প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না ধর্ষ’কদের*

*কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না ধর্ষ’কদের*

42
*কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না ধর্ষকদের*

*দেশে আ’শঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলছে ধ’র্ষণকাণ্ড। কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না ধর্ষ’কদের। ধর্ষ’ণের বিরুদ্ধে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সচেতনতা বাড়লেও একের পর এক ধ’র্ষণ হচ্ছেই। ধর্ষ’ণ এখন আর কোনও শ্রেণির মধ্যে নেই, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত সব শ্রেণির মানুষ এবং কোনও বয়সের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। ধ’র্ষকের লো’লুপ দৃষ্টি থেকে বাদ যাচ্ছে না নিজের সন্তানও। ৩ বছরের শিশু থেকে ৬৫ বছরের নারীরাও বাদ যাচ্ছে না। রেহাই পাচ্ছেন না বাক’প্রতিবন্ধী বা ভব’ঘুরে পা’গলিনীও। বোর’কা পরা নারীও ধ’র্ষণের শি’কার হচ্ছেন।*

*ধ’র্ষণ বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় সংস’দে এ নিয়ে কথার ঝড় তুলেছেন সংস’দ সদস্যরা। মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) ধর্ষ’ককে আইন-শৃঙ্খলা বা’হিনীর ‘ক্র’সফায়ার’-এ দেয়ার দাবি জানিয়ে জাতীয় সংসদের সরকার ও বি’রোধী দলের বেশ কয়েকজন সদস্য বক্তব্য রেখেছেন। যদিও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।*
*সমাজ সংস্কারক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ধর্ষ’ণকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ বি’কৃত মান’সিকতা। আর নারীর প্রতি সহিং’সতার মূল কারণ হলো নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা। এমন মানসিকতাই নারীর প্রতি সহিং’সতাকে উ’সকে দিচ্ছে।*

*ধ’র্ষণের ঘট’না বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, অবাধ আকাশ-সংস্কৃতি, মা’দকের বিস্তার, বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও।*
*গত পাঁচ বছর সারা দেশে ধর্ষ’ণের ঘটনা ঘটেছে ১৯ হাজার। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১টি ধ’র্ষণের ঘ’টনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিশুরাই বেশি ধর্ষ’ণ ও হ’ত্যার শি’কার হচ্ছে।*
*সম্প্রতি রাজ’ধানীর কুর্মিটোলা এলাকায় ঢাকা বিশ্ব’বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধ’র্ষণের ঘট’নায় দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ধর্ষ’ককে গ্রেফতার করতে আইন-শৃঙ্খলা বা’হিনীর তৎপরতা ছিল লক্ষ করার মতো। কিন্তু এই তৎপরতার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু ধ’র্ষণের ঘ’টনা ঘটে’ছে।*

*ঢাকার কেরানীগঞ্জে পাশবি’কতার শি’কার হয়েছে এক শিশু। ঘট’নাটি গত রোববারের হলেও বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) তাকে ঢাকা মেডি’কেল কলেজ হাস’পাতালে ভর্তির পর জানা যায় সব।*
*ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, পান আনার কথা বলে নিজ কক্ষে নিয়ে ৮ বছরের ওই শিশুকে ধ’র্ষণ করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সিদ্দিক নামের এক ব্যক্তি। অভি’যুক্ত স্থানীয় প্রভাবশালী হওয়ায় শিশুটির পরিবার ঘ’টনাটিকে গোপন রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শিশুটির অবস্থা গুরুতর হলে তাকে ঢাকা মে’ডিকেল ক’লেজ হাসপা’তালে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।*

*কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক কিশোরীকে দল বেঁধে ধ’র্ষণের অভি’যোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ জানায়, বুধবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে টঙ্গী থেকে সুনামগঞ্জ যাচ্ছিলেন ওই কিশোরী। বাস পরিবর্তনের জন্য ভৈরবে নামেন। এ সময় এক ই’জিবাইক চালক সুনামগঞ্জের বাসে তুলে দেয়ার কথা বলে নিয়ে যায় ভৈরব রে’লস্টেশনের পাশে। সেখানেই ধর্ষ’ণ করে চালকসহ কয়েকজন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মা’মলা হয়েছে।*

*মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে ঘরে ঢুকে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে ধ’র্ষণের অভি’যোগে মা’মলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানায়। জানা গেছে, বুধবার (১৫ জানুয়ারি) মধ্যরাতে ঘরের সিঁধ কেটে প্রবেশ করে কয়েকজন মাদ’কাসক্ত। এ সময় স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে দল বেঁধে ধ’র্ষণ করে তারা। অভি’যোগ পেয়ে পুলিশ অভি’যান চালিয়ে মতিয়ার, আবদুল মাজেদ, জহুরুল ও লেবু মিয়াকে গ্রেফতার করে।*

*অনুশোচনা নেই মজনুর: ঢাকা বিশ্ব’বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ধ’র্ষণের দায় স্বীকার করে আ’দালতে জ’বানবন্দি দিয়েছে ধর্ষ’ক মজনু। রি’মান্ড শেষে বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) মা’মলার ত’দন্ত কর্মকর্তা মজনুকে আ’দালতে হাজির করে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবা’নবন্দি লিপিবদ্ধ করার আবে’দন জানান। মহানগর হাকিম মজনুকে যথেষ্ট সময় দেয়ার পর খাস’কামরায় তার জবা’নবন্দি গ্রহণ করেন। জবা’নবন্দির বিষয়টি বিস্তারিত জানা যায়নি।*

*সূত্র’মতে, এ ঘট’নায় মজনু একটুও অনুতপ্ত নয়। সে আদা’লতকে বলেছে, ঘট’নার আগে সে ওই এলাকায় ওত পেতে ছিল। মেয়েটি বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলে সে তার পিছু নেয়। নিরিবিলি সড়কের পাশে গিয়েই সে মেয়েটিকে আক্র’মণ করে। মেয়েটি এতটাই ভয় পেয়ে যায় যে চিৎ’কার-চেঁচা’মেচিও করতে পারেনি। এরপর ঝোপের ভেতর নিয়ে সে মেয়েটিকে ধ’র্ষণ করে। একসময় তাকে গলা’টিপে ধরে হ’ত্যারও চেষ্টা করে। একপর্যায়ে মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়ে। মজনু মেয়েটির ব্যা’গ, মো’বাইল ফো’ন, টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে যায়।*

*মজনু আদালতকে জানায়, সে ওই এলাকায় কখনও মালামাল নিয়ে যাওয়া রি’কশা, ভ্যা’ন, ঠেলা’গাড়ি ঠেলার কাজ করে। কখনও রে’লস্টেশনে কুলিগিরি করে। এসব কাজ করে আয়ের টাকা সে ভিখারি বা সড়কে থাকা মেয়েদের পেছনে খরচ করত। তাদের সঙ্গে খারাপ কাজে লিপ্ত হতো। কখনও ওই স্থানে যাতায়াত করা প্রতিবন্ধী বা ভিক্ষুক নারীকে ধর্ষ’ণ করত সে। যে স্থানে ঢাকা বিশ্ব’বিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধ’র্ষণ করা হয়েছে, সেই স্থানে আরও কয়েকজনকে এভাবে সে ধর্ষ’ণ করেছে।*

*৫ জানুয়ারি (রোববার) সন্ধ্যার দিকে বিশ্ব’বিদ্যালয়ের বাসে করে শ্যাওড়ায় এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছিলেন ঢাকা বি’শ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভুল করে কুর্মিটোলা বা’সস্ট্যান্ডে নামেন তিনি। এরপর ফুটপাত ধরে শ্যাওড়ার দিকে যাওয়ার সময় ধর্ষ’ণের শিকা’র হন। এ ঘটনায় তার বাবা ক্যা’ন্টনমেন্ট থানায় মা’মলা দায়ের করেন।*
*৮ জানুয়ারি (বুধবার) ভোরে মজনুকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরদিন তাকে আ’দালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমা’ন্ডে নেয় পুলিশ।*

*পরিসংখ্যান কী বলে: গত পাঁচ বছর সারা দেশে ধ’র্ষণের ঘট’না ঘটে’ছে ১৯ হাজার। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১টি ধর্ষ’ণের ঘট’না ঘ’টেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিশুরাই বেশি ধ’র্ষণ ও হ’ত্যার শি’কার হচ্ছে।*
*এক জ’রিপ থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালে যৌ’ন হয়’রানির শি’কার হয়েছেন ২৫৮ নারী। ২০১৮ সালে শিকার হন ১৭০ জন। ২০১৬ সালে এক হাজারেরও বেশি নারী ও শিশু ধর্ষ’ণের শি’কার হয়েছেন। ২০১৬ সালে ১০৫০ জন ধর্ষ’ণের শি’কার হয়েছিল। এ ঘ’টনাগুলোকে ধ’র্ষণ, দল বেঁধে ধ’র্ষণ ও ধ’র্ষণের পর হ’ত্যা—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।*
*২০১৭ সালে ধর্ষ’ণের শি’কার ৮১৮ জন নারী। ২০১৯ সালে ধর্ষ’ণের পর হ’ত্যা করা হয় ৭৬ জনকে এবং একই কারণে আ’ত্মহত্যা করেন ১০ জন নারী।*

*দৃষ্টান্তমূলক সা’জা নেই একটিও: ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাই’ব্যুনালে ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাম’লা হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৪টি। মাম’লা নিষ্পত্তি ৪ হাজার ২৭৭টি। সা’জা হয়েছে ১১০টি মাম’লায়। অর্থাৎ বি’চার হয়েছিল ৩ শতাংশের কম। বাকি ৯৭ শতাংশ মাম’লার আ’সামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খা’লাস পেয়ে গেছে। নিষ্পত্তি হওয়া মাম’লাগুলোর ৪১ শতাংশের ক্ষেত্রে আ’সামিরা বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে। ৫৫ শতাংশ মা’মলায় সাক্ষ্য শুনানির শেষে আ’সামিরা বে’কসুর খা’লাস পেয়েছে। কিছু মা’মলা নিষ্পত্তির কারণ নিব’ন্ধন খাতায় লেখা নেই, কয়েকটির নিষ্পত্তি হয়েছে আ’সামির মৃ’ত্যুতে। এভাবে ৯৭ শতাংশ মা’মলার আসা’মির বিরু’দ্ধেই এসব গুরুতর অভি’যোগ প্রমাণিত হয়নি।*

*তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়া’নস্টপ ক্রা’ইসিস সে’ন্টারে পাঁচ হাজার তিনটি ধ’র্ষণের মাম’লা হয়। এর মধ্যে রায় ঘোষ’ণার হার ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ।*
*নারীপক্ষ-এর গবেষণা বলছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধ’র্ষণ ও ধর্ষ’ণচেষ্টার অভি’যোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মাম’লায় মাত্র ৪ জনের সা’জা হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধ’র্ষণের মা’মলা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭২টি। এর মধ্যে সা’জা হয়েছে ৫টি, অব্যাহতি হয়েছে ৯৮৯টি, খা’লাস ২৮৯টি এবং বিচা’রাধীন ৩ হাজার ৮৯টি। ধর্ষ’ণের চেষ্টার মাম’লা হয়েছে ১ হাজার ১৮৬টি। অব্যাহতি ৩২৭টি, খা’লাস ৯৮টি এবং বিচা’রাধীন ৭৬১টি মা’মলা।*

*ঘরেও নিরাপদ নেই নারীরা: নারীরা এখন ঘরেও নিরাপদ নেই। এমনকি বাবাও। এসবের জন্য আসলে বিচার না হওয়াটা দায়ী। তনু হ’ত্যার বি’চার এখনও হয়নি, এমন আরও বহু উদাহরণ আছে। এখন মি’ডিয়ার খবরও এ ধরনের ঘ’টনা বাড়াচ্ছে। কারণ স’হিংসতা সহিং’সতাকে উ’সকে দেয়।*
*গত বছর ঢাকা বিশ্ব’বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নারী শিক্ষার্থীদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গ শিরোনামের একটি গ’বেষণা চালিয়েছে বিশ্ব’বিদ্যালয় গ’বেষণা সংসদের জে’ন্ডার ও উন্নয়ন গবেষক দল। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ঢাবি প্রাঙ্গণে নারী শিক্ষার্থীরা একা চলাফেরা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে ই’ভ টি’জিংসহ নানাভাবে যৌ’ন নিপী’ড়নের শি’কার হন। সাধারণত ক্ষমতাশীল ছাত্রসমাজ ও নিচু শ্রেণির লোকজনের (ভিক্ষুক, পাগল, মাদ’কসেবী) দ্বারা ছাত্রীরা এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হন।*
*গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৩০ জন ছাত্রী জানান, তাদের কেউই ইভ’টিজিং ও যৌ’ন নিপী’ড়নের কারণ হিসেবে ‘পোশাক দায়ী’ তা মনে করেন না।*