প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয় “এরশাদের আসনে নৌকার পাল ওড়াতে চায় আ.লীগ”

“এরশাদের আসনে নৌকার পাল ওড়াতে চায় আ.লীগ”

25

*‘এরশাদের আসন’ বলে পরিচিত রংপুর-৩ এবার জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃ’ত্যুর পর বদলেছে সমীকরণ। জাতীয় পার্টিতে বর্তমান বিভাজনের কারণে তাই রংপুর-৩ উপ-নির্বাচনে দীর্ঘদিন পর এ আসনে ‘নৌকার পাল ওড়ানোর’ স্বপ্ন দেখছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গত নির্বাচনের শরিক জাতীয় পার্টিকে এবার কোনো প্রকার ছাড় দিতে চায় না আওয়ামী লীগ। শনিবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়েও এই ই’ঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ‘রংপুর আসনে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগ ছাড় দেবে’ এটা সত্য কি না- এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, এটা হাওয়া থেকে পাওয়া খবর।

*জানা গেছে, প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ‘জনপ্রিয়তা’ আর মহাজোটের হিসাব-নিকাশে রংপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই দীর্ঘদিন। তবে সেই অবস্থা এবার না হতে দিয়ে ওই আসনে নিজের প্রার্থীর জয় দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। প্রায় অপ্রতিরোধ্যভাবেই এই আসনটিতে লাঙ্গল ছিল একচেটিয়া। প্রায় ৪৬ বছর পর এবার তাই লাঙ্গলের গতি থামিয়ে নৌকার পাল উড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে বলে মনে করছেন তারা। কারণ যোগ্য নেতা থাকার পরও রাজনীতির যোগ-বিয়োগের সমীকরণে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্ব’ন্দ্বিতা করতে না পারার আক্ষে’পে পু’ড়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

*আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, জাতীয় পার্টির বর্তমান বিভা’জনের কারণে এবার ওই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বেশ সুবিধাজনক অ’বস্থায় রয়েছেন। এবার ওই আসনে কোনো প্রকার ছা’ড় দেয়ার পক্ষ নয় দলের হাইকমান্ড। ওই আসনে উপ-নির্বাচনের জন্য আজ শনিবার সন্ধ্যায় দলের সংসদীয় বোর্ডের সভায় মনোনয়ন দেয়া হবে। এ ছাড়া কয়েকটি উপজেলায় প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করার জন্য এই বৈঠকে বসছে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে এই বৈঠক হবে।

*‘জাতীয় পার্টির বিভক্ত দুই গ্রুপ আওয়ামী লীগের দিকে তাকিয়ে রয়েছে’- এ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শনিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, জাতীয় পার্টির সঙ্গে একসময় আমাদের জোট ছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনি জোট থাকলেও আদর্শিক কোনো ঐক্য নেই। তিনি আরও বলেন, জাতীয় পার্টিতে কী হয়েছে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়। জাতীয় পার্টি তো আওয়ামী লীগের কোনো শাখা সংগঠন নয়, যে এটা আওয়ামী লীগকে দেখতে হবে। এটা তাদের বিষয়, তারাই দেখবে।

*আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করেন, এরশাদের মৃ’ত্যুর পর শূন্য হওয়া ওই আসনটি এবার নৌকাই পেতে যাচ্ছে। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, ব্যক্তি এরশাদের একটা আলাদা জনপ্রিয়তা ছিল। কিন্তু তার জায়গায় জাতীয় পার্টির শক্ত প্রার্থী নেই এখন। তা ছাড়া এরইমধ্যে জাতীয় পার্টি দুই অংশে বিভক্ত হয়ে টাল’মাটাল অবস্থা। পাল্টা’পাল্টি অবস্থানে ভা’ঙার অপেক্ষায় এরশাদের হাতে গড়া এই দল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দুই পক্ষ থেকে দুজন প্রার্থী আসতেও পারে রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে। বিষয়টি যদি এমন হয়, তা আওয়ামী লীগের জন্য বাড়তি সুযোগ হিসেবে কাজ করবে। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে রংপুরে আওয়ামী লীগ নিজের সাংগঠনিক ভিত অনেক মজবুতও করেছে। বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও এর প্র’ভাব রাখতে পেরেছে দলটি।

*দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরইমধ্যে যে বিষয়টি আলোচ’নার তুঙ্গে সেটি হচ্ছে- কে হচ্ছেন এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। এরইমধ্যে ১৬ জন নৌকা প্রতীক পেতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। সর্বাধিক আলোচ’নায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান, যিনি এর আগেও এই আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয়ার কারণে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্ব’ন্দ্বিতা করতে পারেননি।

*মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে চৌধুরী খালেকুজ্জামান বলেন, একজন সংগঠক হিসেবে দিনরাত দলের জন্য কাজ করেছি। রংপুরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি। নির্বাচনে আমাকে নিয়ে নেতাকর্মীরা যে ভালবাসা আর উদ্দীপনা দেখাচ্ছেন তাতে আমি মুগ্ধ, কৃতজ্ঞ।

*রংপুরে প্রার্থী ঠিক করা নিয়ে শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘রংপুরের উপ-নির্বাচনে এ পর্যন্ত ১৬ জনের মনোনয়নপত্র পেয়েছি। শনিবার মনোনয়ন বোর্ডের সভা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ প্রার্থী নেই। আমাদের নেতাকর্মীর মধ্য থেকেই প্রার্থী ঠিক করব।’

*আওয়ামী লীগের ধানমণ্ডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর-৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়াদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রোজী রহমান, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রেজাউল ইমলাম মিলন, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মজিদ, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোমতাজ উদ্দীন আহমেদ, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য মো. মোসাদ্দেক হোসেন বাবলু, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এটিএম তোহিদুর রহমান টুটুল, রংপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী বিপ্লব, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম রাজু, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সফিউর রহমান, রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি দিলশাদ ইসলাম এবং হাবিবুল হক সরকার।

*১৯৯১ থেকে ২০১৯-সংসদ নির্বাচনে রংপুর আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এর মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০০১-এ আওয়ামী লীগ ওই আসনে তার বিরু’দ্ধে প্রার্থী দিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে রংপুর আসনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সিদ্দিক হোসেন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জয় পান বিএনপির রেজাউল হক সরকার রানা। এরপর থেকেই আসনটি জাতীয় পার্টির দখ’লে। যদিও এর মধ্যে কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের হিসাব-নিকাশে সেখানে প্রার্থী না দিয়ে জাপাকে ছে’ড়ে দিয়েছে।

*উল্লেখ্য, গত ১৪ জুলাই এইচ এম এরশাদ রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃ’ত্যুবরণ করেন। এরপর ১৬ জুলাই তার রংপুর-৩ আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ ৯ সেপ্টেম্বর, যাচাই-বাছাই ১১ সেপ্টেম্বর, মনোনয়ন প্রত্যাহার ১৬ সেপ্টেম্বর এবং ভোটগ্রহণ ৫ অক্টোবর। সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা হবে।
রংপুর-৩ আসনে ১৭৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। মোট ভোটার ৪ লাখ ৪১ হাজার ৬৭১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ১০৯ জন আর মহিলা ভোটার ২ লাখ ২০ হাজার ৫৬২ জন।