প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *ধ’র্ষণের শিকার যারা, তারা যেন আর মুখ না লুকোয় | তসলিমা নাসরিন*

*ধ’র্ষণের শিকার যারা, তারা যেন আর মুখ না লুকোয় | তসলিমা নাসরিন*

65
*ধ'র্ষণের শিকার যারা, তারা যেন আর মুখ না লুকোয় | তসলিমা নাসরিন*

*ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী ধ’র্ষণের শি’কার হয়েছে। ছাত্রীটির নাম কি? নাম কেন বলা হচ্ছে না? তার চেহারাও কেন দেখানো হচ্ছে না? আমরা কিন্তু ধ’র্ষকের চেহারা দেখে ফেলেছি, তার নাম যে মজনু তাও জেনে ফেলেছি। ধ’র্ষণের শি’কারকে কেন মুখ লুকোতে হবে? ধ’র্ষকরা তো দিব্যি নাম ধাম সাকিন জানিয়ে দেয়, ক্যামেরার দিকে তাকাতে তাদের তো লজ্জাবোধ হয় না! তাহলে কি ঘ’টনা এই যে সমাজের ভয় একজন ধর্ষি’তার আছে, কিন্তু একজন ধর্ষ’কের নেই? কেন নেই? এককালে না হোক, আজকাল তো ধর্ষ’কদের পুরুষেরাও মেনে নেয় না। তারা ধর্ষ’ণের ঘট’না ঘট’লে নিজেরা যে ধর্ষ’ক নয়, তা প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, বলতে থাকে সব পুরুষ ধ’র্ষক নয়, ধ’র্ষকের জন্য কঠিন কঠিন শা’স্তির প্রস্তাব দিতে থাকে, ফাঁ’সি, পুরু’ষাঙ্গ ক’র্তন, কত কী। তাহলে কেন আজও এই একবিংশ শতাব্দীতেও মেয়েরা নিজের পরিচয় লুকোতে বাধ্য হয়?*

*আমরা জানি কেন লুকোয় পরিচয়। কারণ যতই মানুষ ধর্ষ’ণের বিরু’দ্ধে বলুক, যতই ধর্ষ’ককে গা’লি দিক, মানুষ আজও মেয়েকেই দোষী বলে মনে করে। মেয়েটি কী পোশাক পরেছিল? কোনও ছোট পোশাক? মেয়েটি যদি কোনও ছোট পোশাক না পরে থাকে, তবেও দোষ, কেন হিজাব পরেনি, যদি হিজাব পরে থাকে, তবে দোষ কেন বোরখা পরেনি। মেয়েটি বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছিল, কেন একা যাচ্ছিল, একা গেলে তো এরকম হবেই। কেন কোনও পুরুষ আত্মীয় ছিল না সঙ্গে? কেন সন্ধেয় যাচ্ছিল, দিনের বেলায় তো যেতে পারতো! দোষের শেষ নেই। ধর্ষ’ণকে পুরুষের অধিকার বলে যারা বিশ্বাস করে, তারা পদে পদে মেয়েদের দোষ খুঁজে বেড়াবে বলার জন্য অন্য মেয়েরা তো ধ’র্ষণের শি’কার হয় না, ও হলো কেন, নিশ্চয়ই ও খারাপ। নিশ্চয়ই ধর্ষি’তা হতেই সে চেয়েছে!*

*ধ’র্ষণের কারণ যে পুরুষের না’রীবিদ্বেষ, নারীকে যৌ’নবস্তু ভাবার মানসিকতা, নারীকে নি’র্যাতন করাই যায়, নারী তো নিতান্তই তু’চ্ছাতিতুচ্ছ বস্তু- এই বিশ্বাস, তা অনেকে জানে না। অথবা জানলেও না জানার ভান করে। ধর্ষ’ণের শি’কার হলে হাজারো মেয়ে সাধারণত মুখ বুজে থাকে। তারা রাষ্ট্র করে না খবর। এই মেয়েটি জানিয়েছে সব্বাইকে। নিঃসন্দে’হে সাহসী মেয়ে। কিন্তু সে ততটুকু সাহসী নয়, যতটুকু সাহসী হলে পাছে লোকে কী বলবে তার তোয়াক্কা করে না। দিল্লির বাসে যে মেয়েটিকে গণধর্ষ’ণ করা হয়েছিল, মৃ’ত্যুর সঙ্গে যখন সে লড়’ছিল, সারা পৃথিবীর সমর্থন সহানুভূতি পেয়েছিল সে, তারপরও নিজের নাম যে জ্যোতি সিং, তা বলেনি। তার নাম দেওয়া হয়েছিল নির্ভয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটির নামও কি তবে ওই জাতীয় কিছু একটা দেওয়া হবে? আর কতদিন এই ভীতু মেয়েদের আমরা নির্ভয়া বা সাহসিনী বলে ডাকবো?*

*ধ’র্ষণের শি’কার যারা, তারা যেন আর মুখ না লুকোয়। যদি এমন হয় যে ধর্ষ’ণের শি’কার হলে তাকে হে’নস্তা করা হচ্ছে, তাহলে যারা হে’নস্তা করছে, তাদের চি’হ্নিত করা হোক। তাদেরও শা’স্তির ব্যবস্থা হোক। শুধু ধর্ষ’ণ যে করে, সে-ই দোষী? ধর্ষ’কের পক্ষ নিয়ে যারা তার শি’কারকে ঘৃ’ণা করে, একঘরে করে, তুচ্ছ’তাচ্ছিল্য করে, নির্যা’তন করে- তারাও তো ধ’র্ষকের মতোই। ধ’র্ষক করে শারী’রিক নি’র্যাতন, সমাজের ভদ্রলোকেরা করে মানসিক নির্যা’তন। এখনও শারীরিক নির্যা’তনকে নি’র্যাতন হিসেবে ধরা হয়, মানসিক নির্যা’তনকে নয়। ধর্ষ’ণের পর একটি মেয়েকে পরিবার এবং সমাজ মানসিক নির্যা’তন করে, এ কারণেই মেয়ে হতা’শাগ্রস্ত হয়, আত্ম’হত্যা করে। শারীরিক নি’র্যাতনের চেয়ে মানসিক নি’র্যাতন হাজার গুণ ভয়ং’কর। ধর্ষ’ণ পুরুষতন্ত্রের উপসর্গ ছাড়া আর কিছু নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই ঘোষ’ণা দেয় যে নারী দুর্বল, পুরুষ সবল।*

*পুরুষের জগত বাইরে, নারীর জগত ঘরে। পুরুষ অর্থকড়ি উপার্জন করে, নারী ঘর সংসার করে, শিশু পালন করে। নারীকে তার পিত্রালয় থেকে উঠিয়ে স্বামীগৃহে স্থান দেওয়া হয়। শৈশব কৈশোরে মেয়েরা পিতার অধীন, যৌবনে স্বামীর অধীন। নারীকে স্বামীর সেবা যত্ন করতে হবে, সন্তান, বিশেষ করে পুত্র সন্তান জন্ম দিতে হবে। নারী এবং পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় বেঁধেছে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। এই ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকাই প্রমাণ করে নারী নিতান্তই পুরুষের দা’সী, যৌ’নদাসী। যৌ’নদাসীকে তাই খুব সহজেই রাস্তাঘাটের লোকেরা তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষ’ণ করতে পারে। কোনও ধর্ষ’ক ভাবে না সে অন্যা’য় করছে। ঘরে ঘরে নারী নির্যা’তন চলছে, যে নির্যা’তনকে বৈধ বলে মনে করে দেশের প্রায় সবাই। ঘরে ঘরে ধর্ষ’ণ চলছে। স্ত্রীকে ধর্ষ’ণ করছে স্বামী। আজও স্বামীর ধর্ষ’ণকে ধর্ষ’ণ বলে মানা হয় না। আজও গণি’কালয়ে গিয়ে পুরুষেরা যে ধর্ষ’ণ করে, সেই ধ’র্ষণ এবং যৌ’ন নির্যাত’নকেও বৈধ বলে মানা হয়।*

*ঘরে এবং বাইরে এক শ্রেণির পুরুষ যা করে অভ্যস্ত, তা ধর্ষ’ণ। তবে কেন একটি মেয়েকে সুযোগ পেলে অন্ধকারে নিয়ে ধ’র্ষণ করবে না? পুরুষকে তার পেশি, তার জোর, তার ক্ষমতা, তার সাহস নিয়ে, মোদ্দা কথা তার পৌরুষ নিয়ে গর্ব করতে শেখানো হয়েছে। ধর্ষ’ণ সেই গর্ব থেকেই করে পুরুষ।*
*মজনু নামক ধর্ষ’কটির কাছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব মেয়েই সমান। নারী, তার কাছে, যৌ’নাঙ্গ ছাড়া কিছু নয়। প্রচুর পুরুষ, ধর্ষ’ক অথবা ধর্ষ’ক নয়, নারীকে আস্ত একটি যৌ’নাঙ্গ বলেই বিচার করে। মজনু এমন কোনও অস্বাভাবিক কোনও পুরুষ নয়। সে সমাজের আর দশটা পুরুষের মতোই পুরুষ। তারও হয়তো বউ বাচ্চা আছে অথবা বাবা-মা, ভাই-বোন আছে। সে এই দেশেরই সন্তান। সে আসমান থেকে পড়েনি।*

*মজনুরা আর কতকাল ধ’র্ষণ করবে মেয়েদের? পুরুষদের কি এখনও সময় হয়নি ধর্ষ’ণের বিরুদ্ধে আ’ন্দোলন গড়ে তোলার? পুরুষেরা যেন পুরুষদের সেই ভাবে শিক্ষা দেয়, যে ভাবে শিক্ষা দিলে পুরুষেরা ধ’র্ষণ করবে না বা ধর্ষ’ণ করলেও ধর্ষ’ণ করা ব’ন্ধ করবে। নারীরা চিৎ’কার করলে পুরুষেরা কান দেয় না। নারীরা জানে না কী করলে বা কী বললে পুরুষেরা ধর্ষ’ণ ব’ন্ধ করবে। পুরুষেরাই জানে পুরুষের মন। সুতরাং পুরুষের শিক্ষক, উপদেষ্টা পুরুষকেই হতে হবে। পুরুষকেই দল বেঁধে সিদ্ধা’ন্ত নিতে হবে। কারণ মানব সমাজে বাস করতে হলে, নারীর সঙ্গে এক সমাজে বাস করতে হলে, পুরুষকে নারী নির্যাত’ন ব’ন্ধ করতেই হবে। এ ছাড়া উপায় নেই।*
*লেখক: নির্বাসিত লেখিকা।*