প্রচ্ছদ আইন-আদালত *ক্ষ’মতাশালীদের বিচার করার ক্ষ’মতা কি সরকার রাখে?*

*ক্ষ’মতাশালীদের বিচার করার ক্ষ’মতা কি সরকার রাখে?*

58
*ক্ষমতাশালীদের বিচার করার ক্ষমতা কি সরকার রাখে?*

*আমলারা বাংলাদেশে যেন বিচারের উর্ধ্বে উঠে গেছে। তাঁরা কোন অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে তাঁদের কোন বিচার করা হয়না। সম্প্রতি সরকার একটি আইন করেছে যে, দূর্নীতি বা অন্য কোন অভিযোগে কোন আমলা অভিযুক্ত হলে সরকারী অনুমতি ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাবেনা। এই আইনটিকে সংবিধানের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। কিন্তু বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও এই আইনটি করা হয়েছে এবং এর আগে আমলাদের দায় মোচন করা হয়েছিল কুইক রেন্টাল প্রকল্পের সময়ে। বিদ্যুত বিভাগ তখন বিদ্যুত সঙ্কট মোকাবেলার জন্য কুইক রেন্টাল প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। সেই প্রকল্পের বিরুদ্ধে যদি কোন সময় মামলা হয়, সেই মামলা থেকে আমলাদেরকে দায় মোচন দেয়া হয়েছিল।*

*একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাংলাদেশে গত কয়েকবছরে লক্ষ করা যাচ্ছে। যেন আমলারা সবকিছুর উর্ধ্বে, তাঁরা অপরাধ করলে বিচার করা যাবেনা, দূর্নীতি করলে প্রচলিত আইনে কোন বিচার হবেনা। শুধুমাত্র বিভাগীয় তদন্ত আর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভঙ্গের কিছু শিষ্টাচার মেনেই আমলারা পার পেয়ে যাচ্ছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দূর্বিনীত হয়ে উঠেছে আমলাতন্ত্র। যার সর্বশেষ উদাহরণ দেখলাম পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইকা শাহাদাতের বদলির আদেশ প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে। তাঁকে ১৫ টন চাল কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছিল কিন্তু এই প্রত্যাহার করার ১ দিনের মাথায় তাঁকে আবার তাঁর দায়িত্বে বহাল রেখে প্রত্যাহার আদেশ বাতিল করা হয়। অথচ সেই ঘটনায় ইউপি চেয়ার‍ম্যানের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে। এই ঘটনাটি এই প্রথম নয়, নতুন নয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে এবং টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে। এই সময় আমরা আমলাতন্ত্রের দূর্বীনীত রূপ দেখছি এবং তাঁরা যেন সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে গেছে তাঁর কয়েকটি উদাহরণ আমরা এখানে উল্লেখ করছি-*

*১. কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের অপরাধ: কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ দুইজন অধস্তন কর্মকর্তা রাতের আধারে সাংবাদিক আরিফুর রহমানের বাসায় যায়। সেখানে তাঁরা ভূয়া মাদকবিরোধী অভিযানের নামে আরিফকে ধরে নিয়ে এসে বেদমভাবে মারধর করে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এর শাস্তি কি হলো? সুলতানা পারভীনকে শুধুমাত্র ওএসডি করা হলো। এখন পর্যন্ত এই সুলতানা পারভীন আইনের আওতায় এসেছেন, গেপ্তার হয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে- এমন তথ্য, প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। অথচ একজন সাধারণ নাগরিক বা রাজনীতিবিদ যদি এই অপরাধ করতো, তাহলে নির্ঘাত তাঁকে জেলে যেতে হতো।*

*২. জামালপুরের জেলা প্রশাসকের নারী কেলেঙ্কারি: গত বছরের আগস্টে নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবির। সেই অভিযোগের জন্য তদন্ত কমিটি করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে চাকরীচ্যুত করা হয়। অথচ তাঁর অপরাধটি ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডনীয় অপরাধ, আহমেদ কবিরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কোন মামলা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।*

*৩. জিকে শামীম কেলেঙ্কারি: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিভাগে জিকে শামীমের রাজত্বের কথা প্রকাশ্যে আসে যখন তাঁকে গ্রেপ্তার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। গ্রেপ্তার হওয়ার পরেই দেখা যায় যে শুধু জিকে শামীম একা নন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিভাগে আমলাতন্ত্রের একটি সিন্ডিকেট তাঁকে লালনপালন এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছিল। যে কারণে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বিভাগে অঘোষিত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। জিকে শামীম গ্রেপ্তার হলেও এই ঘটনায় যত প্রভাবশালী আমলারা ছিলেন, তাঁরা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন।*

*৪. মুক্তিযুদ্ধের জাল সার্টিফিকেট: ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে দূর্নীতি দমন কমিশন পাঁচজন সচিবের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে। যাদের বিরুদ্ধে এই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মূখ্য সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক স্বাস্থ্য সচিব নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকি, সাবেক বিজ্ঞান প্রযুক্তি সচিব আমির হোসেন। এই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় স্বাস্থ্য সচিব, মুক্তিযোদ্ধা সচিব এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি সচিবকে চাকরি থেকে অবসর দেয়া হয়- এইটুকুই। তবে মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলেই আমরা জানি এবং এই পাঁচ সচিব এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছে। অথচ সার্টিফিকেট জালিয়াতি একটি গর্হিত ফৌজদারি অপরাধ হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে কোন মামলা করা হয়নি।*

*৫. পদক কেলেঙ্কারি: মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে যখন কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকি সচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন বিদেশি অতিথিদেরকে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে যে সম্মাননা পদক দেয়া হয়েছিল, সেই সম্মাননা পদকের সোনায় খাদের পরিমাণ বেশি ছিল। এই নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন হয় এবং তাতে প্রমাণিত হয় যে, সোনায় ভেজাল ছিল। এটিও একটি ফৌজদারি অপরাধ, ঐ সচিব এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি।*

*এই ঘটনাগুলো যদি সাধারণ মানুষ বা রাজনীতিবিদরা করতেন তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হতো, তাঁদেরকে জেল জরিমানা ভোগ করতে হতো। এখন আমরা দেখছি যে, চালচুরির ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জেলে যেতে হচ্ছে, তাঁরা চাকরীচ্যুত হচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা হচ্ছে। তাহলে আমলারা যদি একই অপরাধ করে, একই দূর্নীতি করে, সেক্ষেত্রে আমলাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে বাঁধা কোথায়? এখন ত্রাণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমলাদের। আমরা জানি যে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রশাসনের নানা রকম অনিয়ম-দূর্নীতির খবর কান পাতলেই শোনা যায়। তাই এই আমলাদের যদি জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হয়, তাঁদের স্বচ্ছতা না থাকার পরেও যদি সমস্ত দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে কি সত্যি সত্যিই আমরা জনকল্যাণ করতে পারবো? এই রাষ্ট্র কি তাহলে জনগণের নিবেদিত থাকতে পারবে? আমলারা কেন বিচারের উর্ধ্বে থাকবে, এই প্রশ্নের উত্তর দরকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোন সুশাসনের পক্ষে নয়।*