প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য *জাতীয় চার নে’তার হ’ত্যাকারীদেরও একজন এই মোসলেহ উদ্দিন*

*জাতীয় চার নে’তার হ’ত্যাকারীদেরও একজন এই মোসলেহ উদ্দিন*

52
*জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদেরও একজন এই মোসলেহ উদ্দিন*

*জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বুকে গু’লিবর্ষণকারী পলাতক খু’নি রিসালদার (বর’খাস্ত) মোসলেহ উদ্দিন ভারতে আ’টক হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ভারতের গণমাধ্যমগুলো।*
*খু’নি মুসলেহ উদ্দিনকে আটকের ঘটনা তুলে ধরে ভারতের এন’ডিটিভি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এছাড়া এ বিষয়ে সরব হয়ে ওঠেছে দেশটির একাধিক সংবাদমাধ্যম।*

*মোসলেহ উদ্দিনের আট’ক ও বাংলাদেশে হস্তান্তর সম্পর্কে ধোঁয়াশা পুরোপুরি না কাটলেও এরই মধ্যে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে কলঙ্কময় সেই ইতিহাসের নানা অধ্যায়। তারই ধারাবাহিকতায় সামনে আসে ব’র্বর খু’নি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন সম্পর্কিত ইতিহাসের আরেক নির্মম সত্য।*
*ইতিহাসের তথ্য বলছে— শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, জাতীয় চার নে’তা হ’ত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া খু’নিদেরও একজন এই ঘা’তক মোসলেহ উদ্দিন।*

*বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের সঙ্গে নির্মমভাবে হ’ত্যা করার পর ঘা’তকরা এদেশের বুক থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানকারী ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব বি’নাশের কাজে হাত দেয়। আর সেই লক্ষ্যে ঘাতক চক্র তাদের পরবর্তী টার্গেট নির্ধারণ করে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নে’তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য রাজনৈতিক সহচর ও জাতীয় চার নে’তা— বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও দেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে হ’ত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।*

*যে ঘা’তক চক্রের হাতে প্রত্যক্ষভাবে জাতীয় চার নেতার হ’ত্যাকাণ্ড বাস্তবায়িত হয় তাদেরও একজন এই বর্বর ঘাত’ক-খু’নি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন।*
*ধারণা করা হয় জাতির পিতার বুকে গু’লি চালিয়েই খু’নি চক্রের আস্থাভাজন হাতিয়ারে পরিণত হয় এই রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন সেই ইতিহাসের তথ্য তুলে ধরতে, ২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া ‘জাতীয় চার নেতা হ’ত্যাকাণ্ড’ ঘটনার বর্ণনা সম্পর্কিত এক সাক্ষাতকারে যা বলেছিলেন তৎকালীন জেলার আমিনুর রহমান। তার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য—*

*‘‘১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে একটি পিকআপ এসে থামে। তখন রাত আনুমানিক দেড়টা থেকে দুইটা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সে গাড়িতে কয়েকজন সে’না সদস্য ছিল।*
*ঢাকা তখন এখন অস্থিরতার নগরী। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থান নিয়ে নানা রকম কথা শোনা যাচ্ছে তখন। সে সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমিনুর রহমান।*
*রাত দেড়টার দিকে কারা মহাপরিদর্শক টেলিফোন করে জেলার আমিনুর রহমানকে তাৎক্ষণিকভাবে আসতে বলেন।*

*দ্রুত কারাগারের মূল ফটকে গিয়ে জেলার রহমান দেখলেন, একটি পিকআপে কয়েকজন সে’না সদস্য সশস্ত্র অবস্থায় আছে। মূল ফটকের সামনে সেনা সদস্যরা কারা মহাপরিদর্শককে একটি কাগজ দিলেন।*
*সেখানে কী লেখা ছিল সেটি অবশ্য জানতে পারেননি জনাব রহমান।*
*মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বাম দিকেই ছিল জেলার আমিনুর রহমানের কক্ষ। তখন সেখানকার টেলিফোনটি বেজে উঠে।*
*জেলার রহমান যখন টেলিফোনের রিসিভারটি তুললেন, তখন অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন।*

*আমিনুর রহমানের ভাষায়, ‘‘টেলিফোনে বলা হলো প্রেসিডেন্ট কথা বলবে আইজি সাহেবের সাথে। তখন আমি দৌড়ে গিয়ে আইজি সাহেবকে খবর দিলাম। কথা শেষে আই’জি সাহেব বললেন যে প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোনে বলছে আ’র্মি অ’ফিসাররা যা চায়, সেটা তোমরা কর।’’*
*মূল ফটকের সামনে কথাবার্তার চলতে থাকে। এক সময় রাত তিনটা বেজে যায়।*
*আমিনুর রহমান বলেন, এক পর্যায়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের চার নেতাকে একত্রিত করার আদেশ আসে।*

*কারা মহাপরিদর্শক একটি কাগজে চার ব্যক্তির নাম লিখে জেলার আমিনুর রহমানকে দিলেন।*
*সে চারজন হলেন- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান।*
*আমিনুর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদ কা’রাগারের একটি কক্ষে ছিলেন।*
*ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে অপর কক্ষ থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়।
সেখানে আসার আগে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কাপড় পাল্টে নিলেন।*

*জেলার রহমানের বর্ণনায়, ‘‘তাজউদ্দীন সাহেব তখন কোরআন শরীফ পড়ছিলেন। ওনারা কেউ আমাদের জিজ্ঞেস করলেন না আমাদের কোথায় নেও (নেয়া হচ্ছে)? সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব হাত-মুখ ধুলেন। আমি বললাম আ’র্মি আসছে।’’*
*চারজনকে যখন একটি কক্ষে একত্রিত করার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগার কারণে সে’নাসদস্যরা কারা কর্মকর্তাদের নোংরা ভাষায় গা’লিগালাজ করছিল।*
*জেলার রহমান জানান, ‘‘মনসুর আলি সাহেব বসা ছিল সর্ব দক্ষিণে। যতদূর আমার মনে পড়ে। আমি মনসুর আলীর ‘ম’ কথাটা উচ্চারণ করতে পারি নাই, সঙ্গে সঙ্গে গু’লি!’’*

*কারাগারের ভেতর এ নৃ’শংস হ’ত্যাকাণ্ডের খবর চার নে’তার পরিবার সেদিন জানতে পারেননি।’’*
*ঘটনার ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মামলার রায় ঘোষ’ণা করেন। রায়ে তিন আসামি রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার আবুল হাশেম মৃধাকে মৃ’ত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাব’জ্জীবন কা’রাদণ্ড দেয়া হয়।*

*খু’নিরা জানতো যে বঙ্গবন্ধুর র’ক্তের দুই তেজস্বিনী ধারা তখনও বহমান। ধূর্ত খু’নির দল ঠিকই ধারণা করেছিল, সময়ে তারা সমন্বিতভাবে খরস্রোতা গঙ্গার মত ধাবিত হবে। তার প্রলয়বাণে দু’কূল ছাপিয়ে ওঠা জলোচ্ছ্বাস বয়ে আনবে খু’নিদের মৃ’ত্যু পরো’য়ানা। সে জলের ধারায় স্নাত হয়ে স্বৈরশাসকের হাতে অবরুদ্ধ বাংলার স্বাধীনতা আবার উদ্ভাসিত হবে, জাতির পিতার হ’ত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচার প্রাপ্ত হয়ে ইতিহাস হবে কল’ঙ্কমুক্ত। মূলত সে পথ চিরতরে রোধ করতেই কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠ্যে জাতীয় চার নে’তাকে হ’ত্যা করে খুনি জিয়া-মুশতাক চক্রের অনুসারি, একদল পথভ্রষ্ট সৈনিক। যাদের একজন এই মোসলেহ উদ্দিন।*

*কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। আজ বিশ্বের বুকে ঠিকই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা। যার নে’তৃত্বে রয়েছেন তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। আর তার হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে প্রতিটি মুহূর্তের অমিত সঙ্গী রুপে রয়েছেন বোন শেখ রেহানা। অপরদিকে রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনদের কারও কারও ভাগ্যে জুটেছে বিচারিক দ’ণ্ডে দ’ণ্ডিত হয়ে, ফাঁ’সির দড়ি গলায় নিয়ে লাঞ্ছনার মৃ’ত্যু। কেউ আবার প্রতীক্ষায় রয়েছে সর্বোচ্চ দ’ণ্ড প্রাপ্তিতে পাপের সাজা ভোগের।*

*বাংলার মাটিতে বাঙালির নে’তা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নে’তার সব হ’ত্যাকারীদের বিচার সুনিশ্চিত না করা পর্যন্ত প্রশমিত হবে না বাঙালির ক্রোধ, পূর্ণতা পাবে না পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ। এই ন্যায় বিচার সুসম্পন্নের প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নে বাঙালিরে কেউ দাবায় রাখতে পারবে না।*
*বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হ’ত্যায় অভিযুক্ত কমপক্ষে এক ডজন অপরাধীকে ২০০৯ সালের দোষী সাব্যস্ত করে শা’স্তি ঘো’ষণা করে বাংলাদেশ। অভিযুক্তদের মধ্যে ২০১০ সালে ৫ জনের ফাঁ’সি কার্যকর করা হয়েছে। বাকি চারজন এখনও পলাতক।*