প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য *ব্যক্তির অপক’র্মের দা’য় কি দলের?*

*ব্যক্তির অপক’র্মের দা’য় কি দলের?*

387
*ব্যক্তির অপকর্মের দায় কি দলের: বাবর থেকে সম্রাট*

*যুবলীগ নে’তা সম্রা’টের মুক্তির দা’বিতে ফেনীতে মিছি’ল*
*ঢাকা মহানগর আওয়ামী যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী স’ম্রাটের মু’ক্তির দা’বিতে মি’ছিল হয়েছে ফেনীর পরশুরামে।* *সেই মি’ছিলের ভি’ডিওটি শেয়ার করা হয়েছে ফেনী জেলা নিউজ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে।* *সেই ভি’ডিওতে গ্রামবাসীকে ‘সম্রাট ভাই, ভয় নাই, রাজ’পথ ছাড়ি নাই’, ‘স’ম্রাট ভাইয়ের কিছু হলে জ্ব’লবে আ’গুন ঘরে ঘরে’সহ নানা ধরনের স্লো’গান দিতে দেখা গেছে।*

*গতকাল রবিবার ভোররাত সাড়ে ৫টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সীমান্তবর্তী পুঞ্জশ্রীপুর গ্রাম থেকে সম্রাট ও ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেফতার করে এলিট ফোর্স র‌্যাব।* *এরপর সম্রাটকে নিয়েই তার কাকরাইলের কার্যালয়ে অভিযান চালায়।* *প্রায় ৫ ঘণ্টার অভিযানে র‌্যাব ওই কার্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ক্যাঙ্গারু ও হরিণের চামড়া, ইয়াবা এবং একটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে।*
*বন্যপ্রাণীর চামড়া রাখার অপরাধে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের ভ্রাম্যমাণ আদালত সম্রাটকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।* *পরে রাত ৭টা ৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে সম্রাটকে নিয়ে যায় র‌্যাব।*

*ব্যক্তির অ’পকর্মের দা’য় কি দলের: বাবর থেকে স’ম্রাট*
*স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যক্তি আলো’চিত-সমা’লোচিত হয়েছেন। সেসমস্ত ব্যক্তিদের স’মালোচনার দায় নিতে হয়েছে তাদের দলকে।* *ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের অপ’কর্মের জন্য তাদের একটা নামও নির্দিষ্ট হয়েছিলো এবং সেই নামগুলো আজও অক্ষত রয়েছে।* *যদিও তাদের অনেকেই এখন নেই।* *কিন্তু তাদের নামগুলো আজও আমাদের মাঝে চির অম্লান।*
*এই সমস্ত ব্যক্তিদের অপকর্মের জন্য ঐ ক্ষমতাসীন দলের অনেক ক্ষ’তি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।* *বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন সময়ে এই সমস্ত অপ’কর্মকারী, বদনা’মকারী ব্যক্তিদের নিয়েই আমাদের আজকের প্রতিবেদন*

*১৯৭২-১৯৭৫; টুপি মোশতাক: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকারের আমলেই খন্দকার মোশতাক আহমেদ মন্ত্রী ছিলেন। প্রথমে তিনি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরে তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে তাকে মন্ত্রী আবার মন্ত্রীপদে বহাল রাখেন। খন্দকার মোশতাকের নাম ছিল ‘টুপি মোশতাক’। এই নামের পিছনে দুটি কারণ ছিল। ৭২ থেকে ৭৫ এ বিভিন্ন রাজনৈতিক লেখালেখি থেকে দেখা যায় যে, ৭৫ এ নিহত শেখ ফজলুল হক মনি বলেছিলেন, ‘খন্দকার মোশতাকের টুপির মধ্যে সমস্ত শয়তানি বুদ্ধি’। এজন্য একটি কলামে তার নাম টুপি মোশতাক দিয়েছিলেন তিনি। এরপরে নামটি জনপ্রিয়তা পায়। কেউ কেউ মনে করেন, খন্দকার মোশতাক তার টুপির মধ্যে ঘুষের টাকা রাখতেন। তিনি পাকিস্তানের আদলে কিস্তি টুপি পরতেন।*
*টুপি মোশতাক যে ৭৫ এর ১৫ আগস্টের বিয়োগাত্মক ঘটনার অন্যতম খলনায়ক, তা আজ নতুন করে বলার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের জন্য সবচেয়ে বেশি যাকে দায়ী করা হয়, তিনি হলেন টুপি মোশতাক।*

*৭৫-৮১; মদ মশিউর: বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতার পাদপ্রদীপে আসেন। একসময় তার রাজনীতিতে আসার খায়েশ হয়, সেসময় তার বাহক হয় মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তার আরেকটি নাম হয় ‘মদ মশিউর’। তিনি যেকোনো বৈঠকে বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে মদ না খেলে সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন না বা স্বাভাবিক থাকতে পারতেন না। সেজন্য জিয়াউর রহমান তার নাম দেন মদ মশিউর। এসময় মশিউর নামে স্থানীয় পর্যায়ের আরও দুএকজন নেতা বিএনপিতে যোগ দেওয়ায় মদ মশিউর নামটাই বেশি উচ্চারিত হতো।*

*৮২-৯০; থিফ অব বাগদাদ: ৮২ থেকে ৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামল ছিল। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও জিয়াউর রহমানের কায়দায় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। অবৈধ প্রক্রিয়াতে রাজনৈতিক দলও গঠন করেন। এসময় এরশাদকে যারা ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য সহযোগিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেজর জেনারেল মাহামুদুল হাসান। তিনি একসময় সিটি কর্পোরেশনের মেয়রও নির্বাচিত হন। তখন ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তার নাম হয় থিফ অব বাগদাদ। জানা যায়, এরশাদের যাবতীয় অবৈধ অর্থের একটা বড় অংশের যোগানদাতা থিফ অব বাগদাদ মাহামুদুল হাসান।*
*শুধু থিফ অব বাগদাদ নয়, এসময় চিনি কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েন এরশাদের আরেক সহযোগী কাজী জাফর আহমেদ। তার নাম হয় চিনি জাফর। এইসব কেলেংকারির কারণেই এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়, পরে এরশাদের পতন ঘটে।*

*১৯৯১-১৯৯৬; তুই রাজাকার: ৯১ থেকে ৯৬ সালে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সাড়া জাগানো নাটক ‘বহুব্রীহি’তে ‘তুই রাজাকার’ সংলাপটি অনেক পরিচিত এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসময়েই বিএনপি সরকার জামাতের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় আসে। বিএনপির রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন রাজাকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীও ছিলেন রাজাকার। সেসময় ‘তুই রাজাকার’ কথাটির মাঝে এই দুই ব্যক্তিকে তুই রাজাকার বলে ডাকা হতো। তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে গণআদালত। এই গণআদালতের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্টদ্রোহিতার মামলা করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর এই সরকারের নামই হয় তুই রাজাকার।*

*৯৬-২০০১; পিস্তল ইকবাল, হাজারী লীগ: ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এসময়ে আওয়ামী লীগ সরকার অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য ভালো কাজ করলেও কিছু কিছু ব্যক্তির অপকর্মের জন্য আওয়ামী লীগ সমালোচিত হয়। এই সমালোচিতদের একজন ছিল জয়নাল হাজারী। তিনি ফেনীর মাফিয়া ডন ছিলেন। আওয়ামী লীগের প্যারালাল তিনি গড়ে তুলেছিলেন হাজারী লীগ। সেসময় যারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অপকর্ম করতো, তাদেরকে ডাকা হতো হাজারী লীগ নামে।*

*ওই সময়ে আরেকটি নাম জনপ্রিয় হয়, পিস্তল ইকবাল। ডা. এইচবিএম ইকবাল বিএনপির এক হরতালে পিস্তল নিয়ে তাড়া করতে গিয়ে সেই ছবি সমস্ত পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই থেকে তার নাম হয় পিস্তল ইকবাল। এই পিস্তল ইকবাল এবং হাজারী লীগ আওয়ামী লীগের ২০০১ সালে নির্বাচনের ভরাডুবির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।*

*২০০১-২০০৬; ক্যাসিও বাবর: লুৎফুজ্জামান বাবর ছিলেন একজন চোরাকারাবারি, বিমানবন্দরে ক্যাসিও ঘড়ি চোরাচালান করে আনার জন্য তার নাম হয়েছিল ক্যাসিও বাবর। এই ক্যাসিও বাবরকে তারেক রহমান চোরাচালান এবং অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বাবর ছিল সরাসরি তারেক রহমানের অধীনে। এই ক্যাসিও বাবরের আরেকটা নাম ছিল ‘লুকিং ফর শত্রুজ’।*

*এসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন মন্ত্রী ছিলেন, এয়ার মার্শাল ভাইস আলতাফ হোসেন চৌধুরী। তার আরেকটি নাম ছিল ‘আল্লাহর মাল’। একটি শিশুর মৃত্যুর পর তিনি পরিহাস করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’। এই আল্লাহর মাল এবং ক্যাসিও বাবরদের কারণেই বিএনপি দুর্বৃত্তায়ন সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এবং তারা সবকিছু ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। পরবর্তীতে আসে ওয়ান ইলেভেন।*

*২০০৭-২০০৮; ঘোড়া মইন: এই দুই বছরে সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকার ছিল ক্ষমতায়। এসময় সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল ‘ঘোড়া মইন’। মইন ইউ আহমেদ ছিলেন তৎকালীন সেনা প্রধান এবং এই সরকারের মূলশক্তিও ছিলেন তিনি। এই অনির্বাচিত সরকারের সময়ে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। দ্রব্যমূল্যের দাম জ্যামিতিক গতিতে বাড়তে থাকে। সেসময় মইন ইউ আহমেদ চাল আনা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার সাহায্যার্থে ভারতে যান। কিন্তু ভারতে গিয়ে তিনি চাল আনতে পারেননি। বরং তাকে কিছু ঘোড়া উপহার দেওয়া হয়। সেই থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম হয় ঘোড়া মইনের সরকার।*

*২০০৯- বর্তমান; ক্যাসিনো সম্রাট: বর্তমান সরকারের শাসনামলে অনেকগুলো নামই এসেছে এরকম। তবে সব নাম ছাপিয়ে ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ নামটি সবার উপরে এসেছে। কোনো কোনো বিরোধীদলের নেতা সমালোচনা করে আওয়ামী যুবলীগের নামই রেখেছে ক্যাসিনো লীগ। ক্যাসিনো সম্রাট আওয়ামী লীগের গত ১০ বছরে যে অর্জন, সে অর্জনকে কলংকিত করেছে সম্রাটের মতো কিছু টেন্ডারবাজ দুর্বৃত্তরা। সেজন্যই এই তিন মেয়াদে থাকা আওয়ামী লীগের কলংক তীলকের নাম ক্যাসিনো সম্রাট।*