প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *বি’য়ের স্ব’প্নে ১২ তরুণী যাচ্ছিল মা’লয়েশিয়া; সবার মৃ’ত্যু*

*বি’য়ের স্ব’প্নে ১২ তরুণী যাচ্ছিল মা’লয়েশিয়া; সবার মৃ’ত্যু*

262
*বিয়ের স্বপ্নে ১২ তরুণী যাচ্ছিল মালয়েশিয়া; সবার মৃত্যু*

*বিয়ে করে সংসার পাততেই দল বেঁধে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন রোহিঙ্গা তরুণীরা! এমনটি জানিয়েছেন কক্সবাজারের সেন্ট’মার্টিন সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে ট্র’লার ডুবির ঘ’টনায় উদ্ধা’র হওয়া বেশ কয়েকজন তরুণী। বিয়ের স্বপ্নে যাওয়া ১২ তরুণীই মা’রা গেছে। উদ্ধার হওয়া টেকনাফের শামলাপুর ক্যা’ম্পের তরুণী খতিজা বেগম বলেন, ‘বাবা নেই, তাই যৌ’তুক দিয়ে বিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ অন্ধকার চিন্তায় জীবনটা এলোমেলো চলছে। পরিচিতদের মাধ্যমে জেনেছি, মালয়েশিয়ায় স্থানীয় ও প্রবাসীরা বিনা যৌ’তুকে তরুণীদের সম্মান দিয়ে বউ করে নেন। সংসারী হতেই ঝুঁ’কি নিয়ে ট্র’লারে মালয়েশিয়া পাড়ি দিচ্ছিলাম। কিন্তু ভাগ্য আমাদের সহায় হয়নি।’*

*একই কথা বলেন মধুরছড়া ক্যা’ম্প থেকে ট্রলারে ওঠা রোকসানা বেগম, জাদিমুরার হোসনে আরা, লম্বাশিয়ার ইয়াসমিন। তারা বলেন, ‘ক্যাম্পে জীবনটা বিষিয়ে উঠেছে। স্বজাতিরাই অসহনীয় আচরণ করে। এখানে সময়টা অতিবাহিত হলেও বুড়িয়ে যেতে হচ্ছে। তাই পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যতের সন্ধানে ঝুঁকি নিয়েছি।’ উ’দ্ধার হওয়া এসব রোহিঙ্গা তরুণীর সঙ্গে রয়েছেন কিছু বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তাও। তাদের মধ্যে নূর বানু ও ছলেমা খাতুন বলেন, ‘একটা কাজে যোগ দিয়ে সন্তান ও নিজেদের সামনের দিনগুলো সুন্দর করার আশায় ট্রলারে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। এভাবে মাঝ সাগরে ট্রলার ডুবে মৃ’ত্যুর মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাও করিনি।’*

*মৃ’ত্যুঝুঁকিতেও বন্ধ হচ্ছে না ট্র’লারে মালয়েশিয়া যাওয়া*
*সাগরপথে ট্র’লারে চেপে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ইঞ্জি’ন বিকল হয়ে সাগরে ভাসছিল ১২২ রোহিঙ্গা নাগরিক। খবর পেয়ে কো’স্টগার্ড তাদের উ’দ্ধার করে। এসব রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা। নিশ্চিত মৃ’ত্যুমুখ থেকে ১৪ নভেম্বর তাদের সে’ন্ট মা’র্টিনের অদূরে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর থেকে উ’দ্ধার করা হয়। ঠিক একই অবৈধ পথে ১২০ জন রোহিঙ্গা নিয়ে ট্রলার যাচ্ছিল মালয়েশিয়ার পথে। গতকাল ভোরে প্রবালদ্বীপ সে’ন্টমার্টিনের ছেঁড়া দ্বীপের কাছে গভীর সমুদ্রে সেই ট্র’লারটি ডুবে যায়। এ দুর্ঘ’টনার পর জীবিত অবস্থায় উদ্ধা’র করা হয়েছে অন্তত ৭৬ জনকে। লা’শ উদ্ধার হয়েছে ১৬টি। বাকিদের উদ্ধারে অ’ভিযান চালাচ্ছে কো’স্টগার্ড ও নৌ’বাহিনী।*

*ট্র’লারডুবিতে সাগরে সলিল স’মাধি, আইনশৃঙ্খলা বা’হিনীর হাতে আটক হয়ে দীর্ঘ কারাবাস, পথে পথে নানা বিপদ ও নির্যাতনের তোয়াক্কা করছে না অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে দেশত্যাগীরা। বরং উন্নত জীবনের আশায় দালা’লদের প্র’লোভনে পা দিয়ে অসংখ্য মানুষ মৃ’ত্যুঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত সাগরপথে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন। পথিমধ্যে অনেকেই জীবন হারাচ্ছেন, অনেকেই বিদেশের কারাগারে বছরের পর বছর কারাবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। দেশে স্বজনদের অনেকেই জানেন না তাদের জন্য উপার্জন করতে যাওয়া প্রিয়জনটি ভয়া’নক বি’পদে কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কিনা।*

*তবুও কক্সবাজার উপকূল দিয়ে ট্র’লারে চেপে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার থামছেই না। তবে প্রশাসনের তৎপরতার কারণে পা’চারকারীচক্র কৌশল বদলিয়েছে। পাচারের জন্য তারা বাংলাদেশিদের পরিবর্তে রোহিঙ্গাদের ওপর নজর দিয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৩০টি রোহিঙ্গা ক্যা’ম্পে চক্রের সদস্যরা নিয়মিত আনাগোনা করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে তারা। প্রায় ৪৫০ সদস্যের এ চক্রের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১৩ জন আটক আছে।*
*টেকনাফ দিয়ে পাচা’রকালে গত এক মাসে ৩ শতাধিক রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও পুলিশ। উ’দ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যা’ম্পে বসবাস করে আসছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহি’নীর তথ্য মতে, গত এক সপ্তাহে অভি’যানে উ’দ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আর এসব নারীর বেশির ভাগ অবিবাহিত। তাদের মালয়েশিয়ায় বিয়ে দেওয়ার নাম করে পাচার করা হচ্ছিল।*

*এর আগে এভাবে অনেকেই প্রতা’রণার শি’কার হয়েছে। তা ছাড়া অনেক নারীই সন্তানসহ মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে চান, যাদের স্বামী সেখানে অবস্থান করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার স্থানীয় বাংলাদেশিরা রোহিঙ্গাদের যোগসাজশে মানব পাচারের একটি বড় নেট’ওয়ার্ক গড়েছে। এ নেটও’য়ার্কের হয়ে ক্যা’ম্পে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্র’চারণা চালায় চক্রের রোহিঙ্গা সদস্যরা। ক্যা’ম্পের যারা বিদেশ গমনে রাজি হয়, তাদের বাইরে এনে চক্রের বাংলাদেশি সদস্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর নামে রাতের অন্ধকারে সুযোগ বুঝে ট্র’লারে তুলে দেওয়া হয়। এসব ট্র’লার সাগরের মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থান করা জাহাজে তুলে দেয় বিদেশ গমনেচ্ছুকদের। অভিযোগ আছে, মানব পা’চারকারীচক্রের খ’প্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে অনেক রোহিঙ্গা প্র’তারণার শি’কার হয়েছে। পাচা’রকারীরা রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার নামে ট্র’লারে তুলে সাগরে দু-তিন দিন ঘুরিয়ে টেকনাফের অন্য এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। আর বলা হয়- এটিই মালয়েশিয়া। পাচার’কারীচক্রটি এসব রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার নামে অগ্রিম ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে আদায় করে থাকে।*

*স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ক্যাম্পের ভিতরে পা’চারকারী কয়েকটি সংঘবদ্ধচক্র রোহিঙ্গাদের সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠাতে তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা রোহিঙ্গাদের ক্যা’ম্পের ব’দ্ধ জীবনযাপন ছেড়ে কম খরচে ট্রলারে মালয়েশিয়া যেতে উদ্বুদ্ধ করছে। এ ছাড়া ক্যা’ম্পে থাকলে যে কোনো সময় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হবে, এমন ভয়ও দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের। জামতলী ক্যা’ম্পের রোহিঙ্গা নাগরিক মোহাম্মদ শাকের বলেন, ‘ক্যাম্পে একাধিক চক্র রোহিঙ্গাদের সাগরপথে মালয়েশিয়া নিয়ে যেতে তৎপর। তারা রোহিঙ্গাদের জাহাজে করে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেওয়ার নামে জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে। তারা রোহিঙ্গাদের অভয় দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সাগরে তাদের বড় জাহাজ নোঙর করা রয়েছে। সেই জাহাজে করে মালয়েশিয়া পাঠানো হবে।’*

*জেলেদের ভাষ্যমতে, আগস্ট থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সাগর তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে। তাই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করার জন্য এ সময়টাকে বেছে নিচ্ছে পাচারকারী দালালরা। উপকূলীয় এলাকায় এ সময়টা এখন মালয়েশিয়া আদম পাচারের মৌসুম নামে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে নিয়ে আসা হয় কক্সবাজারের উপকূলে। সাধারণত প্রথমে ছোট নৌকাযোগে উপকূল থেকে গভীর সমুদ্রে ট্রলারে তোলা হয়। সেই ট্রলার উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে থাইল্যান্ডে। বলা হয় থাইল্যান্ড থেকে পাঠানো হবে মালয়েশিয়ায়। জানা যায়, ট্রলারে ওঠার পর উত্তাল সমুদ্রে খাবার পানি ও খাদ্য সংকট একটি স্বাভাবিক ঘটনা।*

*এ ছাড়া দালালদের বিভিন্ন অত্যাচার তো আছেই। তা ছাড়া সমুদ্রের পাহারায় থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য অনেক সময়ই ট্রলারের নিচে গাদাগাদি করে রাখা হয় বিদেশ গমনেচ্ছুদের। প্রায় প্রত্যেকবারই ট্র’লারে তোলার পর প্রত্যেককে বিশেষ ধরনের মা’দক সেবন করানো হয় যাতে তারা নিস্তেজ বা ঘুমিয়ে থাকেন। এ রকম ভয়াল পথে বিদেশ গমনেচ্ছু শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। আবার অনেক সময়ই উত্তাল সমুদ্রে পথ হারিয়ে ফেলে ট্রলারগুলো। তাই বিপরীত পথে শ্রীলঙ্কায় ট্র’লার থেকে আ’টকের ঘট’নাও আছে। একবার পথ হারিয়ে গেলে সময় বেশি লাগার কারণে এমনিতেই শেষ হয়ে যায় সেখানে থাকা জ্বালানি এবং খাবার। তখন সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে চলতে থাকে অনিশ্চিত যাত্রা।*

*ভেসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। সূত্র জানায়, কোনোভাবে ট্র’লার থেকে নেমে থাইল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছার পর শুরু হয় আরেক ভয়াল অধ্যায়। কারণ দুর্গম কোনো উপকূলেই ট্র’লারগুলো ভিড়ে। সেখান থেকে নেমে হাঁটতে হয় দুর্গম বনে। প্রায় মাসখানেক হাঁটতে হয় কোনো ধরনের খাবার ও পানি ছাড়াই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফেলেই চলে যায় অন্যরা। পরে দালাল পরিবর্তনের সময় কোনো একটি খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। দরজাও বাইরে থেকে থাকে তালাবদ্ধ। দালালদের আসার নির্দিষ্ট সময়ক্ষণ না থাকায় আলো-বাতাসহীন সেসব ঘরে সৃষ্টি হয় অবর্ণনীয় পরিবেশ। কারও মৃ’ত্যু ঘটলেও সেই লা’শ থাকে অন্য জীবিতদের সঙ্গেই। এর পাশাপাশি দালালদের মাধ্যমে দেশে ফোন করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের নামে টাকা আদায়ের ঘটনা তো আছেই। টাকা না পেলে অর্ধেক পথেই বিক্রি হয়ে যেতে হয় ক্রী’তদাস হিসেবে।*