প্রচ্ছদ অর্থ-বাণিজ্য *সুরক্ষা আ’ইনে কতটা সুরক্ষিত আ’মানত*

*সুরক্ষা আ’ইনে কতটা সুরক্ষিত আ’মানত*

21
*সুরক্ষা আইনে কতটা সুরক্ষিত আমানত*

*বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গ্রাহকের আমানতের সুরক্ষা দিতে আমানত বীমা আইন রয়েছে। এ আইনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আমানত সুরক্ষায় আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে। আগের আইনের মতো সংশোধিত আইনেও সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত বীমার প্রিমিয়াম দ্বারা সুরক্ষিত করা হবে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে এ আইনের ফলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে বীমা সুরক্ষার বাইরে থেকে যাবে ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ আমানত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় অরক্ষিত থাকবে ৯৮ শতাংশ আমানত। অর্থাৎ কোনো কারণে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে মোট আমানতের ৯৫ শতাংশই ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।*

*ব্যাংকের আমানতের সুরক্ষা দিতে ১৯৮৪ সালে সর্বপ্রথম একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশকে ২০০০ সালে ব্যাংক আমানত বীমা আইন ২০০০-এ পরিণত করা হয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত এ আইনের বাইরে ছিল। ২০১৭ সালে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ আইনের খসড়া করা হয়েছে। আমানত সুরক্ষা আইন-২০২০ নামের খসড়ায় আগের মতো বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়িত (বন্ধ) হলে প্রত্যেক আমানতকারী সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন। ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো গ্রাহকের একাধিক অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকার বেশি থাকলেও তিনি সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকাই পাবেন।*

*তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আইনে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের বিধান খুবই কম। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হতে পারে। গ্রাহকরা ধীরে ধীরে আমানত তুলে নেবেন। কারণ একজন গ্রাহকের ৫ লাখ টাকার এফডিআর আছে ব্যাংকে। ওই ব্যাংক অবসায়ন হলে ৪ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ক্ষতি হবে। তাই এ আইনটি সঠিক হচ্ছে না। এতে ব্যাংকগুলোয় আমানতের প্রবাহ কমবে। আমানত কমলে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও কমবে ব্যাংকের। আর ঋণ দিতে না পারলে বিনিয়োগ হবে না। যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।*

*বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, আইন অনুসারে আমাদের চলতে হবে। তবে আমানতকারীদের যত বেশি অর্থ সুরক্ষিত হবে, আমানতকারীরা তত বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। তাই বীমা আওতায় আনার পরিমাণটা বাড়ানো যুক্তিযুক্ত হবে।*

*বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘শিডিউল ব্যাংকিং স্ট্যাস্টিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৯টি ব্যাংকে জমাকৃত আমানতের পরিমাণ ১১ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। প্রায় ১০ কোটি ২৯ লাখ অ্যাকাউন্টে এ অর্থ জমা আছে। এর মধ্যে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জমা আছে এমন অ্যাকাউন্টে আমানতের পরিমাণ ৬১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এ পরিমাণ টাকা বর্তমানে বীমা আইন দ্বারা সুরক্ষিত। অর্থাৎ কোনো কারণে ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলেও বীমা আইনে সুরক্ষিত থাকবে মাত্র ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ আমানত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকগুলোয় গ্রাহকদের মোট আমানতের মধ্যে ১০ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা বীমা সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। এ অর্থ ব্যাংক বন্ধ হলে বা কোনো কারণে তারল্য সংকটে পড়লে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।*

*ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকগুলোয় মোট আমানতের মধ্যে বেসরকারি খাতের ব্যক্তি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মোট আমানতের পরিমাণ ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। মোট ১০ কোটি ২৫ লাখ অ্যাকাউন্টে ওই অর্থ জমা আছে। এক লাখ টাকা পর্যন্ত অ্যাকাউন্টে আমানত আছে এমন অর্থের পরিমাণ ৬০ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। বীমা আইনে সুরক্ষিত থাকবে মাত্র ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ অর্থ। ব্যক্তি খাতের ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ আমানতই ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।*

*প্রতিবেদনে সঞ্চয় হিসাবের মধ্যে অন্তত ৮ কোটি অ্যাকাউন্ট সাধারণ অ্যাকাউন্ট। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে এ অ্যাকাউন্টগুলো খোলা হয়েছে। এতে জমার পরিমাণ ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ অ্যাকাউন্টগুলোয় গড় জমা মাত্র ৯২৫ টাকা। প্রকৃতপক্ষে সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা অনেক কম। ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জমা অ্যাকাউন্টধারীরা মূলত সঞ্চয়কারী। অর্থাৎ সঞ্চয়কারীদের সুরক্ষার আওতায় আনা হয়নি বীমা আইনের আওতায়।*

*বর্তমানে আইনে সরকারি, বিশেষায়িত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আমানতের ওপর দশমিক ০৮ শতাংশ হারে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক হিসেবে সতর্ক হলে ০.০৯ শতাংশ এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে বীমার প্রিমিয়াম জমা রাখতে হবে দশমিক ১০ শতাংশ হরে। গত অর্থবছর শেষে ট্রাস্ট ফান্ডের অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ ৬৩৩ কোটি টাকা।*
*এদিকে দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ১৪২ অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ ৪৩ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। মাত্র ২ দশমিক ৪১ শতাংশ আমানত সুরক্ষিত থাকবে। পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং বা বিআইএফসির মতো হলে ৪২ হাজার ৭২০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।*

*সম্প্রতি পিপলস লিজিং অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমানতকারীরা আন্দোলন করে কবে নাগাদ অর্থ ফেরত পাবেন, তার কোনো গাইডলাইন পাননি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বিআইএফসি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্সসহ অন্তত ২৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা অর্থ ফেরত চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। আগে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক এবং দ্য ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়।*

*আমানত সুরক্ষা আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এর অধীনে কোনো কার্যক্রমের ব্যত্যয় ঘটলে দায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা ফৌজদারি আইনে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আর কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরপর দুবার বীমার প্রিমিয়ামের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে না। টানা দুইয়ের অধিক প্রিমিয়াম দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন করা হবে। গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দিতে, তহবিল পরিচালনা ও প্রশাসনের জন্য আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রাস্ট তহবিল নামে একটি তহবিল গঠন করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালকরা এ তহবিলের ট্রাস্টি বোর্ড হবেন। এ তহবিলে বীমাকৃত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে অর্থ পাওয়া যাবে তা জমা রাখা হবে। এ ছাড়া কোনো ক্ষেত্রে এ তহবিলের টাকা বিনিয়োগ করলে সেখান থেকে যে আয় আসবে, সেটিও তহবিলে জমা রাখা হবে।*

*খসড়া আইনের বিধানে বলা হয়, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পর তার আমানতকারীদের যে অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রাস্ট তহবিল পরিশোধ করবে, সেটি সংশ্লিষ্ট দেউলিয়া হওয়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদের বিপরীতে যে তারল্য থাকবে তা সমন্বয় করা হবে। এখানে অবসায়ন বলতে কোনো কোম্পানি কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা, বন্ধ করা এবং দায়দেনা নিষ্পত্তি করাকে বোঝায়।*
*আইনটি প্রবর্তনের পর প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত তফসিলী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রাস্ট তহবিলের সঙ্গে বীমাকৃত হবে। এ ছাড়া প্রত্যেক বীমাকৃত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের আমানতের অংশের ওপর প্রতিবছর এ তহবিলে প্রিমিয়াম প্রদান করবে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় নির্ধারণ করে দেবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিয়ে প্রিমিয়ামের হার কম-বেশি করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যয় খাত থেকে প্রিমিয়ামের অর্থ পরিশোধ করবে।*