প্রচ্ছদ স্পটলাইট *সরকারের ভেতরে বসেই কারা-কিভাবে অস্থিরতা তৈরি করছে?*

*সরকারের ভেতরে বসেই কারা-কিভাবে অস্থিরতা তৈরি করছে?*

98
*সরকারের ভেতরে বসেই কারা-কিভাবে অস্থিরতা তৈরি করছে?*

*করোনা মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকার পরস্পরবিরোধী, স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, নির্দেশনা দিচ্ছে। এইসমস্ত সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা সমালোচিত হচ্ছে এবং এর ফলে কাজগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, অনেক কাজই লেজেগোবরে হয়ে যাচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে না। যখন করোনা সংক্রমণ শুরু হলো, তখন থেকেই সরকারের মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।*

*প্রথমেই যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো, মন্ত্রীপরিষদের সচিব এটাকে ছুটি বললেন এবং বললেন যে এটা সামাজিক দুরত্ব। কিন্তু ছুটির সঙ্গে সঙ্গে যে সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করার জন্য মানুষ ঢাকা থেকে বেরিয়ে না যায় বা অন্য জেলার মানুষ যেন ঢাকায় প্রবেশ না করে তা নিশ্চিত করার জন্য যে গণপরিবহন বন্ধ করার দরকার ছিল, সেটা তারা করেননি। ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ উপচে পড়ে কমলাপুর রেল স্টেশনে, লঞ্চ ঘাটে এবং বাস স্ট্যান্ডে। তখন পর্যায়ক্রমে গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়। এরকম স্ববিরোধীতা এখন সর্বক্ষেত্রে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যতই সময় যাচ্ছে, ততই সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা এবং স্ববিরোধীতা লক্ষ্যণীয়। আসুন দেখা যাক করোনা মোকাবেলায় সরকারের প্রধান পাঁচটি স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত-*

*ছুটি বনাম গার্মেন্টসসহ শিল্প কলকারখানা খোলা: সরকার একের পর এক ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানা যাচ্ছে যে, ৬মে যে ছুটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে তা আবার বাড়ানো হচ্ছে এবং এটা ১৬মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে। একদিকে ছুটি বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে গার্মেন্টসসহ শিল্প কারখানাগুলো খুলে দেয়া হচ্ছে- এই সিদ্ধান্তটা অবশ্যই স্ববিরোধী। কারণ গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার কারণে সারাদেশের শ্রমিকরা পড়িমরি করে ঢাকায় আসছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা দুরত্বের কোন বালাই থাকছে না, লঞ্চ, ট্রাক বা ফেরীতে যে যেভাবে পারছে অবাধে ছুটে আসছে। এর ফলে সাধারণ ছুটিটা একটি হাস্যকর প্রহসনে পরিণত হয়েছে। সরকার যদি ছুটি প্রদান করবে, তাহলে এভাবে সবকিছু খুলে দেওয়ার অর্থ কি?*

*ঢাকার শ্রমিক বনাম কার্ড দিয়ে ঢাকায় ঢুকবে: সরকার যখন গার্মেন্টস খোলার অনুমতি দিলো, তখন গার্মেন্টস মালিকদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করলো এবং সেই বৈঠকে গার্মেন্টস মালিকরা জানালেন যে, শুধুমাত্র ঢাকার আশেপাশের শ্রমিকদের দিয়ে তাঁরা গার্মেন্টস চালাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন যে শুধুমাত্র ঢাকার আশেপাশের শ্রমিকদের দিয়ে সীমিত আকারে গার্মেন্টস চালানো হবে। কিন্তু তাঁর দুইদিন পরেই দেখা গেল যে সরকারের আরেকটি বিভাগ থেকে নির্দেশ দেওয়া হলো, যে সমস্ত শ্রমিক ঢাকায় আসছে, তাদেরকে অবশ্যই ওই পোষাক কারখানার আইডি কার্ড দেখাতে হবে। তাহলে দুটো সিদ্ধান্ত কি স্ববিরোধী নয়?*

*১৮ মন্ত্রণালয়ের খোলা বনাম কাজ ছাড়া অফিসে আসবেন না: সরকার সীমিত আকারে কাজ শুরু করেছিল, পঞ্চম দফা ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। এসময় ১৮ টি মন্ত্রণালয় খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই মন্ত্রণালয়গুলোতে আসলে কাজের কোন গতি প্রকৃতি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। কারণ এই মন্ত্রণালয়গুলো খোলার পরপরই আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আর অধিদপ্তর তাঁদের কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে, কাজ ছাড়া অফিসে আসবেন না। ফলে ঐ ১৮ টি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একটি ভ্রমের মধ্যে পড়েছে যে, তাঁদের কি আসলে ছুটি নাকি তাঁরা অফিসে যাবেন। এই পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি অস্বস্তিতে পড়েছেন অনেক সরকারি কর্মকর্তা।*

*দূর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বনাম দূর্নীতিবাজকে ধরিয়ে দেওয়ায় শাস্তি: সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে, করোনার সময়ে যে দূর্নীতি করবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তিনি জিরো টলারেন্সের কথা বলেন একাধিক বক্তব্যে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই মহানগর হাসপাতালে যে এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ হয়েছে তা আসল নয় বলে ভিডিও কনফারেন্সে উল্লেখ করেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর যে অবস্থান, সেই অবস্থানের সম্পূর্ণ বিরোধী অবস্থানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যারা এন-৯৫ মাস্ক জালিয়াতির প্রতিবাদ করেছে, তাঁদেরকেই এখন শাস্তির খড়গে পড়তে হচ্ছে এবং দুইজন পরিচালককে ইতিমধ্যে শাস্তি দেয়া হয়েছে। এই দুটি সিদ্ধান্ত পরস্পরবিরোধী।*

*দূর্গতদের তালিকা নিয়ে স্ববিরোধীতা: ত্রাণ যাদের দেয়া হবে, তাঁদের তালিকা কিভাবে তৈরি হবে তাই নিয়ে স্ববিরোধীতা তৈরি হচ্ছে। একটি নির্দেশনায় দেখা যাচ্ছে যে, তালিকা তৈরি হবে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে, প্রশাসনিকভাবে। আবার আওয়ামী লীগের এমপি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তালিকা সংগ্রহ করছেন। অর্থাৎ দুটো সিদ্ধান্ত পরস্পরবিরোধী এবং কোনটি সঠিক তা নিয়ে নানারকম সংশয় তৈরী হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্গতদের তালিকা তৈরি করা নিয়ে এক ধরণের সমন্বয়হীনতা শুরু থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।*

*এরকম অনেক্ষেত্রেই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে সরকারের অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে। অথচ করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে দরকার সবার সম্বিলিত, সমন্বিত এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে নির্দেশনা দিচ্ছেন, সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করলেই করোনা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও আমরা দেখছি এই ধরণের অস্থিরতা, স্ববিরোধিতা এবং সমন্বয়হীনতা।*