প্রচ্ছদ আইন-আদালত *শেখ হাসিনাকে হামলাকারী আ’লীগ নেতা মিজানের ফ্ল্যাটে অভিযান*

*শেখ হাসিনাকে হামলাকারী আ’লীগ নেতা মিজানের ফ্ল্যাটে অভিযান*

894
*শেখ হাসিনাকে হামলাকারী আ'লীগ নেতা মিজানের ফ্ল্যাটে অভিযান*

*রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলে হঠাৎ অর্থবিত্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠা হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাবের একটি দল। গত মঙ্গলবার রাত ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত আওরঙ্গজেব রোডে পাগলা মিজানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে এই অভিযান চালায় র‌্যাব-২-এর একটি দল। র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, মিজানের বিরুদ্ধে নানা অভিযাগ থাকায় এই অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তাঁকে বাসায় পাওয়া যায়নি।*

*আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, পাগলা মিজান একজন ভ’য়ংকর সন্ত্রা’সী। সিটি করপোরেশনের ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি থেকে শুরু করে মানুষ হ’ত্যা পর্যন্ত অনেক অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হ’ত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর বাসায় হামলা করেছিল যারা, সেই দলেরও একজন তিনি। অথচ সময়ের স্রোতে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। ভোল পাল্টে গেছে তাঁর, পাল্টে গেছে নামটিও। তিনি এখন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নে’তা। মা’দক কারবার থেকে শুরু করে খুনখারাবি পর্যন্ত নানা অপ’রাধমূলক কাণ্ডে তাঁর নাম উঠে এসেছে বারবার।*

*সূত্র জানায়, মহাজোট সরকারের আমলে মিজান বাহিনী ৩০০-৪০০ কোটি টাকার শুধু টেন্ডারবাজিই করেছে। এ ছাড়া ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মা’দক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ মিজানের হাতে। স্থানীয় লোকজন বলেন, খুনখারাবি পাগলা মিজানের বাঁ হাতের কাজ। এ কারণে এলাকায় কেউ তাঁর ভয়ে কথা বলে না।*

*২০১৪ সালে মোহাম্মদপুর এলাকায় ৬৫ বছরের বৃদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আহমেদ পাইন ও তাঁর অসুস্থ স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে তুচ্ছ ঘটনায় শত শত মানুষের সামনে জুতাপেটা করেন এই পাগলা মিজান। কেউ ভয়ে কথা বলেনি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেক নেতা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা তাঁর অপকর্মে সহযোগিতা করেন। এ কারণে অপরাধ করেও তিনি পার পেয়ে যান।*

*বর্তমানে চলমান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও একাধিক খুনের মামলা কাঁধে নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর নামে মোহাম্মদপুর থানায় ১৯৯৬ সালে ইউনূস হ’ত্যা, ২০১৬ সালে সাভার থানায় জোড়া হ’ত্যা মামলা রয়েছে। গত বছর জমি দখল ঘিরে একদল সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যানসংলগ্ন তুরাগ নদের ওপারে একটি রিয়েল এস্টেটের ছয় কর্মীকে গু’লি এবং আরো ১৪ জনকে কু’পিয়ে জ’খম করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা জুয়েল নামের একজনকে হ’ত্যা করে লা’শ তুরাগে ফেলে দেয়। এ হ’ত্যাকাণ্ডেও হাবিবুর রহমান মিজানের নাম উঠে আসে। পাগলা মিজান শ্যামলী মাঠের পশ্চিম পাশের জমির একাংশ দখল করে মার্কেট বানিয়েছেন। সেখানে তিন শতাধিক দোকানঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন।*

*সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর সংঘর্ষের নেপথ্যেও উঠে এসেছে তাঁর নাম। মিজান ক্যাম্পের বিদ্যুৎলাইন থেকে ক্যা’ম্প লাগোয়া কাঁচাবাজার ও মাছের বাজারের তিন শতাধিক দোকানে অবৈধ সংযোগ দিয়ে মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় করতেন। এ কারণেই বিদ্যুৎঅফিসের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর ঝামেলার সূত্রপাত।*
*পাগলা মিজান কয়েকবার জেলে গেলেও অল্প সময়েই ফের বেরিয়ে এসে ‘হাল ধরেছেন’ নিজের অপরাধ সাম্রাজ্যের। বর্তমানে ইয়াবা কারবার করে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন।*
*সম্প্রতি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অনুসন্ধানে নেমে জানতে পারেন পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে মিজানের সম্পর্কের কথা। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তার অফিসে মিজান নিয়মিত অবস্থান করেন। বিষয়টি তাঁরা সরকারের উচ্চ মহলে জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত পুলিশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।*

*জানা যায়, ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় আসেন মিজানুর রহমান। শুরুতে মিরপুরে হোটেল বয়ের কাজ নেন। এরপর মোহাম্মদপুর এলাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি শুরু করেন। চুরি করা সেই ঢাকনাই আবার বিক্রি করতেন সিটি করপোরেশনে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি খামারবাড়ি খেজুরবাগান এলাকায় ছিনতাই করতে গেলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়ায় মসজিদের পাশে পুকুরে নেমে পড়েন। পুলিশ বারবার নির্দেশ দিলেও তিনি পুকুর থেকে উঠে আসেননি। কয়েক ঘণ্টা পর কোনো কাপড় ছাড়াই উঠে আসেন। এ কারণে পুলিশ তাঁকে ‘পাগলা’ আখ্যা দিয়ে ছেড়ে দেয়। তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে ‘পাগলা মিজান’ হিসেবে। ওই বছরই ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেন তিনি। ফ্রিডম পার্টির সদস্য হিসেবে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে লিবিয়া যান।*

*১৯৭৬ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ নেত্রী রেজিয়া বেগমের খাবার লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে প্রথমবার আলোচনায় আসেন মিজান। ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হা’মলা চালায় একটি চক্র। তারা সেখানে গু’লি করে এবং বো’মার বি’স্ফোরণ ঘটায়। এ সময় শেখ হাসিনা বাড়ির ভেতর অবস্থান করছিলেন। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরা পাল্টা গু’লি চালালে হামলাকারীরা চলে যায়। এ ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় একটি মামলা করা হয়। ১৯৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৬ জনকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেয়।*

*অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হাম’লাকারীদের মধ্যে মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন। ১৯৯৫ সালে দুষ্কৃতকারীদের গু’লিতে তিনি মা’রা যান।*
*শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং এরও পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে মিজানুর রহমান নিজের নাম পাল্টে হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। ফ্রিডম পার্টি ছেড়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। তিনি এখন মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের আলোচিত নেতা, আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক। গড়ে তুলেছেন বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য ও বিত্তের পাহাড়।*