প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য *জিয়া-এরশাদের বোমাবাজ বিচ্ছু শামসু আজ দাপুটে হুইপ*

*জিয়া-এরশাদের বোমাবাজ বিচ্ছু শামসু আজ দাপুটে হুইপ*

95
*জিয়া-এরশাদের বোমাবাজ বিচ্ছু শামসু আজ দাপুটে হুইপ*

*সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে র‌্যাবের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে একের পর এক অবৈধ ক্যাসিনো, মাদক আখড়া ও জুয়াড়িদের ক্লাব উদ্ঘাটন হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলছে ব্যাপক ধরপাকড়। তখন চট্টগ্রামের সরকারদলীয় হুইপ শামসুল হক বা বিচ্ছু শামসু সংবিধান লঙ্ঘন করে এর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে দেশে আলোচনার ঝড় তোলেন। একজন পুলিশ পরিদর্শক তার বিরুদ্ধে ১৮০ কোটি টাকা চট্টগ্রামের একটি ক্লাবের জুয়া থেকে আয় করেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে যেমন আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন, তেমনি সেই পুলিশ পরিদর্শককে বরখাস্তও করা হয়েছে।*

*এদিকে আওয়ামী লীগের হুইপ বহুল বিতর্কিত শামসুলের ছেলে শারুন ও চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা দলের প্রবীণ নেতা দিদারুল আলমের টেলিফোন কথোপকথনের অডিও রেকর্ড ফাঁস হলে দেশজুড়ে ঝড় ওঠে। শামসুলের ছেলে শারুন দিদারুল আলম চৌধুরীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও রাস্তায় নগ্ন করে পেটানোর যে হুমকি দিয়েছেন তাতে দলের নেতা-কর্মীরা ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হন। যদিও শারুন লাইভে এ নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে চাইলেও গ্রহণযোগ্যতা পাননি। সবাই বলেছেন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের দল করে আওয়ামী লীগের জনসভায় বোমা হামলা করা আজকের আওয়ামী লীগের হুইপ শামসুল হক ক্ষমতার দম্ভে এতটাই উন্নাসিক যে তার ছেলে শারুন আরও বেশি বেপরোয়া বলেই দলের ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ একজন বয়স্ক নেতার সঙ্গে এমন আচরণ করেছেন।*

*এদিকে হুইপের ছেলের হুমকি-ধমকি ও টেলিফোন অপমানের যন্ত্রণা-বেদনা ও ক্ষোভে মুখ খুলেছেন চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মহানগর আওয়ামী লীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী। সেনাশাসক জিয়ার মুখেই তাকে কীভাবে ‘বিচ্ছু শামসু’ ডাকা শুরু হয়, কীভাবে শামসুল হক যুবদলের থানা নেতা থেকে পরে সেনাশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নে ভূমিকা রাখেন, কীভাবে তিনি আওয়ামী লীগে প্রথম যোগদান করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও পরে সফল হন এবং এমপি, হুইপ এবং অর্থ ও ক্ষমতার মালিক হয়ে আজ দলের নেতা-কর্মীদের ওপরই নয়, এলাকায় কীভাবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন সে চিত্রসহ অতীতের সব কীর্তি তুলে ধরেছেন।*

*দিদারুল আলম চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পটিয়ার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরী একসময় ডবলমুরিং থানা যুবদলের সেক্রেটারি ছিলেন। পরে জাতীয় পার্টির রাজনীতিও করেছেন। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে আসেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। এ সময় উপস্থিত অন্যদের ধরে নির্বাচনী প্রচারণার মাইক হাতে নেন শামসুল হক চৌধুরী। জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে লাগামহীনভাবে গালাগালি করায় সেদিন জিয়াউর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন শামসুল হক। সেদিন তার ‘বিচ্ছু শামসু’ নামটি জিয়াউর রহমান দিয়েছিলেন*

*দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, জিয়ার প্রডাক্টের কাছে কখনো বঙ্গবন্ধু কিংবা তার মেয়ের জন্য ভালোবাসা থাকবে না। থাকবে শুধু বাইরের একটা রূপ দিয়ে ব্যবহার করে উনার থেকে কিছু হাতিয়ে নেওয়া। প্রকৃতপক্ষে তার অন্তরে বিএনপি-জাতীয় পার্টি। মুখে মুখে তিনি আওয়ামী লীগ।*

*চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক আরও বলেন, ডবলমুরিং থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় তিনটি টাইপ মেশিন চুরি করে হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন শামসুল হক চৌধুরী। এ ঘটনায় ১৭ দিন হাজতবাসও করেন। পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে নিউমার্কেট মোড়ে আওয়ামী লীগের মিটিং প করার জন্য বোমা হামলা চালান দলবল নিয়ে। তখন আমাদের মোশাররফ ভাই আহত হয়েছিলেন। বোমা হামলার পর আমাদের নেতা ইসহাক মিয়া কিন্তু মাইকে বলেছিলেন, ‘কে তুমি হামলাকারী? আমি তোমাকে ভালো করে চিনেছি। তোমার নামের প্রথম অক্ষর “শ”, তোমার ঘাড় বেটে।’*

*দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, ’৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে শামসুল হক আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাচ্ছেন বিধায় স্টেডিয়ামে গরু জবাই করেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভাই আর আমি বহু চেষ্টা করে তাকে যোগ দিতে দিইনি। এর সাক্ষী আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন প্রটোকল অফিসার। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আওয়ামী লীগের ৫০ বছর পূর্তিতে তার যোগদানের চেষ্টা আমরা রুখে দিই। পরে ঢাকার কিছু নীতিভ্রষ্ট ক্রীড়া সংগঠক টাকার বিনিময়ে তাকে আওয়ামী লীগে যোগদানের সুযোগ দেন।*

*সৈয়দ সেলিম নবীর (বর্তমানে ভারতে বসবাসকারী) কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়ে শেখ রাসেল ক্রীড়া সংসদে দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ পান শামসুল হক। সেদিনও সেলিম নবী ইন্ডিয়া থেকে আমাকে ফোন করে বলল, তার টাকাটা আজ পর্যন্ত শামসুল হক দেননি। তাকে বলা হয়েছিল পরিচালক করা হবে। কদিন আগে পরিচালক পদ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে সেলিম নবীর নাম নেই। তিনি এমপি বা হুইপ যদি না হতেন তাহলে একবাক্যে বলতাম, তার মতো একজন প্রতারক বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।*

*চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা বলেন, এরপর শামসুল হক আবাহনীর সাইনবোর্ড ধারণ করলেন। আবাহনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটা দুর্বলতা আছে, যেহেতু সংগঠনটি তার প্রিয় ভাই শেখ কামালের হাতে গড়া। শামসুল হক চৌধুরী চেয়েছিলেন আবাহনীকে হাতিয়ার করে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। এই আবাহনীকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগান, ষোল আনা উশুল করে নিলেন।*

*দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, আমার শ্রদ্ধেয় নেত্রী, আমার বড়বোনকে অনুরোধ করব- দলে যারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শ বিশ্বাস করে না তাদের ছাঁটাই করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শিক সন্তান, সে পেটে পাথর বেঁধে উপোষ থাকবে, কিন্তু চুরি করতে যাবে না।*

*তিনি বলেন, আবাহনী লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবের তিন সিগনেটরির একজন তিনি নিজে। তাকে বাদ দিয়ে সংগঠনের অর্থ নয়ছয় করার চেষ্টা হলে তিনি আবেদন করে ব্যাংক হিসাবটি বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি নিজেই হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল হক চৌধুরী শারুনকে ফোন করে তার বাবার সঙ্গে জমি নিয়ে চলা বিরোধটি মিটিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেন এবং দেখা করার জন্য সময় চান। ফোনালাপের শুরুতে ব্যবহার ভালো করলেও শেষের দিকে আবাহনীর ব্যাংক হিসাব বন্ধ করার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শারুন এবং একপর্যায়ে চড়-থাপ্পড়ের হুমকি ও রাস্তাঘাটে নগ্ন করে পেটানোসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।*

*মূলত তার জেরেই শামসুল হক চৌধুরী প্রসঙ্গে মুখ খুললেন দিদারুল আলম চৌধুরী। ফাঁস করে দিলেন তার সব কা কীর্তি। দুজনের ৮ মিনিটের কথোপকথনের উল্লেখযোগ্য অংশ:*
*দিদারুল: ক্লাবের ব্যাপারে তোমার আব্বার সাথে বসে কথা বলব। শারুন: ক্লাবের ব্যাপারে কীসের কথা? ক্লাবের ব্যাপারে যা কথা হওয়ার হইছে আর কথা বলার দরকার নেই। আপনি আপনার ক্ষমতা দেখাইছেন তো, এখন আমাদেরটা আমরা দেখাব। দিদারুল: ক্ষমতা-টমতা কিচ্ছু না। শারুন: দেখাইছেন তো। আপনি ক্ষমতা দেখাচ্ছেন না?*

*দিদারুল: আমাদের সেইফের জন্য করতে হবে না? শারুন: আমরা যদি ক্ষমতা দেখাই আপনি এক পারসেন্টও টিকতে পারবেন? দিদারুল: না না, আমি ১০০ পারসেন্ট টিকতে পারব। আমি হইলাম শেখ মুজিবের আদর্শিক সন্তান। শারুন: এ, এইসব গালগোল অন্য জায়গায় কইরেন। আমার সাথে কইরেন না। আমি সম্মান দিছি সম্মান নিয়ে থাইকেন।*

*দিদারুল: শোনো আমি সাগরেদ নই। তোমার আব্বা তো জাতীয় পার্টি করে, এখন আওয়ামী লীগে এসেছে।শারুন: এগুলা শেখ হাসিনা বুঝবে। আপনার বোঝার দরকার নাই। রাখেন মিয়া ফালতু। দিদারুল: আমরা তো শাহজাদা, সাগরেদ না। শারুন: আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না?*

*দিদারুল: আমি তোমাকে এই জন্যই ফোন দিই নাই। তুমি এক কাজ কর রবিবার এসো। শারুন: রাস্তাঘাটে যখন প্যান্ট-শার্ট খুইলা দিমু তখন বুঝবেন। বেআদবি তো এখনো দেখেন নাই। সম্মান করে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না? দিদারুল: অ্যা অ্যা? তুমি রাস্তাঘাটে… শারুন: আপনি উল্টাপাল্টা কথা বলতেছেন কীসের জন্য? দিদারুল: উল্টাপাল্টা কী বললাম? আরে শোনো তোমার বাবা বিএনপি-যুবদলের এরপর জাতীয় পার্টি কইরা এখন… শারুন: গালবাজি যেখানে-সেখানে করবি রাস্তাঘাটে চড় মেরে মুখের দাঁত সবগুলো ফেলে দেব। বেআদব কোথাকার!*