প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *ধ’র্ষণ রো’গ নয়, ভয়া’নক মহা’মারি | আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী*

*ধ’র্ষণ রো’গ নয়, ভয়া’নক মহা’মারি | আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী*

142
*ধ'র্ষণ রোগ নয়, ভয়ানক মহামারি | আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী*

*বাংলাদেশে নারী ধ’র্ষণের সংখ্যা বেড়েছে। একটু বেশি বেড়েছে। ধ’র্ষকদের চরম শা’স্তি দেওয়ার জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষো’ভ, মানববন্ধন ইত্যাদি চলছে। পুলিশ যে ধর্ষ’কদের ধরার জন্য কম তৎপর তা-ও নয়। বি’চারকরাও তাঁদের আদালতে ধ’র্ষণের বি’চারে আগের চেয়ে অনেক কঠোর মনোভাব দেখান। সরকার কি ধর্ষ’ণের মতো অপরাধ দমনে উদাসীন? তা-ও নয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেনীর নুসরাত হ’ত্যাকাণ্ডে হস্ত’ক্ষেপ করেছেন। মাদ’রাসার ধ’র্ষক প্রি’ন্সিপালসহ তাঁর সহযোগীদের বি’চারে ফাঁ’সির আদেশ হয়েছে।*

*তবু ধ’র্ষণের সংখ্যা দেশে বাড়ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ব’বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে রাস্তায় অসতর্কভাবে পেয়ে এক মাদ’কাসক্ত সি’রিয়াল রেপি’স্ট ধ’র্ষণ করেছে। এই সাহসী ছাত্রী ধ’র্ষিতা হওয়ার পরও থানায় রিপো’র্ট করেছেন। ধ’র্ষক ধরা পড়েছে। এ ঘট’নায় সারা দেশ উত্তাল। তাতে কী? অপরা’ধীরা তাতে দমিত হয়নি। এই কাণ্ডের পরপরই ঢাকার ধামরাই উপজেলায় বাসে মমতা আখতার নামে এক ১৯ বছরের তরুণীকে ধর্ষ’ণের পর হ’ত্যা করে রাস্তায় তাঁর লা’শ ফেলে রাখা হয়। ধর্ষ’ক বাসচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।*

*একই সঙ্গে খবর পাওয়া গেছে স্কুলছাত্রীসহ পাঁচজনের ধ’র্ষিতা হওয়ার। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, রাজবাড়ী, বরিশালের তিন ছাত্রী, সুনামগঞ্জে এক কিশোরী এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক গৃহবধূ এই ধ’র্ষণের শি’কার। রূপগঞ্জের ঘট’নাটি মর্মা’ন্তিক। এক স্কুলছাত্রীকে হরণ করে দুটি বাড়িতে আ’টকে রেখে ১৫ জন দুর্বৃত্ত তাকে ধর্ষ’ণ করে। তাকে রাস্তায় ফেলে যায় ধর্ষ’করা।*

*আমি লন্ডনে বসে কলকাতা ও দিল্লির কয়েকটি সংবাদপত্র হাতে পাই। সারা ভারতসহ পশ্চিমবঙ্গে ধর্ষ’ণ যে হারে বেড়েছে, তাতে বিস্মিত হতে হয়। দিল্লির নৈশবাসে এক শিক্ষার্থী তরুণী না’র্সকে গ’ণধর্ষণের পর হ’ত্যায় নারী নি’র্যাতনের বিরুদ্ধে সারা ভারত বিক্ষো’ভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ভারত সরকার বাধ্য হয়েছিল ধ’র্ষণের অপরাধে মৃ’ত্যুদণ্ড প্রবর্তনে। তাতে অপরাধ দমিত হয়নি; বরং বেড়েছে মনে হয়। দিল্লিতে নির্ভয়া হ’ত্যাকাণ্ডে বছরের পর বছর অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি অক্ষয় ঠাকুর পাল্টা মা’মলা-মো’কদ্দমা করেও বাঁচতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্ট তার মৃ’ত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন।*

*আইন এত কঠোর করা, ধর্ষ’কদের ফাঁ’সি দেওয়া—এত কিছুর পরও ভারতের ধ’র্ষণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এত উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতেও ধ’র্ষণ, নারী নি’র্যাতন, শিশুর ওপর যৌ’ন নির্যা’তন বেড়েছে ব্যাপক হারে। শিশু নির্যা’তনের ব্যাপারে বহু বিখ্যাত লোক অভিযুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে এমপি, আদা’লতের বিচা’রপতিরা রয়েছেন। সম্প্রতি এক সি’রিয়াল রে’পিস্টকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরু’দ্ধে অ’ভিযোগ, সে দুই শর বেশি পুরুষের ওপর যৌ’ন নির্যা’তন করেছে। তাকে বলা হয়েছে ব্রিটেনের সবচেয়ে নি’কৃষ্ট রে’পিস্ট।*

*ব্রিটেনের বি’শ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনকি অক্স’ফোর্ড, কেমব্রিজেও ছাত্রীদের ওপর যৌ’ন হয়’রানি, যৌ’ন নির্যা’তনের ঘ’টনা ঘ’টছে। এটাকে বলা হয় ‘ডে’ট রে’প’। যার অর্থ ডে’টিং করার নামে সহপাঠিনীকে ভুলিয়ে এনে, তার পানীয়তে মাদ’কদ্রব্য মিশিয়ে, তাকে অর্ধচেতন করে ধর্ষ’ণ করা। আমেরিকার বিশ্ব’বিদ্যালয়গুলোতে তো হরহামেশা এই ‘ডে’ট রে’পিংয়ের’ অ’ভিযোগ উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহুদিন এই ডে’ট রে’পিংয়ের ব্যাপারে উদাসীন ছিল। এখন ছাত্রীদের সংঘবদ্ধ আন্দো’লনের ফলে এবং ডে’ট রে’পিংয়ের সংখ্যা বাড়ায় তারা কড়া হতে বাধ্য হয়েছেন।*

*এমন অভি’যোগও শোনা যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বি’শ্ববিদ্যালয়সহ অন্য বিশ্ব’বিদ্যালয়গুলোতে এক শ্রেণির শিক্ষকের হাতে যৌ’ন নির্যা’তনের শি’কার হন অনেক ছাত্রী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের ফার্স্ট’ ক্লা’স দেওয়া হবে না, অথবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চি’ত করা হবে—এই ভ’য় অথবা কোনো প্রলো’ভন দেখিয়ে শিক্ষক মহোদয় তাঁর যৌ’ন কাম’না পূরণ করেন। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপী’ড়নের এক ঘ’টনায় ঢাকার ভিকারুননিসা নূন কলেজে কিছুদিন আগে তো রীতিমতো ঝড় উঠেছিল। এমন যে রবীন্দ্রনাথের তপোবনের মতো শান্তিনিকেতন (যা এখন তপোবন নেই) বিশ্ব’বিদ্যা’লয়, তাতে ছাত্রী নিগ্রহ ও নির্যা’তন কর্তৃপক্ষকে ভাবিয়ে তুলেছে। পৌষ মেলা বা মাঘী মেলা হলেই কিছু ছাত্রী দু’র্বৃত্তদের হাতে ধ’র্ষিতা হয়। এটা দেখে এবার পৌষ মেলা সে’না প্রহরায় করতে হয়েছে।*

*ধ’র্ষণ কোনো রোগ নয়, রোগের বহিঃপ্রকাশ। সমাজ যখন অবক্ষয়ের তলানিতে পৌঁছায়, তখন সমাজদেহে তার ঘায়ের বহিঃপ্রকাশ ঘ’টে, তার মধ্যে ধ’র্ষণ একটি। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে সামাজিক অবক্ষয় কোথায় পৌঁছেছে, এটা তার লক্ষণ। পাকিস্তানে শ্বশুর পুত্রবধূকে ধ’র্ষণ করেছে, সে জন্য শ্বশুরের কোনো শা’স্তি হয়নি। শা’স্তি হয়েছে পুত্রবধূর। গ্রামের মোল্লার ফতোয়ায় পুত্রবধূকে ১০০ ঘা বেত মে’রে হ’ত্যা করা হয়েছে।*

*অনেকে বলেন, সামাজিক ব্যবস্থার এই অবক্ষয় দূর করার জন্য রাজনীতিকদের তৎপর হওয়া উচিত। এর জবাব হচ্ছে, যে শর্ষের দ্বারা ভূত তাড়ানো হবে, সেই শর্ষের মধ্যে ভূত ঢুকলে তা তাড়াবে কে? বিশ্বের বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের—আমাদের জেনারেল এরশাদ থেকে ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত যে যৌ’ন কে’লেঙ্কারি, তাতে রাজনীতিকদের ওপরেই বা ভরসা করবেন কারা? ভারতে একজন প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত যৌ’ন কেলে’ঙ্কারির দায়ে অভি’যুক্ত হয়েছিলেন। অবশ্য তিনি অভি’যোগ থেকে মু’ক্তি পেয়েছেন।*

*বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া তাঁর ‘মৃদুভাষণ’ কলামে কয়েক বছর আগে লিখেছিলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘট’ছে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য সর্বক্ষেত্রেই দ্রুত উন্নতি ঘ’টছে। কিন্তু যেভাবে সামাজিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে, তাতে অর্থনৈতিক উন্নতি দ্বারা কী লাভ হবে, তা-ই ভেবে শ’ঙ্কিত হচ্ছি। সামাজিক পচ’ন অন্য সব উন্নতিকে গ্রা’স করে ফেলবে।’*

*শাহ এএম’এস কিবরিয়ার এই সতর্কবাণীটি আজকের জন্যও প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটিকে যে ধর্ষ’ণ করেছে, শুধু তাকে নি’ন্দা করে লাভ নেই। নি’ন্দা অবশ্যই করতে হবে, তা এই ধর্ষ’কদের যারা তৈরি করেছে সেই সমাজ ও সমাজকর্তাদের। রাজনৈতিক নে’তাদের, সমাজ নির্মাণের দায়িত্ব যাঁরা পালন করেননি, বরং নিজেদেরও ব্যক্তিগত চরিত্রের স্খ’লন দ্বারা সমাজের চরিত্রেও স্খল’ন ঘটি’য়েছেন, তাঁদের আজ চি’হ্নিত হওয়া প্রয়োজন। বিচার হওয়া প্রয়োজন।*

*কিন্তু এই বিচার করবে কারা? সলিল চৌধুরী গান লিখেছিলেন—‘বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা।’ কিন্তু আজ সেই জনতা কোথায়? জনতাকে জাগাবেন যে সমাজপতি, রাজনৈতিক নে’তারা, তাঁরাই তো আজ চরিত্র ভ্রষ্ট। ব্রিটেনের মন্ত্রিসভা থেকে একাধিক মন্ত্রীকে নারী কে’লেঙ্কারির জন্য মন্ত্রিত্ব ত্যা’গ করতে হয়েছে। তা শুনে ফ্রান্সের এক প্রেসি’ডেন্ট বলেছিলেন, ‘এই কেলে’ঙ্কারির জন্য মন্ত্রিসভা থেকে যদি মন্ত্রি তাড়াতে হয়, তাহলে আমার মন্ত্রিসভায় একজন মন্ত্রীও থাকবেন না।’*

*তাই আমার কথা, শুধু কঠোর আইন করে, ধর্ষ’কদের ফাঁ’সি দিয়েও এই অপরাধ দমানো যাবে না। ধ’র্ষণ সামাজিক অবক্ষ’য়ের ঘৃ’ণ্য বহিঃপ্রকাশ। এর সংক্রমণ কু’ষ্ঠরোগের চেয়েও দ্রুত। এর পচন থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে সমাজের দূষ’ণমুক্তি দরকার। সমাজে প্রতিরোধ চেতনা তৈরি এবং ধ’র্ষণের বি’রুদ্ধে সামাজিক প্র’তিরোধ গড়ে তোলা দরকার। নারীকে সম্মান জানাতে হবে। তাঁর ব্যক্তি অধিকারের সীমানা ল’ঙ্ঘন করা চলবে না। এসব কথা শুধু কেতাবেই লেখা থাকলে চলবে না। এই নৈতিক শক্তির পুনর্জা’গরণ ঘটাতে হবে। ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হারানো নৈতিক শক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।*

*বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বহু ক্ষেত্রে বহু সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু সমাজে নৈতিক মুক্তি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও যে বিরাট সামাজিক অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছে তা বন্ধ করতে পারেনি। এটা যদি তারা না পারে, তাহলে দেশের যতই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটান, বঙ্গবন্ধুর নামে জয়ধ্বনি দেন, দেশে সামাজিক বিপর্যয় রোধ করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আমাদের যুব প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগ গঠন করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে শুদ্ধি অভি’যানে ধরা পড়েছে, এই যুবলীগের অবস্থান আজ কোথায়? যুবসমাজের মধ্যেই ধর্ষ’ণের প্রবণতা বাড়ছে।*

*আমাদের সমাজতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের সত’র্ক হওয়া উচিত, কিভাবে এই অবক্ষয়ের প্রতিরো’ধ করা যায়। আমরা কোনো রোগ মহা’মারি আকারে দেখা দিলে তার প্রতিকারে দ্রুত সচেষ্ট হই। ধর্ষ’ণ মহা’মারির চেয়েও ভয়ানক সামাজিক ব্যাধির প্রকাশ। এর প্রতিকারের জন্য আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি—উভয়েরই আজ স’তর্ক ও সচেষ্ট হওয়া জরুরি দরকার।*
*লন্ডন, সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২০*