প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *গার্মেন্টস খোলা, মসজিদ বন্ধ কেন?*

*গার্মেন্টস খোলা, মসজিদ বন্ধ কেন?*

31
*গার্মেন্টস খোলা, মসজিদ বন্ধ কেন?*

*বাংলাদেশে ছুটি নিয়ে এক অদ্ভুত নাটক চলছে এবং ছুটিটা ক্রমশ একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। ২৬শে মার্চ থেকে যে সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছিল তা পাঁচ দফা বাড়িয়ে ৫ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছিল। আজ আবার ছুটির মেয়াদ আরেকদফা বাড়ানো হলো, অর্থাৎ ষষ্ঠ দফায় বাড়ানো হলো এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ১৫ মে পর্যন্ত এই ছুটি বলবৎ থাকবে। ১৫ই মে বৃহস্পতিবার, ১৬ মে শুক্রবার, ১৭ মে শনিবার- অর্থাৎ ঈদের আগে আর অফিস আদালতে কাজকর্ম শুরু হবার সম্ভাবনা একেবারেই কম। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, এই ছুটির অর্থবহতা নিয়ে, এই ছুটি কতটা প্রয়োজন তাই নিয়ে। কারণ ষষ্ঠ দফায় ছুটি যখন ঘোষণা করা হলো, তখন সাথে সাথে খুলে দেয়া হয়েছে দোকানপাট এবং শপিং মল।*

*বলা হয়েছে যে, শর্ত সাপেক্ষে দোকানপাট এবং শপিং মল খোলা থাকবে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত লোকজন সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা করতে পারবে। এর আগে গার্মেন্টস খুলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও গার্মেন্টস খোলা রাখা হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকরা বলেছিল তাঁরা সীমিত আকারে গার্মেন্টস চালু করবে। কিন্তু সীমিত আকারে গার্মেন্টস চালু করতে গিয়ে তাঁরা সারাদেশের সকল গার্মেন্টস শ্রমিকদের টেলিফোন করে বলেছে যে অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে হবে, নাহলে চাকরি চলে যাবে। চাকরি হারানোর ভয়ে যে যেভাবে পেরেছে, সামাজিক সংক্রমণের ভয়াবহ আবহ তৈরি করে তাঁরা পড়িমরি করে ছুটে এসেছে।*

*আবার সরকারি ১৮ টি মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে খুলে দেয়া হয়েছে। যার ফলে রাস্তাঘাটে এখন অনেক বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যায়। একদিকে বাজারহাট খোলা, অন্যদিকে সরকারি মন্ত্রণালয় খোলা, গার্মেন্টস খোলা- ফলে সামগ্রিকভাবে এই ছুটি একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এই ছুটির অর্থ কি, কেন ছুটি? যখন ৮ মার্চ করোনার সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তখন সারাদেশে সমাবেশ বা গণজমায়েতের মতো কর্মসূচী বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং এখনো এই ছুটি অব্যহত রয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে ছুটি চলবে যদি ১৫ মে পর্যন্তও ছুটি থাকে। কিন্তু এই ছুটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী মহলের চাপে গার্মেন্টস খুলে দেয়া হয়েছে। বলা হলো যে, বিদেশি বায়ারদের অর্ডার বাতিল হয়ে যাবে, তাই গার্মেন্টস খোলা হবে। গার্মেন্টস খোলার মাধ্যমেই আসলে ছুটির বারোটা বাজানো হয়েছে, দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন যে যেভাবে পারে, সেভাবে ঢাকায় এসেছে।*

*প্রথমদিনের ছুটি থেকেই ব্যাংক খোলা ছিল, জরুরী সেবামূলক সার্ভিসগুলো খোলা ছিল, হাসপাতাল সেবার কার্যক্রমের সাথে যারা যুক্ত তাদেরও ছুটি ছিল না। এখন এই ছুটিটি প্রায় উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। এই ছুটিটি আসলে কার জন্যে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর এতে করোনার যে ভয়াবহ সংক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি হলো, তাঁর জবাব কে দেবে?*
*করোনার সংক্রমণ রোধ করার জন্য ঘরে থাকা জরুরি, জরুরি সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা। আর সেজন্যেই ছুটি দেয়া হয়েছিল। তবে যখন গার্মেন্টস খোলা থাকছে, দোকানপাটগুলো খুলছে এবং হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো খুলে দেয়া হয়েছে তখন এই ছুটির দরকারটাই বা কি এবং কেন এই ছুটি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আর এই কারণেই প্রশ্ন উঠেছে যে, গার্মেন্টস যখন খুলে দেওয়া হয়েছে, শপিংমল খুলে দেওয়া হলো, তাহলে মসজিদ বন্ধ কেন?*

*কারণ গত কয়েকদিনের সরেজমিনে যেটা দেখা গেছে যে, গার্মেন্টসে যেভাবে শ্রমিকরা ঢুকছে, বের হচ্ছে এবং কাজ করছে তাতে সামাজিক দুরত্বের কোন বালাই নেই। সামাজিক সংক্রমণের ব্যাপক শঙ্কা নিয়েই গার্মেন্টসগুলো চালু হয়েছে। সেদিক থেকে মসজিদগুলো অনেক নিরাপদ বলেই মনে করে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে যদি বলা হতো যে সামাজিক সুরত্ব বজায় রেখে মসজিদে জামায়াতে নামায আদায় করতে হবে, তাহলে নিশ্চয়ই মানুষ সামাজিক দুরত্ব মেনে পড়তো।*

*তাছাড়া মসজিদে একটি নির্দিষ্ট অল্প সময়ের জন্য যাচ্ছে এবং সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা একটি বড় অনুষঙ্গ হিসেবে থাকে। আর সেকারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমশ প্রশ্ন উঠছে যে, এই ছুটি যেমন অর্থহীন, তেমনি গার্মেন্টস-শপিং মল খুলে দিয়ে মসজিদ বন্ধ রাখাও অর্থহীন। তাহলে আমরা সবকিছুই খুলে দেই না কেন? যেভাবে করোনা সংক্রমিত হচ্ছে, হবে। আমাদের যা হওয়ার হবে, কারো কোন দায় নেই। কারণ এই ছুটিতে যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প কারখানাগুলোর যে ক্ষতি হচ্ছে, সেই ক্ষতি পোষানোর জন্য কেউ নেই যেমন, তেমনি এই ছুটিতে সাধারণ মানুষকেও ঘরে রাখা হবে এমন নিশ্চয়তাও নেই। তাই এটা কি ছুটি নাকি প্রহসন, সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।*

*পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হ’ত্যা করার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচারগুলো হয়েছে তার সবচেয়ে বড়টি হলো ধর্ম নিয়ে। পঁচাত্তরের পরে আওয়ামী লীগকে ধর্মহীন পৃষ্টপোষক রাজনৈতিক দল হিসেবে আখ্যা দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল। এমনকি ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে এখানে উলুধ্বনি শোনা যাবে, মসজিদ সব বন্ধ হয়ে যাবে। সব সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র ব্যবহার করা হয় ধর্ম নিয়ে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগই ইসলাম এবং ধর্মের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে।*
*যারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তাদের নীলনকশার অংশ হিসেবেই কি এখন গার্মেন্টস খুলে মসজিদ বন্ধ রাখা হচ্ছে? যেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার নতুন করে ডানা মেলে? এই সুযোগ যারা করে দিচ্ছে তারা কি ভেতরে থেকেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে?*