প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *হ’ত্যা ও স’ন্ত্রাস দ্বারা শ’ত্রুতার রাজনীতি করেছে বিএনপি-জামা’য়াত*

*হ’ত্যা ও স’ন্ত্রাস দ্বারা শ’ত্রুতার রাজনীতি করেছে বিএনপি-জামা’য়াত*

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

128
*হত্যা ও সন্ত্রাস দ্বারা শত্রুতার রাজনীতি করেছে বিএনপি-জামায়াত*

*ঢাকায় একটি দৈনিকে একই দিনে দুটি খবর দেখলাম। একটি খবর, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউ’ন্সিলের অধি’বেশন সম্পর্কে। তাতে বলা হয়েছে, এবার দলটির কেন্দ্রীয় কমি’টিতে অনেক নতুন মুখ আসছে। কমি’টিতে নারী প্রতিনিধিত্বও আরো বাড়ানো হবে। আরেকটি খবরে বলা হয়েছে, বিএনপি খালেদা জিয়ার জা’মিনে মু’ক্তি লাভের ব্যাপারে হ’তাশ হয়ে আ’ইনি ল’ড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে আন্দো’লন শুরু করার কথা ভাবছে। বিএনপির এক নে’তা বলেছেন, তাঁর দলের নে’তাকর্মীদের হ’তাশা এখন কে’টে যাচ্ছে। তাঁরা আন্দোল’নমুখী হয়েছেন।*

*দুটি খবরই আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন দল। তাদের জাতীয় কাউ’ন্সিলে নতুন মুখ আসছে এবং তারা সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেবে—এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা উপমহাদেশের জন্যই সুখবর। কারণ ভারতের কংগ্রে’সের মতো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ প্রাচীন ও অসাম্প্র’দায়িক রাজনৈতিক দল। তারা শক্তিশালী হলে গোটা উপমহাদেশেই তার শুভ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।*

*এক ভারতীয় সাংবাদিকই তাঁর কলামে লিখেছেন, ‘ভারতের কংগ্রে’স এখন প্রায় পতিত বৃক্ষ। দেশটাকে গ্রা’স করেছে ভয়ং’কর হিন্দুত্ববাদ। বাংলাদেশেও পাল্টা ইসলামী জ’ঙ্গিবাদ প্রায় দেশটাকে গ্রা’স করতে চলেছিল। তা রু’খে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ দলটিতেও নানা আ’গাছা জন্মেছে। এই আ’গাছা উ’পড়ে ফেলে দলটি যদি শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নে’তৃত্বে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী হয়, তার প্র’ভাব বর্তা’বে সারা উপমহাদেশে। ভারতের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক মানুষও তাই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সাফল্যের দিকে চেয়ে আছে।’*

*আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহে কমি’উনিস্ট পা’র্টি বা জামা’য়াতের মতো কোনো কঠোর নি’য়ম-শৃঙ্খ’লা নেই। দলটি ব্রড’চার্চের মতো। তার নীতিমালায় সম্মতি আছে জানিয়ে যে কেউ দলটির সদস্য এবং কর্মকর্তাও হতে পারে। এর ফলে দলটির দরজা সবার জন্য খোলা। এই খোলা দরজা দিয়ে ভালো-মন্দ সব লোকই দলটিতে ঢুকেছে। দলটি একাদিক্রমে তিন টার্ম ক্ষ’মতায় রয়েছে। তাতে সুবিধাবাদীদের এই দলে ঢোকার আগ্রহ আরো বেশি এবং তারা ঢুকেছে। তাদের কর্মকাণ্ডের জন্যই দলটির এত দুর্না’ম।*

*এই দুর্না’ম থেকে দলটিকে রাতারাতি মুক্ত করার সুযোগ শেখ হাসিনার সামনে ছিল না। দলের নেতৃ’ত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কখনো ড. কামাল হোসেন, কখনো আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ স্বদলের ক্ষম’তালোভী নে’তাদের বিরু’দ্ধে লড়’তে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর ঘাত’কদের বিচার ও দণ্ড’দানের কাজে বিএনপির বাধাদান ও চক্রান্তের বি’রুদ্ধে লড়তে হয়েছে। সবচেয়ে জটি’ল একাত্তরের ঘা’তক ও দা’লালদের বিচার ও শাস্তিদানের কাজে শেখ হাসিনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রা’ন্তের বি’রুদ্ধে ল’ড়াই চালাতে হয়েছে দীর্ঘকাল। এই ল’ড়াই চালাতে গিয়ে তাঁর জীবন বি’পন্ন হয়েছে বারবার। এমনকি তাঁকে জীবনের ওপর গ্রে’নেড হাম’লার মতো ভয়া’বহ হাম’লার মোকা’বেলা করতে হয়েছে।*

*বিএনপি-জামায়াত বিরো’ধী দলে অবস্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের গণতান্ত্রিক বিরো’ধিতা করেনি। করেছে হ’ত্যা ও সন্ত্রা’স দ্বারা শত্রু’তার রাজনীতি। এ সময় বিএনপির একমাত্র স্লো’গান ছিল—‘পঁচাত্তরের হা’তিয়ার/গ’র্জে উ’ঠুক আরেকবার।’ ‘শেখ হাসিনা তোমারে/বাপের মতো পাঠাব য’মের দু’য়ারে।’ শুধু হিংসা’ত্মক স্লো’গান দেওয়া নয়, মাসের পর মাস সরকার উ’ত্খাতের লক্ষ্যে রাজপথে বা’স, ল’রিতে বো’মাবাজি করে, আ’গুনে জীবিত মানুষ পু’ড়িয়ে মে’রে তারা উদ্দেশ্য সি’দ্ধি করতে চেয়েছে। আফগানিস্তান থেকে পলাতক সন্ত্রা’সীরা পাকিস্তানের সাহায্যে বাংলাদেশে এলে তাদের ধ্বং’সাত্মক কাজে লাগিয়ে বিএনপি-জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশের যে সর্ব’নাশ করতে চেয়েছিল, হাসিনা জীবন বাজি রেখে তা ব্য’র্থ করেছেন। দীর্ঘকাল ল’ড়তে হয়েছে এ জন্য।*

*সবচেয়ে বড় যু’দ্ধ তাঁকে করতে হয়েছে একাত্তরের যু’দ্ধাপরাধী ও মানবতার শত্রুদের শা’স্তি দেওয়ার কাজে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচণ্ড বিরো’ধিতা, মি’থ্যা প্রপা’গান্ডার বি’রুদ্ধে যে শ্রম ও সময় শেখ হাসিনাকে ব্যয় করতে হয়েছে, বছরের পর বছর যে ধৈ’র্যের পরিচয় তাঁকে দিতে হয়েছে, তার কোনো তুলনা নেই। তার ওপর সা’ইক্লোন, বন্যা, খরা ও ম’ঙ্গার সঙ্গেও তাঁকে যু’দ্ধ করতে হয়েছে। তাঁর আমলেই খাদ্যঘাটতির দেশ হয়েছে উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশ। ঢাকা হয়েছে উড়াল সেতুর শহর। বিশ্বব্যাং’কের প্রচণ্ড অসহযোগিতা সত্ত্বেও সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ।*

*পাকিস্তানের টেলি’ভিশনে সম্প্রতি এক ট’ক শো’তে এক পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘পাকিস্তান যদি শেখ হাসিনার মতো একজন প্রধানমন্ত্রী পেত, তাহলে বহু আগে দেশটির অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।’ কলকাতার একটি দৈনিকে এক কলামিস্ট লিখেছেন (লেখাটি আমার হাতের কাছে নেই), একটি দারিদ্র্যক্লিষ্ট অনুন্নত দেশকে কিভাবে ধীর ও মন্থরগতির গণতন্ত্র দ্বারা দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করা যায়, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।*

*শেখ হাসিনা তিন মেয়াদে ক্ষম’তায় আছেন বটে; কিন্তু তা ক্ষু’ধা, দা’রিদ্র্য, অশি’ক্ষা, রো’গ, কুসং’স্কার, ধর্মান্ধ’তা, বন্যা, খরা, সাই’ক্লোন থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য যথেষ্ট সময় নয়। উন্নয়নের কাজে তাঁর দরকার ছিল গঠনমূলক সমা’লোচনার সঙ্গে বিরো’ধীদের সহযোগিতা। এই সহযোগিতার বদলে তিনি বি’রোধিতা পেলেও ক্ষতি ছিল না। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে পেয়েছেন শত্রু’তা। এই শত্রু’তায় হাত মিলিয়েছে দেশের সুধীসমাজ নামধারী আঁতেল শ্রেণি এবং তাদের পো’ষা একটি মিডি’য়া গ্রু’পও।*

*যে বিরো’ধিতা, শত্রু’তা, মি’থ্যা প্রচার ও প্র’পাগান্ডার ব্যূ’হ ভে’দ করে, একে একে শক্তিশালী শ’ত্রু দম’ন করে শেখ হাসিনাকে দেশ পরিচালনা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে, তা সম্ভবত রামায়ণের রাবণ বধের কাহি’নিকে হার মানায়। শেখ হাসিনার মনস্তুষ্টি বা মোসাহেবির জন্য লিখছি না। এ কথাগুলো লিখছি নিজের বিস্ম’য়াপ্লুত মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য। আওয়ামী লীগের কোনো দোষ’ত্রুটি নেই, এ কথা বলছি না। আওয়ামী লীগের অনেক দোষ’ত্রুটি আছে। দুর্নী’তি, অপশা’সন আছে। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে মহা মহীরুহের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ হাসিনা। গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় তাঁর নে’তৃত্ব ও ব্যক্তি’ত্বের ছায়া পড়েছে। আওয়ামী লীগকে এ কথা বুঝতে হবে। শেখ হাসিনার ক্যারিস’মেটিক নে’তৃত্বের ছায়া আওয়ামী লীগের মাথার ওপর ছাতার মতো আছে। নইলে গোত্র দ্ব’ন্দ্ব, লো’ভ, দুর্নী’তিতে ভরপুর আওয়ামী লীগের বর্তমানে যে অবস্থা, তাতে তাকেও বিএনপির মতো রাজনৈতিক অগস্ত্য যাত্রায় যেতে হতো।*

*দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলন সামনে নিয়ে আওয়ামী লীগের আত্মশোধ’নের এটাই শেষ সুযোগ ও সময়। হাসিনা তিন টা’র্ম ক্ষ’মতায় থেকে প্রায় গোটা সময়টাই সন্ত্রা’স ও স্বাধীনতার শ’ত্রুদের বি’রুদ্ধে যু’দ্ধে কাটিয়েছেন। তার বিবরণ ওপরে দিয়েছি। এত দিনে তিনি দুর্নী’তির মতো পরম শ’ত্রু নিধনে মনোযোগ দিতে পেরেছেন, সময় দিতে পেরেছেন। স্বাধীনতার শ’ত্রুদের মতো দলের ভেতরের-বাইরের দুর্নী’তিবাজদের বি’রুদ্ধে যু’দ্ধেও তিনি কঠো’র ও আপস’হীন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের বি’রুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণে দ’য়াদাক্ষিণ্য দেখাননি।*

*এই শু’দ্ধি অভি’যান আই’ওয়াশ নয়। কেউ কেউ বলছেন, এই অভি’যানে বড় বড় রা’ঘব বোয়া’লকে এখনো ধরা হয়নি। তাদের বলি, তি’ষ্ঠ ক্ষ’ণকাল। বাংলাদেশে জিয়া-এরশাদ-খালেদার কৃ’পায় কা’য়েমি স্বা’র্থের যে ঘাঁটি গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি অত্যন্ত শক্ত। রাতা’রাতি ভা’ঙা যাবে না। রাতা’রাতি ভা’ঙতে গেলে যিনি ভা’ঙতে যাবেন, তাঁকেই নি’কেশ হতে হবে। ইতিহাস তা-ই বলে। হাসিনা কুশ’লী যো’দ্ধা। কী করে দু-পা এগোনোর জন্য এক পা পেছাতে হয়, সে কৌ’শল তিনি জানেন। একাত্তরের যুদ্ধা’পরাধীদের বিচার ও শা’স্তিদানের জন্য তিনি কি ধীরগতির কৌশ’ল গ্রহণ করে জয়ী হননি। দুর্নী’তির বি’রুদ্ধে যু’দ্ধেও তাঁর কৌশ’ল হবে ধীরগতির; কিন্তু অব্যর্থ লক্ষ্যে পৌঁছার।*

*শেখ হাসিনার এই শু’দ্ধি অভি’যান সফল করার জন্য তাঁর পেছনে একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী এবং দুর্নীতির ক’লঙ্কমুক্ত আওয়ামী লীগের অবস্থান দরকার। এবারের ২১তম জাতীয় কাউন্সি’লের সম্মে’লনে সেই আওয়ামী লীগ গড়ার পদক্ষেপ নিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি অ’থর্ব, অক’র্মণ্য, লো’ভী, দুর্নী’তিবাজ এবং ক্ষ’মতার অপব্য’বহারকারীদের তা’ড়িয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনেক নতুন মুখ আনতে চান। খবরে সে কথাই বলা হয়েছে। সম্ভাব্য নতুন মুখের মধ্যে আমার পরিচিত বেশ কয়েকজনের নাম দেখে খুশি হয়েছি। এঁদের মতো লোক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এলে শেখ হাসিনা দলটাকে নতুনভাবে সাজাতে পারবেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অসাম্প্র’দায়িকতার শক্তি বৃদ্ধি করতে হলে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের শক্তি বৃদ্ধির জন্য সংগঠনটির পুনর্গঠন প্রয়োজন।*

*তাই বলে দল পুনর্গঠনের নামে পুরনো সব নে’তাকে সরিয়ে দিয়ে শুধু নতুন মুখ আনলে দলে অভিজ্ঞ ও কুশ’লী রাজনীতির অন’টন দেখা দেবে। আওয়ামী লীগকে উপদেশ দেওয়ার অধিকার আমার নেই। তবু বলছি, কেন্দ্রীয় ক’মিটিতে নতুন মুখ নেওয়ার ব্যাপারেও দেখতে হবে তাঁরা সৎ ও নীতিপরায়ণ চরিত্রের অধিকারী কি না। পুরনোদেরও রাখার ব্যাপারে ক্রা’ইটেরিয়া হওয়া উচিত, তাঁরা এত দিন সৎ রাজনীতি করেছেন এবং নিজের চরিত্র অবি’তর্কিত রেখেছেন কি না। ফেরে’শতা খোঁজার দরকার নেই। তাহলে ঠ’গ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। দেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নে’তৃত্ব এখন সবচেয়ে বড় মূলধন। এই মূলধন রক্ষা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগের যে আত্ম’শোধনের প্রয়োজন, এবারের জাতীয় কা’উন্সিলের পর দলটি সে পথেই পদক্ষেপ নেবে বলে আমার আশা।*

*বিএনপি তাদের নে’ত্রী খালেদা জিয়ার মু’ক্তির জন্য আ’ইনি ল’ড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের আ’ন্দোলনে নামার কথা ভাবছে। আই’নি ল’ড়াই তারা অবশ্যই চালাতে পারবে। কারণ তাদের অর্থের জোর আছে। কিন্তু রাজপথে আন্দোল’ন চালাতে গেলে জনসমর্থনের জোর থাকা দরকার। সেটা তাদের আছে কি না তা সম্ভবত আগে যাচাই করে নেওয়া দরকার। নইলে আগের মতো ফিয়া’সকো হতে পারে। আন্দো’লনের নামে স’ন্ত্রাস চালানোর শক্তিও এখন তাদের নেই। হু’মকি আর শক্তি’ প্রদর্শ’নের মধ্যে পার্থক্য অনেক।*
*লেখক: আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। লন্ডন, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯।*