প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *আমার সেই দেশ এখন | তসলিমা নাসরিন*

*আমার সেই দেশ এখন | তসলিমা নাসরিন*

97
*আমার সেই দেশ এখন | তসলিমা নাসরিন*

*২৬ বছর আগে এসবের শুরু। আমার মাথার দাম ঘো’ষণা করেছিল সিলেটের এক মাদ্রা’সার প্রি’ন্সিপাল। কারও মাথার দাম ঘো’ষণা করা, অর্থাৎ জনগণকে বলা- তোমাদের মধ্যে ওর মু’ন্ডুটা যে ব্যক্তি কে’টে নিয়ে আসতে পারবে, অর্থাৎ তাকে হ’ত্যা করতে পারবে, তাকে আমি মোটা অঙ্কের টাকা দেব- নিশ্চয়ই খুব বড় এক অপরাধ। কিন্তু এসব অ’পরাধীর বিরু’দ্ধে তখনকার সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। মা’মলা করা, গ্রেফতার করা, জেলে ভরা তো দূরের কথা, সামান্য তিরস্কার পর্যন্ত করেনি। প্রি’ন্সিপাল হাবিবুর রহমানকে বরং টিকিট দিয়েছিল ভোটে দাঁড়ানোর জন্য। প্রকাশ্যে মাথার দাম ঘো’ষণা করার পর অপ’রাধীর জনপ্রিয়তা যদি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোয় বেড়ে যায়, তাহলে তো নিশ্চিতই দেশ ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকেই যাত্রা করবে।*

*ফতোয়ার উচ্ছ্বাসে রাস্তায় তখন প্রায় প্রতিদিন মি’ছিল হতো। এক বদলোক থেকে বাকি বদলোক উৎসাহ পায়। সরকারের মৌনতাকেই লোকেরা সমর্থন বলে মনে করে। মি’ছিলে লোক আনা হতো বিভিন্ন মা’দ্রাসা থেকে। তারা জানতোই না তসলিমা কে, কী লেখে, কিন্তু তার ফাঁ’সি চাইত। তসলিমা নাকি তাদের ধর্মীয় অনু’ভূতিতে আ’ঘাত দিয়েছে। মিছিল দিন দিন ফুলে ফেঁপে বড় হতে থাকে, একসময় ‘অনুভূতির রাজনীতিক’রা হ’রতালের ডাক দেয়, সেই হর’তাল সফল হয়। লং’ মা’র্চের ডাক দেয়, মানিক মিয়া এভি’নিউতে চার লাখ মোল্লার সভা হয়। এক লেখিকার ফাঁ’সির দাবিতে তখন স্কুল কলেজ অফিস আদালত ব’ন্ধ থাকে, যানবাহন চলাচল ব’ন্ধ থাকে। উগ্রধর্মান্ধ আর জঙ্গিরা তখন রাস্তাঘাটে অবাধে চরম উচ্ছৃ’ঙ্খলতা, র’ক্তপাত আর না’রকীয় উল্লা’সে ব্যস্ত। সরকার ওদের শাস্তি তো দেয়ইনি, ওদের শান্ত করার কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি।*

*উলটে আমাকে শাসিয়েছে, আমার বিরুদ্ধে খালেদা সরকার মা’মলা করেছে, আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, আমাকে দেশ ত্যা’গ করতে বাধ্য করেছে। যারা দুদিনের মধ্যে চার লাখ লোকের জমায়েত ঘটিয়ে দিতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলোর জিভ তখন তাদের দলে টানার মতলবে বেরিয়ে এসেছে। ওইসব ধর্ম ব্যবসায়ীর অনেকেই পরে সংসদে বসেছে। আমি কোথায়? চিরকালের নির্বাসনে। কী অপ’রাধ ছিল আমার? আমার অপ’রাধ ছিল… নারীর সমান অধিকার দা’বি করা, মানবাধিকারের লঙ্ঘ’ন যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখার কথা বলা, ধর্মীয় আই’নের বদলে নারী পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে আ’ইন তৈরি করার দাবি করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য আ’বেদন করা।*

*আমার প্রিয় দেশটিকে সেদিন দেখেছি কী রকম ভ’য়ঙ্কর উ’ন্মত্ত হতে। বর্ব’রদের উন্ম’ত্ততাকে বারবার উ’সকে দিয়েছে, প্রশ্রয় দিয়েছে শাসকের দল। শুধু আমাকেই নির্বাসনে পাঠিয়ে শান্ত হয়নি ওরা, কত বুদ্ধিদীপ্ত তরুণকে বর্বর’গুলো নৃ’শংসভাবে হ’ত্যা করেছে। সমাজ হয় ওদের ভ’য়ে তটস্থ, অথবা সহজে মগ’জধোলাই হয়ে এক একটা জড়ো পদার্থ হয়ে বসে আছে। প’ঙ্গপালে ছেয়ে গেছে দেশ। এই দেশকে বর্ব’রদের কবল থেকে কে বাঁচাবে? আমি তো কাউকে দেখি না। যে দলকে নিয়ে আশা ছিল, সে দল ওদের সঙ্গে আপস করেছে। বাকিরা ব্যস্ত সরকারের চাটু’কারিতা করে আখের গুছিয়ে নিতে। মানবাধিকারে, বাকস্বাধীনতায়, গণতন্ত্রে, নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করা সৎ, নিষ্ঠ, আদর্শবাদী মানুষ আজ নেই বললে চলে।*

*সবকিছু কতটা ন’ষ্ট হলে একজন সুফি গায়ককে গ্রেফতার করতে পারে, রিমা’ন্ডে পাঠাতে পারে, জেল-হাজতে ভরতে পারে, তা সামান্য বিবেক যাদের আছে, তারা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারে। ইসলামে গান নি’ষিদ্ধ নয়, …এ কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন শরিয়ত সরকার বাউল। মোল্লাতন্ত্র খুশি নয় শরিয়ত বাউলের ওপর, সে কারণে গ্রামেগঞ্জে পালাগান গাওয়া এই সুফিকে ব’ন্দি করা হয়েছে। মোল্লাতন্ত্র আছে বলেই অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তচি’ন্তকদের হয় নি’হত হতে হয়, নয়তো নির্বাসন জীবনযাপন করতে হয়।*

*শরিয়তকে দোষী সাব্যস্ত করা মানেই ইসলামে গান-বাজনা নি’ষিদ্ধ তা প্রতিষ্ঠিত করা। তাহলে কি বাংলাদেশে আজ থেকে সব গান বাজনা নি’ষিদ্ধ? রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, পল্লী গীতি, বাউল গান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, ব্যান্ডের গান, আধুনিক গান, গণসংগীত, জীবনমুখী গান, সব নি’ষিদ্ধ? তাহলে সব নিষি’দ্ধই করে দেওয়া হোক। শিল্প-সাহিত্য সব নি’ষিদ্ধ হোক। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ব’ন্ধ করে দেওয়া হোক। কোনো একাডেমি নয়, লাই’ব্রেরি নয়, জাদুঘর নয়। টুপি আলখাল্লা আর বো’রখাই হোক নারী পুরুষের পোশাক, অন্য কিছু নয়।*

*মাথার সামান্য চুল যদি বেরিয়ে আসে বোরখার ফাঁ’ক দিয়ে, তাহলে রাস্তাঘাটে ধর্ম-পুলিশরা পে’টাবে মেয়েদের, যদি বো’রখার তলায় ট্রাউজার পরে কোনো মেয়ে, তাহলেও ১০০ চা’বুক মা’রবে। দেশে কোনো আদালত নয়, থাকবে শুধু শরি’য়া কো’র্ট। জনতার সামনে তলো’য়ারের এক কোপে মৃ’ত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ধ’ড় থেকে মু’ন্ডু ফেলে দেবে। শুধু স্বামী-সন্তানের সেবা আর সন্তান উৎপাদনের জন্য ঘরব’ন্দী করা হোক নারীকে। আল্লাহর শা’সন চলবে দেশে। পাথর ছুঁ’ড়ে হ’ত্যা করা হবে তাদের যারা ধর্ম গাফি’লতি করবে, যারা ব্যভি’চার করবে, যারা ধর্ম পালন নিয়ে প্রশ্ন করবে। কোনো গণতন্ত্র, কোনো মানবাধিকার, নারীর অধিকার, কোনো বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে না দেশে।*

*আমি সত্যি চাইছি এমনই ভয়ঙ্কর দিন আসুক। মানুষ পরাধীনতার শেকলে বন্দী থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠুক। মানুষের দম ব’ন্ধ হতে হতে শ্বাস নেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠুক। শেষ অবধি মানুষই মোল্লাতন্ত্রের বি’রুদ্ধে রু’খে উঠুক। মানুষ মানুষকে বাঁচাবার জন্য সত্যিকার গণতন্ত্র আনুক, সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষতা আনুক, সমাজকে সত্যিকার শিক্ষিত আর সভ্য করার জন্য দিন রাত পরিশ্রম করুক। ফিরিয়ে আনুক সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি। ভুলে গেলে চলবে না বাংলার সংস্কৃতি আরবদের সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন। ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের নাম, ধর্ম কোনো সংস্কৃতির নাম নয়, কানুনের নাম নয়। এটিকে ব্যক্তিগত চৌহদ্দি থেকে যদি বাইরে আসতে দেওয়া হয়, তাহলে ধর্ম ব্যবসায়ীরা একে নিয়ে ধু’ন্দুমার ব্যবসা শুরু করবে। তাই করেছে। রাজনীতি শুরু করবে, তাই করেছে। এখন কিছু কি বাকি আছে বাংলাদেশের সৌদি আরব, সুদান, সোমালিয়া বা সিরিয়া হওয়ার?*

*১৯৭১ সালে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে অতীতের বিভিন্ন স্বৈরাচারী শাসক। আজ যে সরকার একাত্তরের রাজা’কারকে ফাঁ’সি দেয়, সেই সরকার বর্তমান রাজাকারদের চুমু খায়। যে সরকার সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনে, সে সরকার রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখে। যে সরকার মানুষকে উদারপন্থি হতে বলে, সে সরকারের আ’না ডিজি’টাল নিরাপত্তা আ’ইনে উদারপন্থি হওয়ার অপ’রাধে মানুষকে জে’লে যেতে হয়। তারপরও সরকার চুপ। যেভাবে চুপ ছিল এক এক করে যখন মুক্তচিন্তকদের হ’ত্যা করেছিল জ’ঙ্গিরা। শুধুই গদি হারানোর ভ’য়।*

*সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক যখন অন্যা’য়কে সমর্থন করে, আমাদের ক্ষমতাবান সরকারপ্রধানও মনে করেন, অন্যা’য়কে সমর্থন করতে হবে, তা না হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন হারাতে হবে। আজ যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ভেড়ায় পরিণত হয়, তবে তাদেরকে ভেড়ায় পরিণত করার দায় কিন্তু সবচেয়ে বেশি সরকারের। ভেড়ার সমর্থনের বদলে ভেড়াকে যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তাশীল, প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও কিন্তু সবচেয়ে বেশি সরকারের।*
*এই দায়িত্ব যদি আজ সরকার না নেয়, যদি ডি’জিটাল নিরাপত্তা আ’ইনের মতো একটি কালা’কানুন আজও বা’তিল না করে, আজও যদি বাউল বয়াতিদের মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা না করে, যদি মুক্তচিন্তকদের দেশে ফিরিয়ে না আনে, যদি মানুষের বাকস্বাধীনতা রক্ষা আজও না করে- তবে আমরা নিশ্চিত যে দেশটিকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে বাঁচাবার সুযোগ পেয়েও বাঁচায়নি এই সরকার। দেশটিকে তাহলে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার অপরাধে অপরাধী সব সরকারই।*
*লেখক: নির্বাসিত লেখিকা।*