প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *ভারতের মুসলমানের জন্য দরজা খুলুক বাংলাদেশ-পাকিস্তান*

*ভারতের মুসলমানের জন্য দরজা খুলুক বাংলাদেশ-পাকিস্তান*

তসলিমা নাসরিন

102
*ভারতের মুসলমানের জন্য দরজা খুলুক বাংলাদেশ-পাকিস্তান*

*১. বাবরি মসজিদ ভা’ঙ্গার পর বাংলাদেশে হিন্দুর ওপর আক্র’মণ করেছিল মুসলিম মৌলবাদিরা। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। আমি তখন বাংলাদেশে। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ভী’ত সন্ত্র’স্ত হিন্দুর পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। লিখেছিলাম লজ্জা। গত ক’দিনে ভারতে যে দা’ঙ্গা হলো, তার পেছনে বাংলাদেশের হিন্দুর কোনও ভূমিকা নেই। বাংলাদেশে কোনও ধর্মান্ধ প্রতি’শোধপরায়ণ মুসলমান যেন একজন হিন্দুর ওপরও হা’মলা না চালায়। সরকার এবং বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যেন রোধ করে নিরীহ সংখ্যেলঘুর ওপর যে কোনও ধরণের আ’ক্রমণ। আর যেন কাউকে নতুন কোনও ‘লজ্জা’ লিখতে না হয়।*

*২. বাংলাদেশের সংখ্যালঘু যখন অত্যাচারিত হয়, যখন নিরাপত্তার অভাবে দেশ ত্যাগ করে, বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের যারা তখন শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে, প্রতিবাদ করে না; অথবা হাত তালি দেয়, জমিজমা দখল করে, নিজেরাই সংখ্যালঘুর বাড়ি, উপাসনালয় পুড়িয়ে দেয়- তারা যে এখন কী ভীষণ উদবিগ্ন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা কেন রক্ষা হচ্ছে না, ভারতে কেন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করছে সংখ্যাগুরুরা- এ নিয়ে। এমন রেগে আগুন হয়ে আছে লোকগুলো! তুই যেটা করিস, সেটা অন্যরা করলে সহ্য করতে পারিস না কেন? এই প্রশ্নটা কে করবে? করলেই কুৎসিত গালি।*
*অন্যের নিন্দে করার আগে নিজেকে শুদ্ধ কর। কনফুসিয়াসের একটা কথা আছে না, ইংরেজি করলে ‘Don’t do unto others what you don’t want done unto you.’। তুমি যেটা নিজের ওপর চাও না, সেটা তুমি অন্যের ওপর কোরো না। সভ্য হওয়ার এটিই তো প্রথম শর্ত।*

*৩. বাংলাদেশে দুই ধর্মীয় দলে মারামারি হয় না, সত্যিকার দাংগা হয় না। বাংলাদেশে মুসলমান হিন্দুকে মারে। পাকিস্তানেও তাই। ভারতে কিন্তু দাংগা হয়। হিন্দু যেমন মুসলমানকে মারে, মুসলমানও হিন্দুকে মারে। দু দলই পাথর, পেট্রোল বোমা, পিস্তল হাতে নেয়। দাংগায় দু দলের লোকই মারা যায়। কোথাও কম, কোথাও বেশি।*
*৪. বাংলাদেশ পাকিস্তানের অত্যাচারিত ভীত সন্ত্রস্ত হিন্দুদের জন্য ভারত তার উদার দরজা খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানেরও উচিত ভারতের অত্যাচারিত ভীত সন্ত্রস্ত মুসলমানের জন্য নিজেদের দরজা খুলে দেওয়া।*

*ভালো হতো মানুষের সত্যিকার ধর্ম যদি মানবতা হতো। সব ধর্মের, সব জাতের, সব বর্ণের, সব শ্রেণীর মানুষ যদি মিলে মিশে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারতো, সবার মধ্যে যদি সহমর্মিতা হৃদ্যতা থাকতো। কিন্তু বারবারই দেখছি ঘৃণা মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অমানবতাই এখন ধর্মের অপর নাম। যারা ধর্মের উর্ধে উঠতে পেরেছে, তাদের মধ্যেই কিছুটা মানবতা দেখি। ধর্ম, ধর্মের রাজনীতি অরণ্যের আগুনের মতো বাড়ছে। একে রোধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি ক্ষমতাহীন প্রভাব-প্রতাপহীন কিছু অসহায় নিরীহ মানুষ। আমাদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না।*

*দিল্লির দাংগাবিধ্বস্ত এলাকা থেকে গত দুদিন মুসলমানরা ঘটিবাটি লেপ তোশক কাঁধে করে নিয়ে যখন পালাচ্ছিল, কেউ ওদের প্রশ্ন করেছিল, কোথায় যাচ্ছে তারা, তারা তখন জানে না কোথায় যাচ্ছে। ওরা যদি বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে যেতে চায়, আমার তখন মনে হচ্ছিল, দরজা খুলে দেওয়া উচিত।*
*ধর্মের মতো হাস্যকর কল্পকথা দিয়ে দেশ ভাগ করা, মানুষ ভাগ করা খুব অন্যায়। কিন্তু আপাতত কিছু নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমরা ভাবতেই পারি দরজা খোলার কথা। ধনী হিন্দু বা ধনী মুসলমান তো নিরাপত্তার জন্য ইওরোপ বা আমেরিকায় চলে যায়। তখন তো কেউ প্রশ্ন করে না কেন যাচ্ছে! গরিবের তো প্রতিবেশিই সম্বল। ধর্মের কৃত্রিম কাঁটাতার ডিঙিয়ে যাওয়া শুধু। আসলে তো একই মাটির মানুষ সবাই।*

*কোনও একদিন ধর্ম যখন জীবনের মূখ্য কোনও বিষয় থাকবে না, ধর্মের রাজনীতিরও জনপ্রিয়তা নষ্ট হবে, তখন এই উপমহাদেশ, এই দক্ষিণ এশিয়া এক হবে নিশ্চয়ই। মানুষের পরিচয় হবে তার মনুষ্যত্ব দিয়ে, ধর্ম দিয়ে নয়। সেদিন কবে আসে কে জানে। তার আগে হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হোক, মৌলবাদ আর সন্ত্রাস বন্ধ হোক।*
*তসলিমা নাসরিন: নির্বাসিত লেখিকা*