প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য *পিপিই কেন, পিপিই নিয়ে যত বিভ্রান্তি!*

*পিপিই কেন, পিপিই নিয়ে যত বিভ্রান্তি!*

14
*পিপিই কেন, পিপিই নিয়ে যত বিভ্রান্তি!*

*করোনা ভাইরাসের এই ক্রান্তিকালে আমরা সাধারণ মানুষ যেসব নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, তার মধ্যে অন্যতম হলো পিপিই (পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট)। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম। স্পেসস্যুটের মতো দেখতে এই পোশাকটি নিয়ে আমাদের দেশে চলছে নানা বিভ্রান্তি। প্রথম কথা হলো, চিকিৎসক অর্থাৎ যারা করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেবেন, তাদের জন্যই পিপিই। সেই সঙ্গে নার্স, ওয়ার্ড বয়সহ যারা রোগীর সংস্পর্শে যাবেন তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ‘পিপিই’ ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে।*

*কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে পিপিই যদি সুরক্ষাই দেয়, তাহলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন? পিপিই কতক্ষণ সুরক্ষা দিতে পারে? এটা বানানোই বা হয় কী দিয়ে? পিপিই সম্পর্কে এসব প্রশ্ন নিয়েই বাংলা ইনসাইডার কথা বলেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি পিপিই নিয়ে বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় জানিয়েছেন আমাদের। জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত-*

*পিপিই কেন?: পিপিই তে মূলত ৫টি জিনিস থাকে। এগুলো হলো- ১. মুখের আবরণ (ফেস শিল্ড)। ২. চোখ ঢাকার জন্য মুখের সাথে লেগে থাকে এমন চশমা বা গগলস। ৩. মাস্ক। ৪. গ্লাভস। ৫. জুতার কভারসহ গাউন।*
*ডা. ওয়াদুদ বলেন, করোনাভাইরাসটা মূলত রেস্পিরেটরি ভাইরাস। এর মানে হলো এটা শ্বাসতন্ত্র দিয়ে ঢুকবে। এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার পথটা হলো নাক, মুখ এবং চোখ। সুতরাং আমাদের মূলত সুরক্ষা দরকার গলা থেকে উপর পর্যন্ত। এজন্য দরকার মুখের আবরণ (ফেস শিল্ড), চোখ ঢাকার জন্য মুখের সাথে লেগে থাকে এমন চশমা বা গগলস এবং মাস্ক। এরপর দরকার হাতের সুরক্ষা। এর কারণ হলো, সমীক্ষা বলে মানুষ ঘন্টার মধ্যে ৩০ বার মুখের এলাকায় হাত দেয়। কাজেই একটা গ্লাভস যদি পড়া থাকে তাহলে খেয়াল থাকবে যে, আমার হাতে কিছু পড়া আছে, তাই চট করে নাক, মুখ, চোখে হাত যাবে না। আমি কিছু ধরতে গেলে খেয়াল হবে যে আমি কিছু ধরতে যাচ্ছি, সাবধান থাকতে হবে। এটার জন্যই গ্লাভস। গ্লাভস আসলে ভাইরাস প্রতিরোধী না।*

*ডা. ওয়াদুদ আরও বলেন, পিপিই হিসেবে গলার নীচের অংশ থেকে বাকি যে পোশাকগুলো আমরা পরি, অর্থাৎ জুতার কভারসহ গাউন। এর কারণ হলো, যখন আমরা রোগীদের দেখি বা ওয়ার্ডে যাই তখন তাদের হাঁচি কাশি থেকে ড্রপলেট আমার জামা কাপড়ে লেগে যেতে পারে। সেই জামা কাপড় পরেই আমি বাড়িতে ফিরবো বা সহকর্মীদের সাথে বসবো। তখন তাদের মাঝেও করোনার সংক্রমণ হতে পারে। এ কারণেই চিকিৎসকদের পিপিই’র বাকি অংশটা অর্থাৎ গাউন পরা উচিৎ। এটা যতটা না নিজের সুরক্ষা, তার চেয়ে বেশি হলো অন্যের সুরক্ষার জন্য। রোগী দেখা শেষ হলে বা হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় গাউনটা খুলে ফেললে অন্তত এতটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আমি কোনো ড্রপলেট সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি না।*

*কী দিয়ে তৈরি?: পিপিই তৈরিতে এমন কাপড় ব্যবহার করা হয়, যা কোনোভাবেই তরল শুষে নেবে না। এটি এমন পদার্থে তৈরি যাতে তা কোনো ধরনের তরলকে ধারণ না করে এবং সেটা গড়িয়ে পড়ে যায়। অর্থাৎ পিপিইকে সম্পূর্ণ শুষ্ক রাখে, এমন উপাদান দিয়েই পিপিই তৈরি করা হয়।*
*চিকিৎসকদের জন্য অবশ্যই যেটা দরকার…*
*ডা. ওয়াদুদ বলেন, চিকিৎসকদের জন্য সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার সেটা হলো ভালো মানের এন-৯৫ মাস্ক, গগলস। সেই সঙ্গে ফেস শিল্ড। ফেস শিল্ড আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে। এটার দামও খুব বেশি না। কাজেই হাসপাতালগুলো চাইলেই চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ফেস শিল্ডের ব্যবস্থা করতে পারে।*

*চিকিৎসকরা কেন আক্রান্ত হচ্ছেন?*
*ডা. ওয়াদুদ বলেন, বিদেশে আমরা যেটা দেখছি, যে আইসিইউ’তে যারা কাজ করছেন তারাই বেশি করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কারণ ডাক্তার বা নার্সরা যখন রোগীর নেবুলাইজ করতে যাচ্ছেন, বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের লাইন দিতে যাচ্ছেন তখন জীবাণুটা তাদের মধ্যেও চলে আসছে। আমাদের দেশেও সংকটাপন্ন রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে এমনটা ঘটছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বিদেশে চিকিৎসকদের হ্যাজমাট স্যুট দেওয়া হচ্ছে। দুর্ভাগবশত এটা আমাদের দেশে নেই। এটা নিয়ে কথা বলেও লাভ নেই।*

*এন-৯৫ মাস্ক কতদিন, কীভাবে ব্যবহার করা যায়?*
*এন-৯৫ মাস্ক হলো মূলত চিকিৎসা কর্মীদের ব্যবহার করার মাস্ক, যা বাতাসের ৯৫ শতাংশ ক্ষুদ্র কণা আটকে রাখতে সক্ষম।*
*এই মাস্কের ব্যাপারে ডা. ওয়াদুদ বলেন, এন-৯৫ খুব দামী মাস্ক। এটা পাওয়াও যায় না। শুধু আমাদের দেশই নয়, বিদেশেও এই মাস্কের সংকট আছে। এক্ষেত্রে আমরা যেটা করতে পারি সেটা হচ্ছে, আমার যদি তিনটা মাস্ক থাকে তাহলে একেকদিন একেকটা বদলে পরতে পারি। অর্থাৎ একজন চিকিৎসক তার দিনের কাজ শেষে মাস্কটি বাতাসে শুকিয়ে নিতে পারেন। তিনদিন পরে সেটা আমি আবার ব্যবহার করতে পারি।*

*বিদেশে এটা হাইডড়োজেন পার অক্সাইড ভেপার দিয়ে এই মাস্ক পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এত সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা বাতাসে শুকিয়ে নিয়ে তিনদিন পর এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহার করতে পারি। এভাবে একেদিন বদল করে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত একটি মাস্ক ব্যবহার করা যায়। শুধু একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, এই অবশ্যই ৭২ ঘন্টা বাতাসে শুকিয়ে নিতে হবে। এই মাস্ক অবশ্যই ভেজানো যাবে না। রোদেও দেওয়া যাবে না। তবে এন-৯৫ ব্যবহার করার সময় এর উপরে আরেকটি সার্জিকাল মাস্ক পরা যেতে পারে। এতে করে এন-৯৫ মাস্কটি পরিষ্কার থাকবে।*

*গ্লাভস প্রসঙ্গে…*
*আমাদের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে, গ্লাভস পড়লে বোধহয় হাত ধুতে হয় না। এ প্রসঙ্গে ডা. ওয়াদুদ বলেন, গ্লাভস পড়লেও বারবার হাত ধুতে হবে। ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি দরকার। একজন রোগী দেখার পরই তাকে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। গ্লাভসের উপর থেকেই হাত ধুতে হবে যেন সেটাতে জীবাণু লেগে না থাকে।*
পিপিই কি ধুয়ে ব্যবহার করা যায়?
*পিপিই কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। ডিসপজেবল পিপিই আছে, ওয়ান টাইম পিপিই যেমন আছে। তেমনি রিইউজেবল পিপিই আছে। রিইউজেবল পিপিই ধুয়ে ব্যবহার করা যায়। এটা একবার ব্যবহারের পর ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর বাতাসে ভালোভাবে শুকিয়ে সেটা ব্যবহার করা যাবে।*

*পিপিই পরে কতক্ষণ সুরক্ষিত থাকা সম্ভব?*
*চিকিৎসকরা পিপিই কতক্ষণ সুরক্ষা দেবে তার থেকে বড় প্রশ্ন হলো, পিপিই পরে কতক্ষণ থাকা সম্ভব? কারণ আমাদের দেশে যে তাপমাত্রা তাতে করে আধা ঘন্টা পিপিই পরে থাকাটাই কষ্টকর। এসি রুমে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা এটা পরে থাকা যায়। কিন্তু সেখানেও সমস্যা আছে, তা হলো- পিপিই পরে টয়লেটে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার একটা পিপিই একবার খোলা মানে সেটা আর পরা যাবে না। রিইউজেবল হলে সেটাকে ধুয়ে পরতে হবে। নাহলে সেটাকে ফেলে দিতে হবে। এজন্য বিদেশে এখন ডাক্তাররা বাধ্য হয়ে ডায়াপার ব্যবহার করছেন, যেন তাদের টয়লেটে যেতে না হয়।*

*সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পিপিই পরা এবং খোলার নিয়ম জানা…*
*ডা. মওদুদ বললেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পিপিই সঠিকভাবে পরা এবং খোলার নিয়মটা জানা। সারাদিন পিপিই পরে থেকে সেটা যদি সঠিকভাবে না খোলা হয়, তাহলে জীবাণুটা হাতে বা শরীরের অন্য কোথাও লেগে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পিপিই পরার কোনো মানেই থাকলো না। এজন্য চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ওয়ার্ডবয় ক্লিনারসহ যারা রোগীর সংস্পর্শে যাচ্ছেন তাদের অবশ্যই মাস্ক, গ্লাভসসহ পুরো পিপিই সঠিকভাবে খুলতে হবে।*