প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *বিএনপির ফু’টো নৌকা থেকে ইঁদুরেরা নদীতে ঝাঁ’প দিচ্ছেন?*

*বিএনপির ফু’টো নৌকা থেকে ইঁদুরেরা নদীতে ঝাঁ’প দিচ্ছেন?*

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

121
*বিএনপির ফুটো নৌকা থেকে ইঁদুরেরা নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছেন?*

*বিশ্বে একটি প্রবচন প্রচলিত আছে। নৌকা যখন ডো’বে, তা সবার আগে টের পায় ইঁদুর। ইঁদুর যখন নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁ’পিয়ে প’ড়ে, তখন মাঝি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে নৌ’কা ডুবছে। এই নজিরটি টেনে ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘আপনারা জেনে রাখুন, পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ চিরদিনের জন্য ডু’বছে। দেখছেন, মুসলিম লীগ থেকে ইঁদুররা কিভাবে দল ছাড়ছে।’ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের চ’রম প’রাজয়ের পর দল থেকে অনেক ছোট-বড় নে’তার পদ’ত্যাগের হি’ড়িক পড়ে গিয়েছিল। তা দেখে মওলানা ভাসানী এ কথা বলেছিলেন।*

*বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশে একই দৃশ্যের অবতারণা হচ্ছে। মিডিয়ায় বিএনপির অনেক তৃণমূল নে’তাকর্মী দল ছাড়ছেন—এই খবর প’ড়েছি। কিন্তু দলের পালের গোদাদের মধ্যেও ভা’ঙন দেখা দিয়েছে, তা জানতাম না। মওলানা ভাসানী আজ বেঁ’চে থাকলে হয়তো বলতেন, ‘বিএনপির জাহাজ ফু’টো হয়েছে। তাই ইঁদুররা আগে লা’ফিয়ে বে’র হয়ে আসছে।’ মওলানা সাহেবের মতো কোনো দলের নেতাদের ইঁদুর বলার ধৃষ্ট’তা আমার নেই। তাতে বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপির তরি ডু’বছে।*

*বিএনপির দুজন শীর্ষ নেতা দল থেকে পদ’ত্যাগ করেছেন বহু আগেই। এই খবর চেপে রাখা হয়েছিল। এখন লুকানো খবর জানাজানি হতেই বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এঁদের বয়স হয়েছে, দলের কাজে আর সক্রিয় ভূমি’কা রাখতে পারছেন না। এ জন্য তাঁরা দ’ল ছেড়েছেন।*
*বিএনপি শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চেয়েছিল, পারেনি। সত্যের বাজনা আপনি বাজে। বৃদ্ধ হয়ে কোনো নে’তা দলের কাজ করতে না পারলে তিনি ঘো’ষণা দিয়ে রাজনীতি ছা’ড়েন। দল ছাড়ার কথা বলেন না। এখানে বিএনপির দুই নেতা মোরশেদ খান এবং লেফটে’ন্যান্ট জে’নারেল মাহবুবুর রহমান (অব.) দুজনেই দলের বর্তমান অবস্থা দেখে পদ’ত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। দল সেই পদ’ত্যাগের কথা চে’পে রাখতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চে’পে রাখা যায়নি।*

*পদত্যা’গকারী দুজন নেতার একজন লে. জে. মাহবুবুর রহমান (অব.) ঢাকার একটি কাগজকে জানিয়েছেন, দলের নে’তার সঙ্গে মতা’নৈক্যের জন্য তিনি দল ছে’ড়েছেন। দুই মাস আগে তিনি পদ’ত্যাগ করেন। বিএনপি তা চে’পে রেখেছিল। সেপ্টেম্বর মাসে দলের ভা’রপ্রাপ্ত নে’তা তারেক রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই মতা’নৈক্যের জন্ম। ওই সেপ্টেম্বর মাসে তারেক রহমান লন্ডনে দলীয় সভায় বলেন, ‘তাঁর পিতা জেনারেল জিয়াউর রহমান হচ্ছেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পিতা।’*

*মাহবুবুর রহমান এই বক্তব্যের প্রতি’বাদ করেন। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশে জাতির একজন পিতার আসনে বসানোর চে’ষ্টা করা ঠিক নয়। ইতিহাস বি’কৃত করে তারেক নিজের বাবাকে জাতির পিতা বানানোর অ’পচেষ্টা করছেন। তাতে বিত’র্ক সৃ’ষ্টি হচ্ছে এবং জাতিকে একটি ভ’য়ংকর সংঘা’তের দিকে ঠে’লে দেওয়ার চে’ষ্টা হচ্ছে।’*

*সেনা’বাহিনীর এই সাবেক প্রধান (পরে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন) তাঁর বক্তব্যে স্বীকার করেছেন, বঙ্গবন্ধুকে তিনি জাতির পিতা মনে করেন। এটা শুধু মাহবুবুর রহমান নন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন অনেক নেতাই স্বীকার করেন। কিন্তু তারেক রহমানের ভ’য়ে মুখ ফুটে কথাটা বলতে পারেননি। মাহবুবুর রহমান এখন প্যান’ডোরা বা’ক্সের ডালা খু’লে দিলেন। তাঁর পদাঙ্ক আরো অনেক নে’তা অনুসরণ করবেন।*

*বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রে’টারি জেনা’রেল, এখন বিকল্পধারার নেতা ড. বি. চৌধুরীও মুখে যা-ই বলুন, মনে মনে বঙ্গবন্ধু যে জাতির পিতা এই সত্যটি মানেন। তাই বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হয়েই তিনি জিয়াউর রহমানের কবর নয়, জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটেছিলেন এবং তারেক রহমানের বিরা’গভাজন হয়েছিলেন। তারেক তাঁকে অসম্মান করে রাষ্ট্রপতির প’দ থেকে তা’ড়িয়েছিলেন।*

*তারেক রহমান বিএনপির নে’তৃত্বে বসে যু’দ্ধাপরাধী জামায়াতিদের কোলে না নেওয়া পর্যন্ত বিএনপিতে মুক্তি’যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং মুক্তি’যুদ্ধের সমর্থক বহু নে’তাকর্মী ছিলেন। তারেক যাঁদের দলে নি’ষ্ক্রিয় হতে বা’ধ্য করেন অথবা দল থেকে তা’ড়িয়ে দেন। আমার মনে পড়ে, বিএনপির শাসনামলে লন্ডনে নিযু’ক্ত বাংলাদেশের হাইক’মিশনার ডাক্তার ইউসুফ ছিলেন বিএনপিদলীয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন।*

*তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব জাতির পিতা—এই জ্বলন্ত সত্যটিকে অস্বী’কার করে বিএনপি দেশে রাজনীতি করতে চায়, এটা কী করে সম্ভব? কিছুদিন এভাবে চলতে পারে? আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার মতো লোক কী করে বিএনপিতে এলেন? তিনি বলেছেন, ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব খুব গভীর। তাঁর অনুরোধ এড়াতে পারিনি।*

*বিএনপি আসলে একটি এক আদর্শে বিশ্বাসী দল নয়। জিয়াউর রহমান ক্ষ’মতার লো’ভ দেখিয়ে কিছু ক্ষমতা’লোভী লোককে নিয়ে দল গঠন করেন। তখন কিছু ভালো লোকও ছিলেন। তারেক রহমান তাঁদের দল থেকে তাড়ি’য়েছেন। তবু দলটির ভেতরে বঙ্গবন্ধুকে শ্র’দ্ধা করেন। মুক্তি’যুদ্ধের চেতনার প্রতি টান রয়েছে এমন নেতা ও কর্মী এখনো রয়ে গেছেন। বিএনপি ক্ষম’তা থেকে উচ্ছেদ হতেই দুই ধরনের লোক দল ছে’ড়েছেন। একদল (এঁদের সংখ্যাই বেশি) যাঁরা ক্ষ’মতার লো’ভে এসেছিলেন। আরেক দল যাঁরা সংখ্যায় কম, কিন্তু বিএনপিকে একটি প্রকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখতে চেয়ে ব্য’র্থ হয়েছেন। তাঁরা চোখের সামনে এখন বিএনপিকে চরি’ত্রভ্রষ্ট অবস্থায় ডুব’তে দেখে ব্য’থা পাচ্ছেন এবং দল ছা’ড়ছেন। এঁদের মধ্যে মাহবুবুর রহমান, মোরশেদ খানকে গণ্য করা চলে।*

*বিএনপি আদর্শভিত্তিক দল নয়, ক্ষ’মতাভিত্তিক দল। দীর্ঘদিন ক্ষম’তায় থাকতে না পারায় তাতে বড় ধরনের ভা’ঙন ধরেছে। আমি নি’র্দ্বিধায় বলতে পারি, বিএনপি আগামী নির্বাচনেও যদি ক্ষম’তায় যেতে না পারে, তাহলে পাকিস্তানে ক্ষ’মতা থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পরপরই কন’ভেনশন মুসলিম লীগ যেমন অস্তি’ত্ব হারি’য়েছিল, বিএনপিও তেমনি অস্তি’ত্ব হারাবে। শুনছি, ব্যা’রিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর জীবনের শেষ খেলা দেখাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। অর্থাৎ খালেদা জিয়ার শিগগিরই মু’ক্তিলাভের সম্ভাবনা না থাকলে তিনি বিএনপির একটি বিদ্রো’হী অংশকে নিয়ে দলছুট বিএনপি গঠন করবেন। এই গু’জব কতটা সঠিক, জানি না। তবে মওদুদ আহমদকে যতটা জানি, তাতে তাঁর দ্বারা যেকোনো কাজ সম্ভব। চট্টগ্রাম অথবা কুমিল্লা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে একসময় মওদুদ গাড়ি দুর্ঘট’নায় আ’হত হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া সারারাত তাঁর শয্যাপাশে জেগে তাঁর সেবা করেছেন। ঢাকায় ফিরেই মওদুদ বিএনপি ছেড়ে এরশাদের জাতীয় পা’র্টিতে ঢু’কে মন্ত্রী হয়েছিলেন।*

*বস্তুত বিএনপির জন্ম কোনো আদর্শকে ভিত্তি করে নয়। জিয়াউর রহমান এককালে পাকিস্তান ইনটে’লিজেন্স সার্ভি’সের জুনি’য়র অফি’সার ছিলেন। বাংলাদেশে বন্দু’কের জো’রে ক্ষম’তা দখ’ল করেই তিনি পাকিস্তানের এই গো’য়েন্দা সং’স্থার সাহায্যে বিশেষ উদ্দেশ্যে দল গঠন করেন। এই বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল—এক. বাংলাদেশে আই’য়ুবের কায়’দায় গণতন্ত্রের ছদ্মা’বরণে স্বৈরা’চারী ফ্যা’সিস্ট শা’সন কায়ে’ম করা। দুই. নিজে মুক্তিযো’দ্ধা হয়ে মুক্তি’যুদ্ধের আদর্শ ধ্বং’স করা। তিন. বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হ’ত্যা করে বাংলাদেশে জাতীয় রাজনৈতিক নে’তৃত্ব ধ্বং’স করা। চার. বঙ্গবন্ধুর অসা’ম্প্রদায়িক সমাজ’তন্ত্রী ধাঁ’চের রাষ্ট্র’ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে ধ্বং’স করে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করা।*

*বিএনপিকে এই ভৌ’তিক রাজনীতির কবল থেকে মু’ক্ত করে কেউ যদি সুনির্দিষ্ট আদর্শ’ভিত্তিক (হোক তা রক্ষ’ণশীল ডানপন্থী ক’র্মসূচি) রাজনৈ’তিক দলে রূপা’ন্তরিত করতে পারতেন, তারেকের কবল থেকে মু’ক্ত করতে পারতেন, তাহলে বিএনপি আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হতো। তাঁকে ষড়’যন্ত্রের রাজনীতি করতে হতো না। রাজনীতির অ’ন্ধ গলি’তে ঢু’কে অস্থি’ত্ব হারানোর আ’শঙ্কায় ভু’গতে হতো না।*

*মোরশেদ খান, মাহবুবুর রহমানের মতো নেতারা দ’ল ত্যা’গ করেছেন। সন্দে’হ নেই, আরো অনেকে করবেন। হয়তো করেছেন। কিন্তু বিএনপি তা চে’পে রেখেছে। বিএনপির বেঁ’চে থাকার একমাত্র উপায় নীতি ও নেতৃত্বের বদল। চক্রা’ন্ত ও সন্ত্রা’সের সঙ্গী জামায়াতকে ছেড়ে, তারেকের মতো সিন্দবাদের দৈত্য’কে কাঁধ থেকে তা’ড়িয়ে, মুক্তি’যুদ্ধের আদর্শ’বিরোধী রাজনীতি নয়, প্রকৃত রাজনৈতিক কর্ম’সূচি নিয়ে এবং প্রকৃত রাজনৈতিক ই’স্যু নিয়ে মাঠে নামলে বিএনপি এখনো অ’স্থিত্ব ফিরে পেতে পারে। ইতিহাসের বাস্তব’তা ও সত্যতাকে অস্বী’কার করে রাজনীতি করতে চাইলে বিএনপি বাংলার মাটি’তে অস্তি’ত্ব হারাবে।*
*লন্ডন সোমবার, ১১ নভেম্বর ২০১৯*