প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় *ক্যাসিনোকাণ্ড-টেন্ডারবাজিতে দুদকের ১০০ জনের তালিকায় যারা*

*ক্যাসিনোকাণ্ড-টেন্ডারবাজিতে দুদকের ১০০ জনের তালিকায় যারা*

188
*ক্যাসিনোকাণ্ড-টেন্ডারবাজিতে দুদকের ১০০ জনের তালিকায় যারা*

*ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়াদের নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান চলছে। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলাদের নামও বেরিয়ে আসছে। দুদক অনুসন্ধান দলের হাতে এরই মধ্যে অন্তত একশ’ জনের নাম এসেছে। এর মধ্যে ৭৫ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে চলছে পর্যালোচনা। এদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। দুদক সূত্র জানায়, যে ৭৫ জনের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে তাদের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরেরই ১১ কর্মকর্তা রয়েছেন। যারা নানা অনিয়মের মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।*

*শুধু তাই নয়, তালিকায় নাম থাকা গণপূর্তের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ও সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হাইকে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে দুদক। এছাড়াও গত ২৩শে অক্টোবর অভিযুক্তদের দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আরো ২০ জনের তালিকা পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। পর দিনই দেশে মানি লন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলা সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়।*

*দুদকের তথ্য মতে, এই এমপির বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভোগ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দেশের অবৈধ অর্থ দিয়ে বিদেশেও গড়েছেন বাড়ি-গাড়ি। অর্থও পাচার করেছেন মোটা অংকের। এসব অভিযোগ এখন দুদকের অনুসন্ধান টেবিলে রয়েছে। সূত্র জানায়, এরই মধ্যে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন পালানোর চেষ্টা করেছেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে তাকে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।*
*এদিকে ক্যাসিনো ব্যবসায় পরিচালনার মাধ্যমে দেশে মানি লন্ডারিং, বিদেশে অর্থ পাচার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক একাধিক রাজনৈতিক ব্যাক্তির নামও উঠে এসেছে ওই তালিকায়। দুদক সূত্র জানায়, প্রতিদিনই তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অভিযুক্তদের বিষয়ে অনিয়ম দুর্নীতির নানা চমকপ্রদ তথ্য।*

*সূত্র আরো জানায়, দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ অর্জনের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠছে, তাদের প্রত্যেককেই অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানায় দুদক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, যে তালিকা করা হয়েছে এবং যাদের নাম আসছে সবার বিষয়ে খুব গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। কে কোন দলের তা বিবেচনা করছে না দুদক।*

*গত ১৮ই সেপ্টেম্বর রাজধানীতে ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানের দিনই গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। সেদিন থেকেই ক্যাসিনো নিয়ে আলোচনা সর্বত্র। তবে ঘটনার ১২দিন পর্যন্ত দুদক এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপে যায়নি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্যাসিনো দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ নয়। তবে এর মাধ্যমে যদি অবৈধ সম্পদ অর্জনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় সে বিষয়ে অনুসন্ধান করবে। ৩০শে সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সংস্থাটির গোয়েন্দা ইউনিট রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ বেশ কজনের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো পরিচালনা করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ৪৩ জনের তালিকা তৈরি করে সংস্থাটি। তবে এ সংখ্যা বেড়ে এখন একশ’ জনে ঠেকেছে।*

*র‌্যাবের অভিযানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ছাড়াও গ্রেপ্তার হন কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ মো. লোকমান হোসেন ভূইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর অন্যতম হোতা সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান (মিজান) ও তারেকুজ্জামান রাজীব। গ্রেপ্তারকৃতদের সবারই অবৈধ সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। এছাড়াও যারা তালিকায় রয়েছেন কিন্তু গ্রেপ্তার হননি তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যাপক অবৈধ সম্পদের তথ্য মেলে সংস্থাটির কাছে। অনুসন্ধান দলের কাছে আসা তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে এরই মধ্যে চারটি মামলা করেছে দুদক। এসব মামলায় জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও তার ভাই গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রুপন ভূইয়াকে আসামি করা হয়।*

*এখন পর্যন্ত দুদকে যাদের নাম এসেছে তার মধ্যে জাতীয় সংসদের সরকারি দলের তিনজন এমপি রয়েছেন। সুনামগঞ্জ-১ আসনের মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ছাড়াও এ তালিকায় নাম আছে ভোলা-৩ আসনের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ও চট্টগ্রামের এমপি সামশুল হক চৌধুরীর।*
*দুদক সূত্র বলছে, ক্যাসিনো পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে নাম চলে আসে ভোলার এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের। অভিযোগ রয়েছে, ভোলাতে একাধিক টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত তিনি।*

*এমনকি এসব টেন্ডার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন শাওন। এছাড়াও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেয়া খালেদ ও সম্রাটের তথ্যে জানা যায়, ক্যাসিনোতে শাওনের নাম না থাকলেও ঢাকার একাধিক ক্লাব নিয়ন্ত্রণ হতো তার মাধ্যমে। ক্লাবে ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন জুয়া থেকে আয় করা অর্থের একটি বড় অংশ যেত শাওনের কাছে। এসব অর্থের বেশিরভাগই বিদেশে পাচার করেন তিনি। এছাড়াও দেশে বিদেশে অনেক সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে দুদকের কাছে। অন্যদিকে সরকার দলীয় হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধেও সংস্থাটির অনুসন্ধান চলমান। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে, চট্টগ্রামের এই প্রভাবশালী এমপি ক্যাসিনোর মাধ্যমে অঢেল অর্থের মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধান টিমের হাতে রয়েছে।*

*এই দুই এমপিকেও বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের শুরু থেকেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নাম সবার মুখে মুখে। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির। গত ৬ই অক্টোবর সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর নানা জিজ্ঞাসাবাদে ৪ থেকে ৬’শ কোটি টাকা তার রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি থেকে তিনি এই বিপুল পরিমাণ টাকা উপার্জন করেছেন। এছাড়া সম্রাটের ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার নথি পাওয়া যায় দুদকের অনুসন্ধানেও। কারাগারে থাকা সম্রাটের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞ দিয়েছে দুদক। সংস্থাটির অনুসন্ধান তালিকায় নাম আসে যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতির সহযোগী এনামুল হক আরমানের। সম্রাটের ছত্রচ্ছায়ায় ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনো ও জুয়া-বাণিজ্যের অন্যতম হোতায় পরিণত হন তিনি।*

*সূত্র জানায়, শত কোটি টাকার মালিক হলেও আরমানের টাকা কোথায় রয়েছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে দুদকে। গত ২০শে সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া ব্যবসায়ী জি কে শামীমেরও ব্যাপক অবৈধ অর্থের সন্ধান মিলেছে। এরই মধ্যে দুদকের কাছে ২৯৭ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংস্থাটি। সূত্র জানিয়েছে, শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড বর্তমানে এককভাবে গণপূর্তের ১৩টি প্রকল্পের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। আবার যৌথভাবে আরও ৪২টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, যা সারা দেশে চলমান অধিদপ্তরের মোট প্রকল্পের ২৮ শতাংশ। সবকটি প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৪ হাজার ৬৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা, যার মধ্যে ১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে দুদকে অনুসন্ধান চলছে।*

*এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জি কে শামীমের সঙ্গে যোগসাজশের। তাদের ঘুষ দিয়ে শামীম গণপূর্তের বড় কাজগুলো বাগিয়ে নিয়েছেন বলে দুদকে অভিযোগ আছে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুলের বিরুদ্ধে এর আগে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানাধীন ছিল। কিন্তু জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগ নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছিল সংস্থাটি। এবার তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।*

*এছাড়াও ক্যাসিনোসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের মালিক হওয়াদের মধ্যে মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ মো. লোকমান হোসেন ভূইয়া, ঢাকা মহানগর কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান (মিজান), গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও তার ভাই গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রূপন ভূইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের বহিষ্কৃত দপ্তর সম্পাদক কাজী কাজী আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান, লোকমান হোসেন ভূইয়ার স্ত্রী নাবিলা লোকমান,*

*ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার, এনামুল হকের সহযোগী ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ (আজাদ রহমান), রাজধানীর কাকরাইলের জাকির এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাকির হোসেন ও সেগুনবাগিচার শফিক এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শফিকুল ইসলামের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। দুদক গত ৩০শে সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করে সংস্থাটির পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের টিম। টিমের অপর সদস্যরা হলেন-উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম, সালাউদ্দিন আহমেদ, সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী ও মোহাম্মদ নেয়ামুল আহসান গাজী।*