প্রচ্ছদ স্পটলাইট *ক’রোনা ছুটি নিয়ে এ কেমন খেলা সরকারের?*

*ক’রোনা ছুটি নিয়ে এ কেমন খেলা সরকারের?*

30
*করোনা ছুটি নিয়ে এ কেমন খেলা সরকারের?*

*টানা পঞ্চম দফায় করোনার কারণে সধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ছুটির মেয়াদ বাড়িয়ে এখন ৫ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। ৬ মে বৌদ্ধ পূর্ণিমা সরকারি ছুটির দিন আর ৭ মে হচ্ছে বৃহস্পতিবার। তাই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে যে, সত্যিই কি ৭ মে সবকিছু খুলবে? নাকি ছুটি আবারও বাড়ানো হবে?*
*এবার ছুটিটা একটু অন্যরকম ছুটি। এটা আধা ছুটি আধা চালু। এই ছুটিতে ১৮ টি সরকারি মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সীমিত আকারে। এছাড়া ব্যাংকিং সময় সীমাও বারান হয়েছে। এখন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ব্যাংকিং সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রপ্তানিমুখী কলকারখানাগুলো চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, গার্মেন্টস কারখানাগুলো এই ছুটির আওতা বহির্ভুত থাকবে এবং সেগুলো খোলা হবে।*

*একই সাথে এই ছুটিতে ১৮টি মন্ত্রণালয় অর্থাৎ অর্ধেক সরকারি অফিস সীমিত আকারে খোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনিতেই গত এক মাস ধরে যে উদ্দেশ্যে ছুটি তা নানা অজুহাতে অমান্য করছিল মানুষ। রাস্তায় বের হয়ে আসছিল মানুষ। শেষের দিনগুলোতে রীতিমতো ঢাকা শহরে যান জটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। এখন অর্ধেক ছুটি অর্ধেক বন্ধ দিয়ে কী লাভ হবে? এই ছুটিতে গার্মেন্টস শ্রমিকসহ বিভিন্ন কলকারখানা রপ্তানিমুখী এই অজুহাতে খুলে দেওয়া হবে। ফলে লাখ লাখ শ্রমিকরা যোগদানের জন্য পথে বেরুবে। আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অফিস খোলা থাকার কারণে তারাও অফিসে যাবেন। তাদের সঙ্গে যে সমস্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত তারাও অফিসে যাবেন। ফলে ঢাকা শহরের কথা যদি আমরা ধরি তাহলে মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেককে কাজে বেরুতে হবে। সমস্যায় পড়বে শুধুমাত্র ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো।*

*এই ছুটি যখন শুরু হবে তখন রোজা শুরু হচ্ছে। এরপর সামনে ঈদ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো যে তাদের মৌসুমি ব্যবসায়ের জন্য অপেক্ষা করবে সেই সুযোগও তারা হারাবে। তাহলে এই জগাখিচুড়ি ছুটিতে লাভ কার হবে এবং ক্ষতি কার হবে?*
*করোনার কারণে সরকার মোট পাঁচ দফায় ছুটি বাড়ালো। প্রথম দফায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফায় এটা ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছিল। তৃতীয় দফায় ১৪ এপ্রিল এবং চতুর্থ দফায় ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি বর্ধিত হয়। আর পঞ্চম এবং এখন পর্যন্ত শেষ দফায় ছুটি দেওয়া হলো ৬ মে পর্যন্ত। অর্থাৎ টানা ৪২ দিন অবরুদ্ধ থাকছে বাংলাদেশ।*

*যদিও এই ছুটির শেষের দিকে মানুষের দম বন্ধ অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ কারণে-অকারণে ঘর থেকে বের হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে গেছে। একটি অস্বস্তিকর আর উৎকণ্ঠার সময় চলছে।*
*অনেক বিশেষজ্ঞ এই ছুটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করছেন যে, যে উদ্দেশ্যে এই ছুটি দেয়া হচ্ছে, সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কারণ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং দূরত্ব সৃষ্টির যে আকাঙ্ক্ষা থেকে এই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই আকাঙ্খা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। মানুষ বিভিন্ন অজুহাতে বাসা থেকে বের হচ্ছে, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে এবং হাট-বাজার, ব্যাংকে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, এই ছুটি আসলে কতটুকু অর্থপূর্ণ?*

*তবে জনস্বাস্থ্যের সাথে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কার্যকর হলেও এই ছুটির কারণে সামাজিক সংক্রমণ অনেকটাই কমে এসেছে এবং করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে এই ছুটি কিছুটা হলেও কাজে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো এই ছুটি কি শেষ? ৬ মে’র পর আমরা কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরবো? নাকি ছুটি আবারও বাড়ানো হবে?*
*এই প্রশ্ন ওঠার প্রধান কারণ হলো, ৭ মে যেদিন সবকিছু খোলার কথা, সেদিন বৃহস্পতিবার। এরপরে শুক্র-শনি আবার সাপ্তাহিক ছুটি। তাই জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, সত্যিই কি ৭ মে খুলবে নাকি ছুটি আবারও বাড়ানো হবে।*

*এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে, এই ছুটি বাড়ার বিষয়টি নির্ভর করবে সম্পূর্ণ করোনা পরিস্থিতির উপর। তারা মনে করছেন যে বাংলাদেশে এখনো করোনার যে সংক্রমণ এবং শনাক্তের সংখ্যা- তা উর্ধ্বমূখী। এই উর্ধ্বমূখী প্রবণতার মধ্যে ছুটি বাড়ানো না হয়, তাহলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে।*
*ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুশিয়ারি উচ্চারণ করে দিয়েছে যে, করোনার যে মহামারি তার এখন সূচণা মাত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক এটাও বলেছেন যে, যে সমস্ত দেশ লক ডাউন থেকে সরে আসছে তারা চরম পরিণতি ভোগ করতে পারে। এর ফলে বিশ্ব পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।*

*আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ মনে করছেন যে, ছুটি কিছুটা হলেও কাজে দিয়েছে এবং এই ছুটি না হলে পরস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারতো এবং সরকারও চাইছে যে একটি সহনীয় মাত্রায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ছুটিটাকে প্রত্যাহার করা। এ কারণেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে ছুটি বাড়ানো হচ্ছে, একবারে বাড়ানো হয়নি।*
*কোন কোন বিশেষজ্ঞ বলছেন যে, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের যে পরিসংখ্যান, তাতে এখনো করোনা সংক্রমণের হার উর্ধ্বমূখী, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। এটা ইউরোপ বা আমেরিকার মতো প্রচণ্ড গতিতে বাড়েনি এবং আতঙ্কিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেনি। বরং নিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে যা বাংলাদেশের জন্য আশাপ্রদ। তাই ৬০ তম দিনে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি বোঝা যাবে এবং ৭ মে বাংলাদেশ সেই ৬০তম দিনে পা রাখবে।*

*উল্লেখ্য, ৮ই মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং তখন থেকেই সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। প্রথমত; সরকার সকল ধরণের সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত বন্ধ করা হয়েছিল। এরপর স্কুল-কলেজ বন্ধ করা হয়েছে। মুজিববর্ষের সকল অনুষ্ঠান আগে থেকেই স্থগিত করা হয়েছিল এবং সবশেষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা হয়েছে।*
*করোনা মোকাবেলার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির এক সদস্য বলেন যে, আমরা সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখছি এবং প্রতিদিন করোনা পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে। এর উপরেই নির্ভর করবে আসলে করোনা ছুটির শেষ কোথায় হবে। যতদিন পর্যন্ত এটা সহনীয় মাত্রায় না আসবে ততদিন পর্যন্ত এই ছুটি বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। কারণ করোনা মোকাবেলার একমাত্র উপায় হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব এবং মানুষের ঘরে থাকা। সেটা নিশ্চিত করার জন্যেই এই ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। তবে এটাই শেষ বাড়ানো কিনা সেটা বুঝতে হলে এই মাসের পুরোটা অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।*