প্রচ্ছদ স্পটলাইট *আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাক্ষাৎকার*

*আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাক্ষাৎকার*

61
*আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাক্ষাৎকার*

*‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’- গানের রচয়িতা প্রখ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন, দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা বাংলা ভাষাকে হয়তো মর্যাদা দিতে পারিনি। মুখে দেশকে ভালোবাসি আর একুশের প্রভাতফেরিতে ফুল দিলেই বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান প্রকাশ পায় না। ভালোবাসা দেখানোর বিষয় নয়, ধারণ করার বিষয়। দেশকে ধারণ করলেই আমরা আমাদের স্বাধীনতার মান রাখতে পারব। তিনি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি ৪৮ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, একটি সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ হবে। যদিও সমাজতন্ত্রের অবস্থা পুরো বিশ্বে অনেক খারাপ। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোও আর নিজেদের সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচয় দেয় না।*

*তবে সমাজতন্ত্রের পতন হয়ে গেছে, তা বলি না। বাংলাদেশে ফেল করেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। বর্তমান বাস্তবতায় সমগ্র বিশ্বে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদী আদর্শের অনুপস্থিতিতে ধর্মান্ধতা, পশ্চাৎপদতা, মধ্যযুগীয়তা অনেক বেশি বেড়ে গেছে। বাংলাদেশেও এর ছাপ পড়েছে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-*

*প্রশ্ন: একুশের গানের জন্মকথা নিয়ে কিছু বলুন।*
*আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ মাত্র ১৮ বছর বয়সে লেখা আমার একটি কবিতা। তখন আমি ঢাকা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র এবং সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। পরে এটি যে এত বড় কবিতা হবে, সংগীত হয়ে যাবে, বুঝিনি। এখনো মনে হয় শুধু আবেগের বশে লেখা কিছু আজ পৃথিবীর মানুষের কাছে ভাষার গান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।*
*প্রশ্ন: আপনার সেই কবিতা এখন প্রভাতফেরির গান; যা এগারোটি ভাষায় একুশের প্রভাতে গাওয়া হয়…*

*আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: পাকিস্তান আমলে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হতো- ‘ফজরে উঠে কমজোর মালুম হলে এক গ্লাস হরলিকস পিয়ে লিন’। অথচ বিজ্ঞাপনের ভাষা হওয়া উচিত ছিল- সকালে উঠিয়া যদি দুর্বল বোধ করেন তাহলে এক গ্লাস হরলিকস পান করুন। রেডিও পাকিস্তানে বাংলায় নিউজে বলা হতো- আজ উজিরে খাজানা ঢাকায় হাওয়াই আড্ডায় তশরিফ নিবেন। এরকম একটি অবস্থায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের সূচনা হয়। এরকম প্রেক্ষাপটে আমার কবিতাটি আমি লিখি। আমার ক্লাসফ্রেন্ড জহির রাহয়ান তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’য় এ গান ব্যবহার করেন। তখন গানটির নতুন করে সুর করেন আলতাফ মাহমুদ। এভাবেই গানটি জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে এ গানটি ১১টি ভাষায় গাওয়া হয়।*

*প্রশ্ন: দীর্ঘ আন্দোলন আর শহীদের রক্তে পাওয়া রাষ্ট্রভাষা বাংলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন?*
*আবদুল গাফ্ফর চৌধুরী: ভাষা হচ্ছে বহতা নদী। সময়ের সঙ্গে ভাষার অনেক পরিবর্তন হবে। বাংলা ভাষা প্রথম যখন তৈরি হয় তখন আরবি, ফার্সি শব্দের ছড়াছড়ি ছিল। পরবর্তীতে হিন্দু বনেদিদের কারণে ব্যবহারিক ভাষায় প্রচুর সংস্কৃত ভাষা ঢুকেছে। আলীগড় শিক্ষা বিপ্লবের পর বাংলাদেশে যখন মুসলিম পন্ডিত তৈরি হওয়া শুরু হলো তখন প্রচুর আরবি, ফার্সি, উর্দু শব্দ ঢুকেছে। ঠিক এভাবেই বর্তমানে এসে প্রচুর ইংরেজি শব্দ দখল নিয়েছে ব্যবহারিক বাংলা ভাষায়।*

*একই সঙ্গে বাংলা ভাষা সাহিত্যের ভাষা হিসেবে পৃথিবীর যে কোনো প্রথম শ্রেণির ভাষার সমতুল্য। তবে ব্যবহারিক দিক দিয়ে যতটুকু বিশুদ্ধ ভাষা হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। শতভাগ বাংলা ভাষায় কোনো ডিপ্লোমেটিক বা কমার্শিয়াল চিঠি লেখা যায় না। একজন বাঙালি হিসেবে, বাংলায় কথা বলা মানুষ হিসেবে এসব জিনিস অনেক কষ্ট দেয় আমাকে।*

*প্রশ্ন: কোন বিষয়গুলোর দিকে নজর দিলে ভাষাকে আরও সমৃদ্ধশালী করা যাবে বলে মনে করেন আপনি?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: দীর্ঘ সময় ধরে আমি সরকারের কাছে বলে আসছি, ভাষা নিয়ে গবেষণার জন্য একটি ভাষাবিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্র ও গবেষণা কেন্দ্র প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষার সঙ্গে পৃথিবীর সব ভাষা নিয়ে গবেষণা করতে পারবে; যা আমাদের ভাষাকে আরও সমৃদ্ধশালী করবে।*

*প্রশ্ন: লেখার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?*
*আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যারা তাদের মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় শিক্ষারীতি পর্যন্ত চালু করেনি। কিন্তু আমরা ইংরেজিকে অনেক প্রাধান্য দেই। কারণ বিশ্বের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলতে ইংরেজির প্রয়োজন অনেক। কিন্তু দেশের মধ্যে যখন সব জায়গায়ই এ ভাষার প্রাধান্য চোখে পড়ে তখন মনে হয় প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই ভাষাকে আমরাই হয়তো মর্যাদা দিতে পারিনি। তাই আমি মনে করি, আইন থাকলে তার সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকেই বেশি সচেতন হতে হবে ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে।*