিল থেকে যখন গার্মেন্টসগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তারপর থেকে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই করোনার সংক্রমণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও অজানা আতংকে ভুগছেন।*

*বাংলাদেশে গত দুই সপ্তাহে প্রতি ৪৮ ঘন্টায় এক হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এখন তা দেড় হাজার অতিক্রম করেছে। আমরা যদি দেখি যে, ২৭-২৮ এপ্রিল দুই দিনে ১ হাজার ৪৬ জন নতুন শনাক্ত ছিল। তার পরের ৪৮ ঘন্টায় ১ হাজার ৮৭ জন। তার পরের ৪৮ ঘন্টায় ১১শ’ ২৩ জন। ৩-৪ মে’তে ১৩শ’ ৫৩ জন। ৫-৬ মে’তে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৫শ’ ৭৬ জন। আর ৭-৮ মে’তে ১৪শ’ ১৫ জন এবং সর্বশেষ দুই দিন অর্থাৎ ৯-১০ এপ্রিল ১৫শ’ ২৩ জন শনাক্ত হয়েছে।*

*এই উল্লম্ফন যদি হতে থাকে তাহলে বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়বে। আর এই বাড়াটাই হলো বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক।*
*বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত গড়ে যত পরীক্ষা হয়েছে, সেই পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের সংখ্যা ১১.৯৪ অর্থাৎ প্রায় ১২ শতাংশ হারে পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেখানে গত ২৪ ঘন্টায় ৫ হাজার ৭৩৮ জনের পরীক্ষা করে প্রায় সাড়ে ১৫ শতাংশ মানুষের করোনা শনাক্ত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে সামাজিক সংক্রমণ যে ব্যাপক বিস্তৃত হচ্ছে, সেটার একটা বড় প্রমাণ হলো শনাক্তের শতকরা হার বৃদ্ধি।*

*এখন বাংলাদেশে ১৪ হাজারের উপরে করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে গবেষণা তাতে দেখা যাচ্ছে যে, আক্রান্তের ২০ শতাংশ জটিল অবস্থায় যায়। জটিল অবস্থায় গেলে তাদের অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি দিতে হয়। আর ৫ শতাংশ মুমূর্ষু অবস্থায় চলে যায়। আর তাই বাংলাদেশে যখন যত রোগীর সংখ্যা বাড়বে তত এই মুমূর্ষু রোগী এবং জটিল রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। আমাদের যে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তার পক্ষে এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ এখনও সরকারের হাসপাতালগুলো প্রস্তুতির পর্যায়ে, চিন্তা-ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকার ঢাকা মেডিকেল কলেজে কোভিড চিকিৎসা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেমনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা, কোভিড চিকিৎসা এবং নন কোভিড চিকিৎসা আলাদা আলাদা করার জন্য। কিন্তু এগুলো আয়োজন করতে করতে করোনার দমকা বাতাস আমাদের সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।*

*করোনার তাণ্ডব হলে বাংলাদেশকে যে কারণে চরম মূল্য দিতে হবে তার মধ্যে রয়েছে- আমাদের চিকিৎসা কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। অনেক চিকিৎসকই আক্রান্ত হয়েছেন। আরও বেশি আক্রান্ত হলে আমরা একটা চিকিৎসাবিহীন রাষ্ট্রের দিকে চলে যাব। যদি রোগীর সংখ্যা বাড়ে আমাদের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বন্ধ হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য আবার লকডাউন দিতে হবে।*
*আমরা অর্থনীতিকে সচল করার যে আকাঙ্ক্ষা থেকে ছুটি শিথিল করেছিলাম সেই আকাঙ্ক্ষা তো বাস্তবায়িত হবেই না, বরং সামগ্রিকভাবে আমরা করোনার কড়াল গ্রাসে একটা গভীর অর্থনৈতিক সংকটের আবর্তে ঢুকে যেতে পারি। এরকম একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।*
*তাই এখন আমাদেরকে দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এই হার যদি ঈদ পর্যন্ত বাড়তে থাকে তাহলে ঈদের পর আমরা কী করবো সে সম্পর্কে।*