প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *ধ’র্ষণ কেউ যৌ’ন-ক্ষুধা মে’টানোর জন্য করে না*

*ধ’র্ষণ কেউ যৌ’ন-ক্ষুধা মে’টানোর জন্য করে না*

তসলিমা নাসরিন

353
*ধর্ষণ কেউ যৌন-ক্ষুধা মেটানোর জন্য করে না*

*ভারতের হায়দারাবাদে প্রিয়াংকা রেড্ডি নামের এক পশুর ডা’ক্তারকে গণ’ধর্ষণ করার পর পু’ড়িয়ে মে’রে ফেলেছে কিছু লোক। গ্রেফতার করা হয়েছে চার চারটে ধর্ষ’ককে। ধর্ষ’কদের শা’স্তি দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ফাঁ’সিও দেওয়া হচ্ছে, তার পরও কিন্তু ধ’র্ষণ মোটেও কমছে না। ধর্ষ’কেরা ফাঁ’সিকে ভ’য় পায় কে বলেছে? অপরা’ধীরা অপ’রাধ করার সময় এ কথাটা গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে তারা ধরা পড়বে না। হায়দারাবাদের ধর্ষ’করাও তা মনে করেছে। তাই পু’ড়িয়ে এমনভাবে ছা’ই করে ফেলেছে প্রিয়াংকাকে, যেন কেউ তাকে চিনতে না পারে। তাকে চিনতে না পারলেই, তাদের বিশ্বাস, তারা দিব্যি বেঁচে যাবে। প্রশ্ন হলো, কেন তারা মনে করে তারা ধরা পড়বে না! মনে করে, কারণ এমন ঘট’না অহরহই ঘ’টে যে অপরা’ধীরা ধরা পড়ে না। জনতার ভিড়ে অপ’রাধীরা মিশে যায়। প্রমাণ ছা’ই করে দিয়ে অর্থাৎ নি’শ্চিহ্ন করে দিয়ে হায়দারাবাদের ধর্ষ’করাও দিব্যি বেঁ’চে থাকতে চেয়েছিল।*

*দিল্লির বাসে গণধ’র্ষণের ঘটনা শুধু ভারতবর্ষেরই নয়, পৃথিবীর বহু দেশের মানুষকে কাঁ’পিয়েছে। ধর্ষ’কদের ফাঁ’সি হলো, কিন্তু ধর্ষ’ণের সংখ্যা সমাজে সংসারে মোটেও কমেনি। মানুষ আর কত রাস্তায় নামবে প্ল্যা’কার্ড পোস্টা’র হাতে, কতদিন আর চি’ৎকার করবে, চি’ৎকার করবে এবং যথারীতি কেউ শুনবে না। যুক্তরা’জ্য আর যুক্ত’রাষ্ট্র তাদের নাগরিক, যারা ভারত ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক, তাদের বিশেষ করে মেয়েদের সাবধান করে দিয়েছে যে ভারতে ধর্ষ’ণ, খু’ন প্রচন্ড বেড়েছে, পর্যট’ক মেয়েদেরও ছাড় দিচ্ছে না, সুতরাং ভারত ভ্রমণ থেকে বিরত থাকাই ভালো।*

*কয়েকজনকে আমি গত দুদিন বলতে শুনেছি, ‘কী পোশাক পরেছিল প্রিয়াংকা সেদিন?’ মনে হলো প্রিয়াংকার পোশাক দেখেই তারা বুঝে নেবে প্রিয়াংকা নিজে ধর্ষ’ণকে ডেকে এনেছে কিনা। অর্থাৎ প্রিয়াংকাই দায়ী কিনা তার ধ’র্ষণ আর মৃ’ত্যুর জন্য। গবেষ’করা এত যে বলছেন, পোশাক কোনও কারণ নয় ধর্ষ’ণের। তারপরও কারও বোধোদয় হয় না। এত যে বলা হচ্ছে ধ’র্ষণ কোনও যৌ’নসংগম নয়, এটি বর্বর’তা, এটি বীভৎ’স নারী নি’র্যাতন… তারপরও মানুষ এটিকে যৌন’সংগমই ভেবে নেয়। কয়েকজনকে এও বলতে শুনেছি পুরুষেরা যেন গণি’কালয়ে গিয়ে যৌ’নক্ষুধা মেটায়, যেন ‘ভদ্র মেয়েদের’ রেহাই দেয়। আসলে গণি’কালয়ে যারা যায়, তারা গণিকা’লয়ের মেয়েদের যৌন’দাসী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখে যায়, জেনে যায় এটি আই’নত বৈধ। তারা কিন্তু সমাজের সব মেয়েকেই চেতনে-অবচেতনে যৌন’বস্তু বা যৌন’দাসী বলেই ভাবতে শুরু করে।*

*তনুর কথা মনে আছে? তনু নামের একটি উনিশ বছরের মেয়েকে কুমিল্লায় গণধ’র্ষণের পর হ’ত্যা করা হয়েছিল। তনুর হি’জাব তনুকে ধ’র্ষণ থেকে বা খু’ন হওয়া থেকে বাঁ’চাতে পারেনি। পুরুষ যখন মেয়েদের নির্যা’তন করে, তারা মেয়েদের পোশাক দেখে করে না। তারা মনে করে নির্যা’তন করার অধিকার তাদের আছে, সে কারণেই করে নির্যা’তন। যদি শৈশব থেকে মানুষকে শিক্ষিত করা হয় মেয়েরা মানুষ, মেয়েরা যৌ’নবস্তু নয়, তাহলে দেখা যায় সেই সমাজে মেয়েদের উল’ঙ্গ অবস্থায় দেখলেও পুরুষ মনে করে না, তাদের কোনও রকম অশা’লীন মন্তব্য করার বা তাদের স্পর্শ করার অধিকার কোনও পুরুষের আছে। অস’ভ্য সমাজে পুরুষেরা, নারী যে পোশাকই পরুক না কেন, নারীকে যৌ’ন হেন’স্তা করে। সভ্য সমাজে পুরুষরা, নারী যে পোশাকই পরুক না কেন, নারীকে যৌ’ন হেন’স্তা করে না।*

*শোনা যায়, নিরাপত্তা বাহি’নীর লোকেরা তনুকে ধ’র্ষণ করেছিল। রক্ষকরা কী যে অনায়াসে ভক্ষক বনে যেতে পারে! মেয়েদের জন্য সম্ভবত ‘নিরাপত্তা’ এখন আর অধিকার নয়, নেহাতই লা’ক্সারি। আজকাল যারা ধ’র্ষণ করে তারা ধর্ষ’ণ করাটা অন্যায় জেনেই ধ’র্ষণ করে। মানুষ যত সভ্য হয়েছে, ধর্ষ’ণের সংজ্ঞা তত পাল্টেছে। এক সময় ধর্ষ’ণকে কোনও অপরা’ধই বলে মনে করা হতো না। বাংলাদেশের মতোই অবস্থা ভারতে।*

*‘১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে এক পাল পুরুষ বী’ভৎসভাবে ধর্ষ’ণ করতে করতে মে’রে ফেলেছে’। বা প্রিয়াংকা রেড্ডিকে ধ’র্ষণ করার পর পু’ড়িয়ে দেওয়া হয়েছে… এই খবরগুলো ভারতের নানা বয়সের, নানা শ্রেণির, নানা ধর্মের, নানা জাতের, নানা লিংগের লোকেরা জানার পর বেশির ভাগই বলেছে ধ’র্ষকদের ফাঁ’সিতে ঝো’লাও, পি’টিয়ে মে’রে ফেলো, পুরু’ষাঙ্গ কে’টে ফেলো। কেউ কেউ বলেছে ‘পুরুষদেরও তো মেয়েরা ধর্ষ’ণ করে, তার বেলা?’ বা ‘মেয়েটা নিশ্চয়ই পুরুষদের প্রভো’ক করার জন্য গায়ে কিছু পরেছিল বা কিছু মেখেছিল’। এদের কাছে ধর্ষ’ণের সমাধান মূলত দুটো, …মে’রে ফেলো বা কে’টে ফেলো। এ দুটো শা’স্তি ধর্ষ’কদের দিলেই নাকি ধর্ষ’ণের ইতি ঘটে। ইতি তো ঘটেইনি, বরং আকাশ ছুঁয়েছে। ধর্ষ’ক ধনঞ্জয়ের ফাঁ’সি হওয়ার পর পর পশ্চিমবঙ্গে ধ’র্ষণ বেড়ে গিয়েছিল।*

*যে সব দেশে ধর্ষ’ণ সবচেয়ে কম ঘটে, সে সব দেশে পুরু’ষাঙ্গ কর্তন বা মৃত্যু’দন্ডের শা’স্তি নেই। তবে সে সব দেশে মেয়েদের মর্যাদা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। মেয়েদের স্বাধীনতা এবং অধিকার সে সব দেশে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি, সে সব দেশে মেয়েরা শিক্ষিত, মেয়েরা স্বনির্ভর, সংরক্ষিত আসনের সুযোগ ছাড়াই সংসদ সদস্যের পঞ্চাশ ভাগই মেয়ে।*
*ধর্ষ’ণই বহাল তবি’য়তে চলে সে সব দেশে, যে সব দেশের বেশির ভাগ পুরুষ মেয়েদের ভোগের বস্তু, দা’সি-বাঁ’দী, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, বুদ্ধি’শুদ্ধিহীন প্রাণী, নীচু জাতের জীব, যৌ’নবস্তু ইত্যাদি হিসেবে বিচার করে; যে সব দেশে গণি’কালয় গিজগিজ করছে, শত শত বাচ্চা-মেয়েকে যৌ’নপাচারের শি’কার করা হচ্ছে; যৌ’ন হেন’স্তা, ধ’র্ষণ, স্বামীর অত্যা’চার, পণের অত্যা’চার, পণ অনাদায়ে খু’ন… এই দুর্ঘট’নাগুলো প্রতিদিন ঘট’ছে, ঘ’টেই চলছে।*

*ধর্ষ’ণ আর যা কিছুই হোক, যৌ’নসংগম নয়। ধর্ষ’ণ কেউ যৌ’ন-ক্ষুধা মে’টানোর জন্য করে না। প্রায় সব ধর্ষ’কেরই স্থায়ী যৌ’নসঙ্গী আছে। ধ’র্ষণ নিতান্তই পেশির জো’র, পুরুষের জো’র। মোদ্দা কথা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পরম পুজনীয় পুরুষ য’ন্ত্রের ন্যাড়া মাথায় মুকুট পরানো বা বিজয় নিশান ওড়ানোর আরেক নাম ধ’র্ষণ।*
*ধ’র্ষণ বন্ধ হবে কবে অথবা কী করলে ধর্ষ’ণ ব’ন্ধ হবে? এই প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর, ‘যে দিন পুরুষ ধর্ষ’ণ করা ব’ন্ধ করবে, সে দিনই ব’ন্ধ হবে ধর্ষ’ণ’। কবে কখন ব’ন্ধ করবে, সে সম্পূর্ণই পুরুষের ব্যাপার। সম্মিলি’তভাবে সিদ্ধান্ত নিক যে এই দিন থেকে বা এই সপ্তাহ থেকে বা এই মাস থেকে বা এই বছর থেকে নিজের প্রজাতির ওপর ভ’য়াবহ বীভ’ৎস এসব নির্যা’তন তারা আর করবে না।*

*ধ’র্ষণ বন্ধ করার পথে এগোতে হলে কী কী করতে হবে! রাস্তাঘাটে অফি’সে-আ’দালতে দোকানপাটে মেয়েদের যৌ’ন হয়রানি ব’ন্ধ করতে হবে, বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা, জাতপাত বন্ধ করতে হবে, মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে, স্বনির্ভর করতে হবে। ইস্কু’লের শুরু থেকেই নারী-পুরুষের সমানাধিকারের শিক্ষা সব শিশুকে দিতে হবে। শিশুরা ভালো শিক্ষা আর ভালো পরিবেশ পেলে মানুষ ভালো হয়। ধর্ষ’কদের জীবন-কাহিনী ঘাঁ’টলে দেখা যায় বেশির ভাগেরই বিচ্ছিরি একটা শৈশব ছিল, ভালো শিক্ষাদীক্ষা বলতে কিছুই ছিল না, মা’রামারি দেখতে দেখতে, ঘৃ’ণা দেখতে দেখতে, পৌরুষিক পাষ’ন্ডতা দেখতে দেখতে বড় হয়েছে। এগুলোই শিখেছে। শেখা সহজ, না-শেখা সহজ নয়। শিখে ফেলা তন্ত্র-মন্ত্র-পুরুষতন্ত্র আর নারী’বিরোধী-কুসংস্কারগুলো যে করেই হোক ‘না-শেখা’ বা ‘আ’নলার্ন’-এর ট্র্যাশ’ক্যানে ফেলতে হবে।*

*দেশকে ধ’র্ষণমুক্ত করতে গেলে সরকারকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। তার চেয়ে ধ’র্ষককে ফাঁ’সি দেওয়ার মতো সহজ কাজ আর কিছু নেই। জনগণও খুশি হয়। তখনকার মতো সব সমস্যাকে চমৎকার ধামাচাপা দেওয়া যায়। সরকার এভাবেই মানুষকে বোকা বানায়। মানুষ বুদ্ধিমান হয়ে গেলে বেজায় মুশকিল! তখন যে কাজগুলো করলে সমাজের সত্যিকার ভালো হয়, সে কাজগুলোর দা’বি সরাসরি সরকারের কাছে করে বসবে বুদ্ধিমান মানুষেরা। ওদের দা’বি মেনে সমাজকে সবার জন্য নিরাপদ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে ভোট জোটানোর মত’লব আঁ’টবে কে? একে ল্যাং মা’রা, ওকে দেশছাড়া করা, গণ্ডা’ গ’ণ্ডা গণ্ডা পোষা আর যুগের পর যুগ গদিতে বসে থাকার ফ’ন্দি আঁ’টার সময় কোথায় তখন সরকারের?*
*তসলিমা নাসরিন: নির্বাসিত লেখিকা।*