প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত *ড. কামাল কি জেনা’রেল আইয়ুব খা’নের অনুসারী?*

*ড. কামাল কি জেনা’রেল আইয়ুব খা’নের অনুসারী?*

আইয়ুবের কৌশল কি এখন গণফোরামের রাজনীতিতে?

256
*ড. কামাল কি জেনারেল আইয়ুব খানের অনুসারী?*

*জেনা’রেল আই’য়ুব খা’ন যদি আজ বেঁ’চে থাকতেন, তাহলে এই ভেবে আনন্দিত হতেন যে তাঁরা বাংলাদেশ হারি’য়েছেন বটে, কিন্তু এখনো সে দেশটিতে তিনি তাঁর রাজনৈতিক কৌ’শলের অনুসা’রী একজনকে দেখতে পাচ্ছেন। মোনেম খাঁ, সবুর খাঁ এঁরা মা’রা গেছেন বটে; তাঁরা ছিলেন তাঁর হু’কুম বর’দার। কিন্তু এখন যাঁর মধ্যে তিনি তাঁর কৌ’শলের অনুসরণ দেখতে পাচ্ছেন, অতীতে তিনি তাঁর রাজনীতির বিরো’ধিতাকারী ছিলেন। এখন কেমন করে তাঁর চে’ঞ্জ অ’ব হা’র্ট হলো এটা তিনি বুঝতে পারছেন না।*

*আইয়ুব আজ বেঁচে থাকলে কেন এমনটা ভাবতেন, তার কারণটা আগে পাঠকদের জানাই। ঢাকার কাগজে খবর দেখলাম, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সিলেট-২ (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) আসনের সং’সদ সদ’স্য, যুক্ত’রাজ্যপ্রবাসী রাজনীতিক ও রেস্টু’রেন্ট ব্যবসায়ী মোকাব্বির খানকে ড. কামাল হোসেন গণফোরা’মের নির্বাহী সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন।*

*জিজ্ঞাসু পাঠক জিজ্ঞাসা করতে পারেন, ড. কামাল হোসেন মোকাব্বির খানকে তাঁর দলের নির্বাহী সভাপতি করায় তাঁর মধ্যে আমি আইয়ুবের পন্থা বা রাজনীতি অনু’সরণের প্রমাণ পেলাম কোথায়? আমি এই প্রশ্নের জবাবে পরে আসছি। আগে মোকাব্বির খানকে অভিনন্দনটা জানাই। মোকাব্বির দীর্ঘকাল ধরে লন্ডনে রেস্টু’রেন্ট ব্যবসায়ী এবং একই সঙ্গে গণফো’রামের রাজনীতিতে জ’ড়িত ছিলেন এবং আছেন।*
*আমার বিলাতে আসা অবধি তাঁর সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো এবং একজন নীতিনিষ্ঠ, কর্মনিষ্ঠ রাজনীতিক। আমাকে বিপদে-আপদে অনেকবার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন মোকাব্বির। তাঁর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিবেষ্টিত রেস্টু’রেন্টে বহুবার খেতে গেছি। ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে গেছি।*

*মোকাব্বির খানের রাজনীতির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখনো অচ্ছেদ্য। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি আমার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ রাখেন। ড. কামালের এমন একনিষ্ঠ ভক্ত আমি আর দেখিনি। বিলাতে গণফো’রামের কোনো পা’ত্তা নেই। এই পা’ত্তাটা শিবরাত্রির স’লতের মতো বাঁ’চিয়ে রেখেছেন মোকাব্বির। এ জন্য তাঁকে আমি ঠা’ট্টা করে নাম দিয়েছি, বিলাতে ড. কামালের একমাত্র খলি’ফা।*

*এত কিছু সত্ত্বেও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে তিনি একেবারেই অপরিচিত মুখ। তারপর থাকেনও বিলাতে। সিলেট-২ আসন থেকে তাঁর এবার নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। হয়েছেন আওয়ামী লীগের ভ্রা’ন্তির জন্য। এখানে আওয়ামী লীগের যোগ্য মনোনয়ন প্রার্থী এবং আগের সংসদ সদস্য ছিলেন শফিক চৌধুরী। এরশাদের জাতীয় পা’র্টিকে খুশি করতে গিয়ে এই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ জাতীয় পা’র্টির এক সদস্যকে মনোনয়ন দেয়। ফলে মোকাব্বিরের ভাগ্য খুলে যায়। এই কেন্দ্রে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট পান এবং জিতে যান। অন্যদিকে জাতীয় পা’র্টির সদস্যের জা’মানত পর্যন্ত বাজে’য়াপ্ত হয়।*

*মোকাব্বির খানের ভাগ্যে এই অসম্ভব সম্ভব হওয়ার বড় কারণ ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থ’কদের ভোট পাওয়া। কারণ ঐক্যফ্র’ন্টের প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও মোকাব্বির বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি তাঁর আ’নুগত্য এবং সেই আদর্শ বস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার কথা তখনো বলেছেন, এখনো বলছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের একটি জাতীয় দলের নির্বাহী সভাপতি পদে তিনি এক লা’ফে বসে গেলেন কেমন করে? দলের সদস্যদের দ্বারা নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, ড. কামাল হোসেনের মনোনয়নে তিনি এই প’দটি পেয়েছেন।*

*এখানেই প্রশ্নটি ওঠে, গণ’ফোরামে কি এখন আর কোনো যোগ্য নে’তা নেই, যার জন্য এক প্রবাসী সদ্য পরিচিত কর্মীকে এনে দলের নে’তা পদে বসা’তে হলো? গণফোরামের কি এমনই দে’উলিয়া দ’শা হয়েছে? তা ছাড়া ড. কামাল হোসেন তো গণতন্ত্রের নামে পাগ’ল। তাহলে দলের স’দস্যদের দ্বারা নির্বাচনে নির্বাহী সভাপতি না করে তিনি ব্যক্তিগত মনোনয়নে আর সব পরিচিত নে’তাকে ডিঙিয়ে মোকাব্বিরকে নির্বাহী সভাপতি প’দে বসাতে গেলেন কেন? রহ’স্যটা কী? মোকাব্বির গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি হয়েছেন, তাতে বি’স্মিত হলেও আমি আনন্দিত। কিন্তু জানতে চাই এর পেছনের র’হস্যটা কী?*

*প্রশ্নটা আমার মনে আরো বেশি করে জেগেছে এ জন্য যে মোকাব্বির খান ড. কামালের যতই একনিষ্ঠ ভক্ত হোন, এখন আর তিনি তো সম্ভবত নন, ঐক্য’ফ্রন্টের মনোনয়নে নির্বাচনে জেতার পর ফ্র’ন্ট যখন সি’দ্ধান্ত নেয়, তাদের নির্বাচিত সদস্যরা সংসদে শপথ নেবেন না, মোকাব্বির খান সেই সিদ্ধা’ন্ত এমনকি ড. কামাল হোসেনের দলীয় ও ব্যক্তিগত নি’র্দেশ অ’মান্য করে সংসদ সদস্য প’দে শপথ নেন।*

*তাঁকে দ’ল থেকে বহিষ্কা’রের দা’বি ওঠে এবং এই ঘট’নাকে ই’স্যু করে দলের সেক্রে’টারি মোস্তফা মহসিন হোসেন মন্টুকে পর্যন্ত ড. কামাল হোসেন হারান। শপ’থ গ্রহণের পর মোকাব্বির খান ড. কামালের আশীর্বাদ চাইতে গেলে তিনি শুধু তাঁকে তাঁর বাসা থেকে বের করে দেননি, তাঁকে বলেছেন, ‘আপনি জীবনে আর আমার বাসায় আসবেন না।’*

*এ সময় মোকাব্বির খান লন্ডনে আমাকে টেলিফোন করলে তাঁকে আমি বলেছিলাম, ধৈর্য ধরুন, ড. কামালের সাধ্য নেই আপনাকে দল থেকে তাড়ায়। তাড়ালে তাঁর দলে শুধু সাইন’বোর্ডটি অবশিষ্ট থাকবে। আমার সহৃদয় পাঠকরা দেখুন, গরিবের কথা ফলেছে কি না। কয়েক মাস না যেতে গণফোরা’মের সেই বিদেশে বসবাসকারী বি’দ্রোহী কর্মী এখন দলের নির্বাহী সভাপতি। মনোনয়ন দিয়েছেন স্বয়ং কামাল হোসেন।*

*এখন জেনারেল আইয়ুবের কাহিনিতে আসি। পাকিস্তানে ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যু’ত্থানে ক্ষম’তা থেকে আইয়ুবের প’তন ঘটে। তখন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। ক্ষ’মতায় বসে আইয়ুব মুসলিম লীগ দলটিকে বিভক্ত করে ফেলেন। নিজে হন দলের একাংশের সভাপতি। দলের নাম হয় কন’ভেনশন মুসলিম লীগ। বিভক্ত দলের অপর অংশের নাম হয় কা’উন্সিল মুসলিম লীগ। এখন আ’ইয়ুব ক্ষম’তাচ্যুত হওয়ার পরে তাঁর দলে ভা’ঙন ধরে। আইয়ুব নিজেই চাইলেন দলটি ভে’ঙে দিতে। তবে নিজের হাতে নয়, এমন কৌ’শলে ভা’ঙবেন, যাতে তাঁকে হেয় হতে না হয়, তাঁর দুর্না’ম না হয়।*

*চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন আইয়ুব খানের অনুসারী। তাঁকে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পি’কার এবং অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু যেকোনো কারণে হোক, আইয়ুব তাঁর প্রতি ক্রু’দ্ধ হন এবং ফজলুল কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুরু’তর দুর্নী’তির অভি’যোগের তদ’ন্ত শুরু হয়। তিনি স্পি’কারের প’দ ছাড়তে বাধ্য হন।*

*ক্ষম’তাহারা হয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী ঢাকার ইস্কাটনে ৯ নম্বর দিলু রোডের বাসভবনে বাস করতেন। আমি তাঁর রাজনীতির সমর্থক না হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলে আমার জন্য পতেঙ্গার তরমুজ, চট্টগ্রামের বো’স ব্রা’দার্সের মিষ্টি নিয়ে আসতেন। তাঁর মুখে এই কাহিনিটি আমার শোনা।*

*দুর্নী’তি তদন্ত’কারী অফিসাররা যখন ফজলুল কাদের চৌধুরীকে খুব জ্বা’লাচ্ছিলেন, তখন আইয়ুব ক্ষ’মতায়। চৌধুরী সিদ্ধা’ন্ত নিলেন, তিনি রাও’য়ালপিন্ডি যাবেন এবং আইয়ুবের সঙ্গে দেখা করে একটা সম’ঝোতা করে ফেলবেন। আইয়ুব তাঁকে দেখা দিলেন; কিন্তু কিছু কথাবার্তার পরেই ক্রো’ধান্ধ কণ্ঠে বললেন, আপনি এই মুহূর্তে এই বাসা থেকে বেরিয়ে যান। জীবনে কখনো এই বাসায় আসবেন না।*

*ফজলুল কাদের চৌধুরী ভা’ঙা মনে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর পাকিস্তানের রাজনীতি দ্রুত আ’বর্তিত হতে থাকে। ক্ষম’তা থেকে আইয়ুবের পত’ন ঘ’টে। তিনি রাওয়ালপি’ন্ডি থেকে নবনির্মিত রাজধানী ইসলামাবাদে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। এই সময় হঠাৎ একদিন আইয়ুব টেলিফোন করলেন ফজলুল কাদের চৌধুরীকে। কারণ না জানিয়ে তাঁকে ইসলামাবাদে যাওয়ার জ’রুরি ত’লব দিলেন।*

*ফজলুল কাদের চৌধুরী যথাসময়ে ইসলামাবাদে গিয়ে পৌঁছলেন। আইয়ুব তাঁকে বুকে জ’ড়িয়ে ধরলেন। বললেন, জাতি আপনার নেতৃত্ব চায়। মুসলিম লীগ আমাদের হাতে কায়েদে আজমের আ’মানত। সেই আমা’নত রক্ষার ভার আপনার হাতে তুলে দিতে চাই। এখন থেকে আপনি হবেন মুসলিম (কনভেনশন) লীগের সভাপতি। আমি বড় ক্লা’ন্ত। রিটা’য়ার করছি। আমার মনোনয়নে আপনি মুসলিম লীগের সভাপতি হবেন। জাতি তাই চায়।*
*ফজলুল কাদের চৌধুরী বিস্মি’ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার জন্য পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে আমার চেয়ে যোগ্য লোক কি আর কেউ নেই? আইয়ুব জবাব দিয়েছেন, যো’গ্য নে’তা অবশ্যই আছেন। কিন্তু আপনার মতো কায়েদে আজমের যোগ্য অনু’সারী নেই।*

*আইয়ুব কনভে’নশন মুসলিম লীগের সভাপতি পদে ইস্ত’ফা দিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, ১০ বছর জাতির অক্লান্ত সেবা করে তিনি ক্লা’ন্ত। পাকিস্তান এবং কায়েদে আজমের স্বপ্ন হে’ফাজত করার জন্য একজন যো’গ্য নে’তা দরকার, সেই নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী। তিনি তাঁকেই কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছেন।*
*এর পরের ঘ’টনা সবারই জানা। ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্ব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর দলের কেউ মেনে নেয়নি। দলটি কিছুদিনের মধ্যে বি’লুপ্ত হয়। টিকে থাকে আইয়ুববিরো’ধী কাউ’ন্সিল মুসলিম লীগ।*

*দীর্ঘ কয়েক দশক পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ড. কামাল হোসেন কি আইয়ুবের একই রাজনৈতিক কৌ’শল ধার করেছেন গণফোরামের বি’লুপ্তি ঘটা’নোর জন্য? এবং এ ব্যাপারে নিজের গা বাঁ’চানো কি তাঁর উদ্দেশ্য? নইলে দেশে তাঁর দলেই একাধিক পরিচিত নে’তা থাকতে তিনি বিদেশের এক অপরিচিত রাজনীতিক, এক রে’স্টুরেন্ট ব্যবসায়ীকে কেন তাঁর দলের শীর্ষ প’দে তুলে দিলেন? তাঁর দল তো এমনিতেই এখন সাইনবো’র্ডসর্বস্ব দ’ল। এই সাই’নবোর্ডও কি এখন তিনি ফেলে দিতে চান? বিদেশে জনরব, বিএনপির এক দল চায় তারেক রহমানের কবল থেকে বাঁ’চতে রু’গ্ণ ও কারাব’ন্দি খালেদা জিয়াকে সরি’য়ে ড. কামাল হোসেনকে বিএনপির নেতার প’দে বসাতে। গুজ’বটি কি সত্য?*
*লেখক: আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, লন্ডন, রবিবার, ৪ নভেম্বর ২০১৯।*