প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য *নিউমোনিয়া মানেই কি কোভিড-১৯?*

*নিউমোনিয়া মানেই কি কোভিড-১৯?*

27
*নিউমোনিয়া মানেই কি কোভিড-১৯?*

*নিউমোনিয়া আমাদের দেশে একটি পরিচিত রোগ। আমাদের দেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের, সব শ্রেণির মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই নিউমোনিয়ার বেশির ভাগই কমিউনিটি অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া। অর্থাৎ সমাজে ও পরিবেশে বিদ্যমান জীবাণুর সংক্রমণে এটি হয়ে থাকে।*
*নিউমোনিয়ার কারণ: অনেক ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, এমনকি ফাঙ্গাসও নিউমোনিয়ার কারণ হতে পারে। করোনাভাইরাসও একধরনের নিউমোনিয়া সৃষ্টি করে থাকে। ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে যে সামান্য কাশি, জ্বর বা শ্বাসকষ্ট অনুভব করলেই আমরা সবাই করোনা সংক্রমণের কারণে কোভিড–১৯ হয়েছে বলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। এ ধরনের উপসর্গ থাকলে হাসপাতালে রোগী ভর্তি করতে চায় না। পিসিআর টেস্ট করা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না হলেও আমাদের সবারই কোভিড–১৯ আর সাধারণ নিউমোনিয়া সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন।*

*সাধারণ নিউমোনিয়া শিশুদের বেশি হতে দেখা যায়। তবে বয়স্ক ও যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তারাও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তবে কোভিড–১৯–এর কারণে শিশুদের সাধারণত মৃদু উপসর্গ থাকতে পারে। ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা, ডায়াবেটিস বা ক্যানসার রোগীর কোভিড–১৯ থেকে জটিলতা হয়ে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।*

*লক্ষণ: কোভিড–১৯ নিউমোনিয়ায় প্রায় শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের জ্বর থাকে। অর্থাৎ জ্বর ছাড়া করোনা-নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সঙ্গে থাকে দুর্বলতা, শুকনো কাশি, ক্ষুধামান্দ্য, শরীর ব্যথা, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। অন্যান্য কম উপসর্গগুলো হচ্ছে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো, পেটব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি করা এবং পাতলা পায়খানা।*

*করোনা-নিউমোনিয়ার গতি–প্রকৃতি: করোনার প্রাথমিক লক্ষণ থেকে সাধারণত ৫ দিন পর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, ৭ দিন পর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং ৮ দিনের মাথায় চরম শ্বাসকষ্ট হতে পারে, যাকে বলা হয় অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম। এর জন্য নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। জটিলতার মধ্যে চরম শ্বাসকষ্ট (এআরডিএস), অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, শরীরে অপর্যাপ্ত রক্ত চলাচল ও অক্সিজেনের অভাব হতে পারে।*

*পরীক্ষা: যেকোনো শ্বাসকষ্টে বুকের একটা সাধারণ এক্স–রে অনেকখানি অর্থ বহন করে। কোভিড–১৯ নিউমোনিয়ায় দুটি ফুসফুসই সমানভাবে আক্রান্ত হয়। দুটি কালো ফুসফুসেই সমভাবে, ছড়ানো ছিটানো বিভিন্ন আকারের সাদা সাদা দাগ দেখা যায়। বুকের সিটি স্ক্যান করা হলে আরেকটু ভালো ক্লু মেলে। এতে ঘষা কাচের মতো দাগ বা গ্রাউন্ড গ্লাস অপাসিটি থাকে। আমাদের জানা দরকার যে ব্যাকটেরিয়ার কারণে নিউমোনিয়া হলে সাধারণত একদিকের ফুসফুসের কোনো একটি অংশ আক্রান্ত হয় এবং ওই অংশ পুরোপুরি বা আংশিক সাদা হয়ে যায়। ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুসে পানিও জমতে পারে, যা করোনা-নিউমোনিয়ায় পাওয়া যায় না।*

*ইদানীং দেখা যাচ্ছে, শ্বাসকষ্ট হলেই যেকোনো বয়সের রোগীদের কিছু কিছু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভর্তি করে চিকিৎসা করাতে নিরুৎসাহিত করে। আমরা যদি অন্তত জরুরি ভিত্তিতে বুকের একটি এক্স–রে করি, তবে নিউমোনিয়া সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পেতে পারি এবং পরবর্তী চিকিৎসার জন্য একটি দিকনির্দেশনা দিতে পারি। তবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোগীর কাছ থেকে চিকিৎসক ও রেডিওলজি টেকনিশিয়ান উভয়েরই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।*
*এই রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করলে শ্বেতকণিকার মধ্যে লিম্ফোসাইটের সংখ্যা কম পাওয়া যাবে। প্রথ্রম্বিন টাইম প্রলম্বিত হয় এবং রক্তে ল্যাকটেট ডিহাইড্রোজিনেসের মাত্রা বেড়ে যায়। এগুলোও কিছু তথ্য দেবে।*

*চিকিৎসা: কোভিড–১৯–জনিত নিউমোনিয়া নিরাময়ের জন্য কোনো কার্যকর চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। শুধু উপসর্গভিত্তিক সাহায্যকারী চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে সংক্রমণের উৎস খুঁজে বের করা, কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ, পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং রোগীকে হাসপাতালে আলাদা করে সাহায্যকারী চিকিৎসা (সাপোর্টিভ কেয়ার) দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে কমিউনিটি অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়ায় কফ কালচার করে যথাযথ অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দিলে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে এ ধরনের রোগীর কফ বা যেকোনো নিঃসরণ পরীক্ষা ও সংগ্রহের সময় যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।*
*লেখক: শিশু বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।*