প্রচ্ছদ স্পটলাইট *পাপিয়াদের উত্থান ক্ষ’মতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে*

*পাপিয়াদের উত্থান ক্ষ’মতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে*

197
*পাপিয়াদের উত্থান ক্ষমতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে*

*একজন পাপিয়ার উত্থান ঘটে ক্ষমতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে। যুব মহিলা লীগের পাপিয়া যুবলীগের সম্রাটের আরেক সংস্করণ। ক্যাসিনোকাণ্ডে ইসমাইল হোসেন সম্রাটের সাথে গত বছর তার কয়েক জন দোসরও আটক হয়েছিলেন। তাদেরও অর্থবিত্তের অবিশ্বাস্য গুপ্তধনের সন্ধান মিলেছিল। পাপিয়ার সম্পদের পাহাড়ের খবর জানতে জানতে নতুন করে খবরের শিরোনাম হলো সম্রাটের সেই সহযোগী দুই ভাই এনু-রূপনের চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার মতো সম্পদের তথ্য। তাদের বাড়িতেই ৫টি সিন্দুক থেকে বেরিয়েছে নগদ ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা! তার সাথে সোনা ছিল ১ কেজি আর নানা দেশের মুদ্রার সম্ভার। দুজনের এফডিআরও আছে ৫ কোটি টাকার।*

*পাঠক নিশ্চয়ই ভুলে যাননি গত বছর সেপ্টেম্বরের অভিযানে এদের বাড়ি থেকে মিলেছিল নগদ ৫ কোটি টাকা এবং সাড়ে সাত কেজি সোনা! এর বাইরে তাদের স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ জানলেও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস হতে চাইবে না। এনু-রূপন পুরান ঢাকায় বাড়ি কিনেছেন ১২টি, ফ্ল্যাট ৬টি। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি জমিতে তাদের বহুতল ভবন নির্মীয়মাণ। এর মধ্যে কি তাদের সব সম্পদের হিসাব মিলল? এখন আর কারও বিশ্বাস হতে চাইবে না তা; বরং সবাই ভাবছে খুঁজলে আরও সম্পদের সন্ধান মিলবে দুভাইয়ের। আর খোঁজ তথা অনুসন্ধান আরেকটু বাড়লে এমন এনু-রূপন কিংবা পাপিয়ার সন্ধানও মিলবে বলেই সাধারণের বিশ্বাস।*

*পাপিয়ার রয়েছে ঢাকা-নরসিংদীতে চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নরসিংদিতে আছে ২ কোটি টাকা মূল্যের প্লট, আছে ৫টি বিলাসবহুল গাড়ি, লাইসেন্স করা ও লাইসেন্সবিহীন আগ্নেয়াস্ত্র। আর ঢাকার অভিজাত হোটেলে প্রতিদিনের বিপুল ব্যয় তো আছেই।*
*প্রশ্ন হচ্ছে- সম্রাট, এনাম ভূঁইয়া, রূপন ভূঁইয়া, পাপিয়া বা মফিজুররা কি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা গুটিকয় মানুষ? জনগণ আর তা বিশ্বাস করে না। কারণ তারা এলাকায় এলাকায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য লীগের নামে গড ফাদার ও তাদের ক্যাডার বাহিনীর তৎপরতার কথা জানে। এতে তাদের জীবনও অতিষ্ঠ। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে- কেন ২০০৯ থেকে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে নিজ দল ও অন্য দলের ৪৫ জনের মতো তরুণ খুন হবে? এর পেছনে যে দ্বন্দ্ব তা যে আদর্শিক নয়, অর্থবিত্তের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে, তাতে কারও মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এত ঘটনা এবং মানুষের এত ভোগান্তি তো নেতৃবৃন্দের ঘুম ভাঙাতে পারেনি।*

*পত্রিকাগুলো ঠিকই লিখেছে যে নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সম্পাদিকা শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউর সবই অর্থাৎ তার ক্ষমতা, প্রতাপ এবং অঢেল সম্পদ ছিল আদতে ওপেন সিক্রেট। এলাকার মানুষের চোখে তিনি ছিলেন সন্দেহভাজন ব্যক্তি। দেখা যাচ্ছে এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিবাদের মুখে পাপিয়াকে পরে কেন্দ্র থেকেই নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল। নেতৃত্ব কি তাতেও প্রশ্নবিদ্ধ হবে না? ক্ষমতাবান, প্রতাপশালী, বিত্তবানকে সাধারণ মানুষ ঘাঁটাতে সাহস পায় না। তারা কাণ্ডজ্ঞানেই বুঝে যায় আলাদীনের চেরাগের অলৌকিক কর্মকাণ্ডের পেছনে মহাশক্তিধর ব্যক্তিদের প্রশ্রয় নিশ্চয়ই কাজ করেছে। ফলে তারা এদের ঘাঁটায় না; ভয় পেয়ে পথ ছেড়ে দেয় কিংবা দুর্বল, সুযোগসন্ধানীরা তাদের আজ্ঞাবহ থেকে লাভবান হতে চায়।*

*সম্রাটের মাধ্যমে ক্ষমতার আশ্রয়ে রাজধানীর উচ্চবিত্ত সমাজে গড়ে ওঠা বেআইনি বেপরোয়া জীবনের একটি খণ্ডচিত্র হয়তো উঠে এসেছিল। এবারে পাপিয়া দেখাল একেবারে পঙ্কিল জগতের দগদগে চিত্র। দুক্ষেত্রেই অবশ্য অপরাধীরা ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়তে ভোলেনি। অর্থ তাদের কাছে খোলামকুচির মতো না হলে একজন ২৮ বছরের মফস্বল শহরের যুবতী কীভাবে রাজধানীর অভিজাত হোটেলে স্থায়ীভাবে বিলাসী প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া করে থাকেন? কীভাবেবা তিনি হোটেলের বারে দৈনিক দুলাখ টাকা হারে বিল শোধ করেন? হোটেল যেমন স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপনের স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে না, তেমনি প্রতিরাতে হোটেলের শুঁড়িখানায় দুলাখ টাকার মদ একলা পান করাও যায় না। এগুলো সাধারণ বুদ্ধির কথা।*

*এ-ও নিতান্ত সাধারণ কথা যে একজন পাপিয়া বা একজন সম্রাট কিংবা দু-চারজন এনু-রূপন, খালেদ একদিনে এবং একাকী অবৈধ উপার্জনে পাপাচারনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত হতে পারে না। ফলে এটাও ওপেন সিক্রেট যে তাদের নিরাপদে বেড়ে ওঠার অবলম্বন ছিল ক্ষমতাসীন দল এবং নিশ্চয় দলের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি। এই সাথে এ কথাও বলা প্রয়োজন, রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘকাল ক্ষমতা ভোগ করতে থাকে, তখন সমাজের ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিরা তার ভাগীদার হয় এবং তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সাথে যোগসাজশ ঘটিয়ে নিজের অবস্থান ও সম্পদ নিরাপদ ও নিরঙ্কুশ করে তোলে। এটা একচেটিয়া ক্ষমতার ধর্ম। তাই মহাজন উক্তিটি তৈরি হয়েছে- ক্ষমতা দুর্নীতি উসকে দেয়, আর চরম ক্ষমতা দুর্নীতিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। সম্রাট ও তার সহযোগী বা পাপিয়া ও তার সহযোগীরা হলো দুর্নীতির হিমশৈলের চূড়ামাত্র।*

*আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অর্থাৎ পুলিশ-র‌্যাব এর কিছুই জানত না- এমন কথাও কেউ বিশ্বাস করবে না। যা ওপেন সিক্রেট, যেসব কাজ সন্দেহজনক, যারা সন্দেহভাজন সমাজের চোখে, তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন গোয়েন্দানির্ভর সংস্থা কিছু জানত না- এটা সন্দেহজনক বারতা। তা হলে তো তাদের যোগ্যতা-দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়। বলতে হয় তারা নিজ দায়িত্ব পালনে অযোগ্য অথবা তারা দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা দেখিয়েছে, কিংবা তারা এসব অপকর্মের ভাগীদার হয়েছে। এই তিনের যে কোনো ভাগে তো তাদের অবস্থান থাকবেই। তাদের কাজের জবাবদিহিতা চাই, চাই কাজের স্বচ্ছতা।*

*আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা কেবল অপরাধীর দায় অস্বীকার করেই পার পেয়ে যাবেন? এ পাপ ও অপরাধ কতদূর ছড়িয়েছে, সংক্রমণ কত ব্যাপক ও গভীর তা খতিয়ে দেখা দরকার। নয়তো এত উন্নয়ন ও সাফল্য সত্ত্বেও জনগণের কাছে মর্যাদা ও আস্থা হারাবে দল।*
*ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিবান ত্যাগী নেতারা অনেক দিন ধরেই দলে কোণঠাসা হয়ে আছেন। এলাকায় এলাকায় খুদে খুদে সম্রাট-পাপিয়ার উত্থান দৃশ্যমান এবং সপারিষদ তাদের দাপটে জনজীবন অতীষ্ঠ। *

*সম্রাটরা জানান দিয়েছিল দলে সংস্কার ও পুনর্গঠনের সময় হয়েছে, পাপিয়ারা জানান দিল যে ক্ষমতাসীন দল সে ইশারায় যথাযথভাবে সাড়া দেয়নি। এবার যদি ক্ষমতাসীন দল দায় এড়ানোর সংস্কৃতি ছেড়ে দায় নিয়ে করণীয় কাজে হাত দেয় তবেই দেশ, জাতি এবং অবশ্যই দল ও গণতন্ত্রের জন্যে মঙ্গল হবে। আর ক্ষমতার অন্ধ প্রতাপ ও মোহে যদি এসবকে নিছক কতিপয়ের অপরাধ ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে, হালকাভাবে দেখা হয় তবে তার খেসারত সবচেয়ে বেশি দিতে হবে দেশের প্রাচীন সর্ববৃহৎ দলটিকে। আর সেই সূত্রে এর অসহায় পরিণতি ভোগ করবে জনগণ এবং বহু ত্যাগ ও মূল্যে প্রাপ্ত এই দেশ।*