প্রচ্ছদ রাজনীতি *ভারতের সাথে বিএনপির আস্থার সম্পর্ক গড়া হলো না*

*ভারতের সাথে বিএনপির আস্থার সম্পর্ক গড়া হলো না*

38
*ভারতের সাথে বিএনপির আস্থার সম্পর্ক গড়া হলো না*

*চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটেছে- বারবার চেষ্টা করেও তা আর উন্নতি করতে পারেনি বিএনপি। কয়েকটি ইস্যুতে ছাড় দিয়েও ভারতের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেননি দলের নীতিনির্ধারকরা। গত মঙ্গলবার সকালে ঢাকা সফররত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে বিএনপির কূটনীতিক উইংয়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়। ভারতের পক্ষ থেকে বৈঠকটি বাতিল করার পর বিএনপিও চূড়ান্তভাবে প্রতিবেশী দেশের ওপর আস্থা হারিয়েছে। এখন বিএনপি ভারতবিরোধী মনোভাব প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারে। দলের নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।*

*বিএনপি নেতাদের দাবি, তাদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় দূতাবাসই বৈঠকটি বাতিল করে। তারা মনে করছেন, দিল্লিতে মুসলমানদের ওপর সহিংসতায় উদ্বেগ জানিয়ে সম্প্রতি বিবৃতি দিয়েছে বিএনপি। এর পর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ ছাড়া বৈঠক হলেও সেখানে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লির ঘটনা তুলে ধরত। বিএনপি নেতাদের ধারণা এসব কারণেই ভারতীয় দূতাবাস বৈঠকটি বাতিল করেছে। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কূটনীতিক উইংয়ের প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের থাকার কথা ছিল।*

*বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তাদের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নেতারা তাদের অবস্থান এবং বৈঠক বাতিলে পর পরবর্তী কৌশল নিয়ে আমাদের সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।*
*স্থায়ী কমিটির অন্তত তিনজন নেতা বলেছেন, বিএনপি এতে তাদের ক্ষতি দেখছেন না। কারণ ভারত গত ১২ বছর ধরেই আওয়ামী লীগের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী ভারতবিরোধী বক্তব্য জোরালো করার দাবি তুললে বারবারই দলের হাইকমান্ড ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা চালিয়েছে। এখন প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা করলেও এ বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ বিএনপিকে দোষারোপ করতে পারবে না।*

*দলটির একাধিক নেতা বলছেন, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে মামলায় অংশ নিতে চায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ। দিল্লির সহিংসতার ঘটনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ। ভারতের এসব ইস্যুতে বিএনপি উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতিও দিয়েছে।*
*বিএনপি মনে করছে, যে প্রক্রিয়ায় তারা বৈঠক বাতিল করল তা কূটনীতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। ভারত কোনো অন্যায় করলে তার সমালোচনাও করা যাবে না- এমনটি হতে পারে না। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়া প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের মধ্যেও বৈঠক হয়েছে। কিন্তু যেভাবে ভারত দেশের চেয়ে একটি দলকে বড় করে দেখছে, সেখানে তারা আর দেশটির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।*

*বৈঠক না হওয়া প্রসঙ্গে বিএনপির এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের ভূমিকায় মোদি সরকার ক্ষুব্ধ তা তাদের সাম্প্রতিক আচরণেই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি বাতিল করার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হলো।*
*ওই নেতা আরও বলেন, বৈঠক বাতিল হওয়াকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। ভারতের সাম্প্রতিক ইস্যুতে বিএনপি দেশটির জনগণের সঙ্গে রয়েছে তা আরও স্পষ্ট হবে। আমরা চাই ভারতের সরকার নয়, দেশটির জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে। আমাদের বর্তমান অবস্থান সেটাই। এ ছাড়া দিল্লির সহিংসতাসহ সাম্প্রতিক ইস্যুতে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ এমনকি জাতিসংঘও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ওইসব দেশ এবং সংস্থার সঙ্গে বিএনপির অবস্থানও একই আছে। ফলে মোদি সরকার ক্ষুব্ধ হলেও ভারতের জনগণ এবং বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ আমাদের ভূমিকার প্রশংসা করবে বলে আমরা মনে করি।*

*বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, ২০১২ সালের অক্টোবরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে দিল্লি সফর করেছিলেন। ওই সফরকে বিএনপি ইতিবাচক ধরে এগিয়ে ছিল। যার কারণে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ভারতের বিরোধিতা বা সমালোচনা করে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেননি।*
*যদিও ২০১৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরে জামায়াত হরতাল ডাকায় খালেদা জিয়া বৈঠক বাতিল করেছিলেন। এই বৈঠক বাতিল নিয়ে এখনো দলটির মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি উঠেছিল। এক নেতা বৈঠকে বলেছেন, ‘ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছিলাম, প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করা হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলে বিএনপির কোনো লাভ হবে না, তবে যে ক্ষতি হবে তা মোকাবিলা করা কঠিন হবে।’ ওই নেতা সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সেদিন জামায়াতের হরতাল ডাকাকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, এখনো সময় আছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার। ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক যেন আর না হয় সে কাজটিই জামায়াত করেছে।*

*যদিও খালেদা জিয়া ওই সময়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকটি বাতিল করতে হয়েছিল, কারণ আমরা জানতে পেরেছিলাম, তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে আমার ওপর হামলা করা হবে। প্রকৃতরূপে তা জীবনের জন্য হুমকি হয়েও দাঁড়াতে পারে। আপনি যদি মনে করার চেষ্টা করেন তাহলে দেখবেন, যে হোটেলটি পার হয়ে আমি যেতাম, তার পাশে পেট্রলবোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল।*
*২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের কংগ্রেস সরকারের ভূমিকা পুরোপুরি বিএনপির বিরুদ্ধে ছিল। যার কারণে মোদি সরকার আসার পর তাদের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশ ইস্যুতে দেশটির মনোভাব পরিবর্তন হবে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মোদি সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রত্যাশা করেছিল বিএনপির হাইকমান্ড। সে আশা আর পূরণ হয়নি।*

*যার কারণে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ধীরে ধীরে ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে শুরু করে বিএনপি। সীমান্ত হত্যা, ভারতের সিএএ, এনআরসি এবং সর্বশেষ দিল্লির সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। এ নিয়ে তারা উদ্বেগও প্রকাশ করছে। সিএএ নিয়ে সংসদে দেওয়া ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দলটি। সিএএ ও এনআরসির ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেশটির সরকার দাবি করলেও তা মানতে নারাজ বিএনপি। তারা মনে করেন, ভারতের সিএএ ও এনআরসি কার্যকর হলে এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে, যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অনেক মুসলমান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।*