প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “লোকেরা যেন না জানে স্ত’ন বলে শরীরে কিছু আছে মে’য়েদের”

“লোকেরা যেন না জানে স্ত’ন বলে শরীরে কিছু আছে মে’য়েদের”

তসলিমা নাসরিন

107
লোকেরা যেন না জানে স্তন বলে শরীরে কিছু আছে মেয়েদের

*বাংলাদেশের লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতি’যোগিতার এক পর্বে একটি মে’য়ে শা’ড়ির ওপর ব্লা’উজ পরেছিল। সাধারণত আজকাল ব্লাউ’জের ওপর শা’ড়ি পরে মে’য়েরা। শা’ড়ির ওপর ব্লা’উজ পরাটা আমার বেশ লেগেছে। আইডিয়াটা একেবারেই নতুন। মে’য়েটির নাকি ফ্যাশন ডিজাইনারের- আইডিয়াটা ঠিক কার মাথা থেকে এসেছে, জানতে ইচ্ছে করেছে খুব। শা’ড়ির ওপর পেটি’কোট পরলেও হয়তো ভালো দেখাবে। অথবা পেটিকো’টটা বু’কের ওপর বেঁ’ধে দিলে! শা’ড়িটাকে স্কা’র্টের মতো পরলে! ব্লা’উজকে বাজুব’ন্ধ বানালে! কতভাবেই তো কাপড়-চোপড় পরা যায়। পেটিকো’ট পরার চলটাই তো নতুন। কুচি কেটে শা’ড়ি পরাটাও খুব পুরোনো নয়।

*এ অঞ্চলে শাড়ি’টাই বা কবে এসেছে! একসময় নারী পুরুষ উভয়েই ধুতি পরতো। দক্ষিণ ভারতে পুরুষের মতো লুঙ্গিও পরতো নারীরা। প্রাচীন ভারতের নারীরা বু’কের ওপর কিছুই পরতো না, অথবা পরলেও সামান্য বক্ষ’বন্ধনী পরতো। কাপড়গুলোয় কোনও সেলাই ছিল না। হিন্দুদের মধ্যে সেলাইবিহীন কাপড় পরার চল ছিল। সেলাই করা কাপড়কে, আমি ঠিক জানি না কী কারণে, অপবি’ত্র বলে ভাবা হত। ধুতি থেকে ধীরে ধীরে শা’ড়ি এসেছে, শা’ড়ির নাম তখন শা’ড়ি ছিল না, ছিল সাত্তিকা। সংস্কৃত শব্দ সাত্তিকা থেকে এলো সাতি, সাতি থেকে সাডি, সাডি থেকে সাড়ি, সা’ড়ি থেকে শা’ড়ি। উড়িষ্যায় ‘মাছের লেজের স্টাইল’ এলো সতেরো শতকে। ‘মাছের লেজের স্টাইল’ এরকম: দুটো পাকে ধুতি দিয়ে পেঁ’চিয়ে মাছের লেজের মতো কাঁধ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া। লেজটা আঁ’চল। মেয়েদের ধুতিটাই ধীরে ধীরে এভাবে মেয়েদের শা’ড়িতে রূপান্তরিত হয়।

*ইংরেজ আসার পর ব্লাউজ পেটি’কোট পরা শুরু হয়েছে। মুসলমানেরা ঘাগড়া নিয়ে এসেছিল। সেই ঘাগড়া দেখেই পেটিকোট সেলাইয়ের শুরু। ভারতবর্ষের শা’ড়ির ইতিহাসই আমাদের শা’ড়ির ইতিহাস। হিন্দুরাই আমাদের পূর্বপুরুষ এবং পূর্বনারী। আমরা তো বাঙালি জাতি হিসেবে একাত্তর সালে জন্ম নিইনি। বাঙালি হাজার বছরের পুরোনো জাতি। শা’ড়ির বিবর্তনের ইতিহাস যারা জানে, তারা শা’ড়ির যে কোনও বিবর্তনই গ্রহণ করতে অসু’বিধে বোধ করবে না। আমাদের পূর্বনারীদেরও পূর্বনারীরা ন্যাং’টো থাকতো, গাছের বাকল পরতো, জন্তুর চামড়া পরতো, তারপর শুরু করল কাপড় পরা। আমরা এ যুগের নারীরা ব্লাউ’জের ওপর আঁচল ব্যবহার করছি। আজকের স্টাইল যে বাকি জীবনের জন্য স্থির হয়ে গিয়েছে, তা নয়। এই স্টাই’লটাও একসময় বিদেয় হবে, নতুন কোনও স্টা’ইল আসবে।

*মানুষ চিরকালই নানান ক্ষেত্রে নতুন আইডিয়া নিয়ে আসে। শা’ড়ির ওপর ব্লাউ’জ পরেছে মেয়ে, পরুক। তোমার পছন্দ না হলে পরো না। যেমন আমি পরবো না। খুব স্লিম হলে হয়তো পরতাম। আমি কখনও চলতি কোনও ফ্যাশন মেনে চলি না। আমার ফ্যাশনের নাম, ‘যখন যা খুশি’। ক্যাজুয়ালের চূড়ান্ত। কাপড় চোপড় আমি ইস্ত্রি করি না বললেই চলে। হাতের কাছে যা পাই তাই পরি। শার্ট প্যান্ট, শর্টস টি-শার্ট, অথবা শাড়ি। মূলত সুতি শাড়ি। আজকাল আর সালোয়ার কামিজ পরি না, ছোট বড় কোনও স্কা’র্টও পরি না। মেয়ে’লি জিনিস পরতে ভালো লাগে না। শা’ড়িকে আমার একেবারই মেয়ে’লি বলে মনে হয় না। তার চেয়ে বেশি মে’য়েলি লাগে সালোয়ার কামিজ আর স্কার্ট, ঘাগড়া লেহেংগাগুলোকে। শা’ড়ি কিন্তু আমার হাঁটা চলাকে ধীর করে না, শার্ট প্যান্টজুতো পরে যেভাবে দ্রুত হাঁটি, শা’ড়ি পরেও। শা’ড়ি মে’য়েলি? ধুতি পরা পুরুষগুলোকে কি মেয়ে’লি দেখতে লাগে? পুরুষালি, মে’য়েলি- এই ধারণাগুলো বদলোকের বানানো।

*শা’ড়ির মতো পোশাক পরা প্রাচীন গ্রিসের ওই ব্যক্তিত্বশালী রাজাদের কি আদৌ মেয়ে’লি বলে মনে হয়? আজ থেকে পুরুষরা যদি শা’ড়ি পরা শুরু করে, আর মেয়েরা শার্টপ্যান্ট, তাহলে খুব বেশি দিন পার হবে না, যখন মানুষ বলতে শুরু করবে শা’ড়ি খুব পুরুষালি পোশাক, আর শার্টপ্যান্ট মে’য়েলি। পুরুষালি আর মেয়ে’লিতে কিন্তু অসুবিধে নেই। অসুবিধে তখনই, যখন পুরুষালি কিছুকে মে’য়েলি কিছুর চেয়ে সুপিরিওর বলে মনে করা হয়।

*কোনও পোশাকই অশ্লী’ল নয়। আবার পোশাক’হীনতাও অশ্লী’ল নয়। আমাজনের জঙ্গলে বা আন্দামান দ্বীপে আদিবাসীরা যখন উল’ঙ্গ ঘোরা’ফেরা করে, ওদের কি অশ্লী’ল দেখায়? অশ্লী’লতার সংজ্ঞা আমরা তৈরি করেছি। সংজ্ঞাটা অশ্লী’ল। মানুষের কুৎ’সিত মনটা অশ্লী’ল। যে মনটা ভাবে, যে মেয়েরা পুরুষের পছন্দমতো পোশাক পরে না, সেই মেয়েরা চরি’ত্রহীনা, সেই মনটা অশ্লী’ল। যে মনটা ভাবে স্ব’ল্প কোনও পোশাক পরা মানে ধর্ষি’তা হওয়ার জন্য মেয়েদের সম্মতি দেওয়া, সেই মনটা অশ্লী’ল। যে মনটা ভাবে পুরুষ যা খুশি পরুক, মেয়েরা যেন যা খুশি না পরে, সেই মনটা অশ্লী’ল। যে মনটা ভাবে মেয়েরা যৌ’ন বস্তু, কিন্তু পুরুষ যৌ’ন বস্তু নয়, সুতরাং মেয়েরা কী পরবে না পরবে সেই সিদ্ধা’ন্ত পুরুষ নেবে, সেই মনটা অশ্লী’ল।

*কাপড় পরা মানুষদের মধ্যে একজন যদি কাপড় খু’লে দাঁড়ায় তাকে খুব অশ্লী’ল দেখাবে, এ কথা সবাই জানে। আবার কাপড়ও কিন্তু কখনও কখনও বড় অশ্লী’লতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক বছর আগের এক গ্রীষ্মকাল আমি বার্লিনে কাটিয়েছি। কোনও এক বিকেলে বাড়ির খুব দূরে নয় এমন এক ঝিলে সাঁতার কাটার উদ্দেশে হাঁটতে হাঁটতে ঝিলের পাড় ঘেঁষা মাঠে গিয়ে চ’মকে উঠেছিলাম, রাস্তার কিনারেই সেই খোলা মাঠ, আর মাঠ জুড়ে শত শত উ’লঙ্গ, সম্পূর্ণ উল’ঙ্গ, নারী পুরুষ-কিশোরী কিশোরী আর শিশু শুয়ে আছে, বসে আছে। সবাই রোদ তাপাচ্ছে, আর ক্ষণে ক্ষণে উঠে ঝিলের জলে সাঁতার কেটে আসছে। সারা দিনের খাবার আর জলটল সঙ্গে এনেছে। ওখানেই সপরিবার খাচ্ছে।

*আমি সবার মাঝখানে, গায়ে প্রচুর কাপড় আমার। আমার দিকে সবাই বিস্মি’ত চোখে তাকাচ্ছে। অনেকটা কৌতুকের চোখেও। কিছু চোখে প্রচ্ছন্ন বি’রক্তি। আমাকে, সত্যি বলতে কী, আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম, অশ্লী’ল দেখাচ্ছে। শরীরে কাপড় থাকার ল’জ্জায় আমি মাথা নিচু করে রইলাম। উল’ঙ্গ মেয়েরা যেমন ল’জ্জায় দুহাতে বু’ক আ’ড়াল করে, সেরকম আমিও কাপড়ের ল’জ্জায় দুহাতে কাপড় আ’ড়াল করতে চাইছিলাম। অগত্যা এক এক করে কাপড় খু’লে ফেললাম, কিন্তু জনসমক্ষে আন্ডা’রওয়ারগুলো অনেকবার খু’লতে চেষ্টা করেও খু’লতে পারিনি। কোথাকার এক আড়ষ্টতা আমাকে শামুক বানিয়ে রেখেছিল। এরকম নয় যে ওই মাঠে আমার চেনা কেউ ছিল। এক মাঠ অচেনা উ’লঙ্গ মানুষের সামনেও আমি উ’লঙ্গ হতে পারিনি। ভেবেছিলাম আমিও রোদ তাপাবো, সাঁতার কাটবো। কিন্তু সম্পূর্ণ উ’লঙ্গ হতে না পারার ল’জ্জায় শেষ পর্যন্ত ওই মাঠ থেকে সরে যেতে আমি বা’ধ্য হয়েছিলাম। শত শত উ’লঙ্গ নারী পুরুষকে সেদিন একফোঁটা অ’শ্লীল লাগেনি, আমাকে বরং অশ্লী’ল লেগেছিল। অশ্লী’লতাবোধটা মান’সিক। এর সঙ্গে পোশাকের কোনও সম্পর্ক নেই। গায়ে পোশাক থাকলেও অশ্লী’লবোধ হতে পারে, না থাকলেও অশ্লী’লবোধ হতে পারে।

*ব্যক্তিগতভাবে কোনও পোশাককে আমি অশ্লী’ল বলে মনে করি না। তবে অশ্লী’লতা দূর করতে যে পোশাকগুলো বানানো হয়েছে, এবং মেয়েদের গায়ে চা’পানো হয়েছে, মেয়েদের স্বাধীনতা আর স্বতঃস্ফূর্ততাকে কবর দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই পোশাকগুলোকে বরং আমার ভী’ষণ অ’শ্লীল বলে মনে হয়।

*মাঝে মাঝে, আমি বুঝি না, মেয়েদের বু’ক কেন ঢেকে রাখতে হবে নানারকম কাপড় দিয়ে। ব্রা পরো, তার ওপর ব্লাউ’জ পরো, তার ওপর শা’ড়ি পরো, অথবা জামা পরো, তার ওপর ওড়না পরো বা তার ওপর চাদর পরো। লোকেরা যেন না জানে স্ত’ন বলে শরীরে কিছু আছে মেয়েদের। যদি বাইরে থেকে বোঝা যায় স্ত’ন বলে কিছু আছে, তবে সর্বনা’শটা কেন হবে। অসম’কামী পুরুষের যৌ’ন কা’মনা জাগবে। তা জাগুক। জা’গাটাই তো স্বাভাবিক। ঠিক যেমন স্বাভাবিক, পুরুষদের দেখে নারীর যৌ’নকামনা জা’গা!

*বাংলাদেশের সমাজ এখনও অন্ধকারে। বড় বড় অট্টালিকা, দামি দামি গাড়ি, উঁচু উঁচু শপিং সেন্টার- কিছুরই অভাব নেই, সুস্থ মানসিকতারই শুধু অভাব। তাই কোনও মেয়ে শাড়ির ওপর ব্লা’উজ পরলে বিরাট বি’তর্ক শুরু হয়। অনেক স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে দেশে, কিন্তু খুব কম মানুষই ও দেশে ‘শিক্ষিত’।

*কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না যে সভ্য হওয়ার জন্য আমরা কিছু নিয়ম তৈরি করেছি, যেমন: তোমার যৌ’নকামনা জাগলেই তুমি কারও ওপর ঝাঁ’পিয়ে পড়তে পারো না, যৌ’নকর্ম করার জন্য তোমাকে তার সম্মতি পেতে হবে আগে। এই নিয়মটি পালন না করে মেয়েদের কিনা ব’ন্দী করা পোশাক পরানো হচ্ছে। তাদেরকে সমাজ থেকে ব্ল্যা’কআউট করা হচ্ছে। জলজ্যা’ন্ত মানুষগুলোকে এক একটা আস্ত কারা’গার বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে পুরুষের যৌ’ন কাম’না জা’গে, বোরখা পরা মেয়ে দেখলেও তার যৌ’ন কাম’না জা’গে। আর যার জাগে না, তার উ’লঙ্গ মেয়ে দেখলেও জা’গে না।

*সভ্য মানুষেরা জানে কী করে নি’য়ন্ত্রণ করতে হয় কা’মনা। অস’ভ্যরা যারা জানে না, তাদের সভ্য করার ব্যবস্থা হোক। মেয়েদের গায়ে বন্দী’দশার পোশাক চাপালে, অসভ্যকে সভ্য করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আজকাল মানুষ ডিগ্রিধারী অশি’ক্ষিত বনে, নয়তো মৌল’বাদী আর সন্ত্রা’সী বনে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কাউকে সত্যিকার শিক্ষিত করে না। ‘শিক্ষিত’ হতে হয় নিজের চেষ্টায়, নিজের বুদ্ধিতে।

*আমরা এই মহাশূন্যে ভাসতে থাকা কোটি কোটি গ্রহের মধ্যে একটি অতিক্ষুদ্র গ্রহে জন্ম নিয়েছি। কোটি কোটি বছর ধরে এককোষী প্রাণীর বিবর্তন ঘটতে ঘটতে মানুষ নামক প্রাণীর ঘটনা ঘটেছে। কোনও একদিন আমরাও কোটি কোটি প্রাণীর মতোই বি’লুপ্ত হয়ে যাবো। আমাদের এবং আমাদের পোশাক নিয়ে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের কোনও মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা শুধু নারী-বিদ্বে’ষী কিছু নি’কৃষ্ট মানুষের। মেয়েদের শরীরে অ’শ্লীল লোকেরা কেবল অশ্লী’লতা আবিষ্কার করে। মেয়েদের হাসিতে, মেয়েদের কথা বলায়, মেয়েদের হাঁটাচলায়, মেয়েদের ব্যবহারে অশ্লী’লতা আবিষ্কার করার লোক কি’লবিল করছে সমাজে। এই লোকগুলো নিঃস’ন্দেহে অ’শ্লীল। অশ্লী’লতা নি’ষিদ্ধ হোক আমি চাই। অ’শ্লীল লোকগুলোর অ’শ্লীল মন মানসি’কতা নি’ষিদ্ধ হোক চাই। নোং’রামো দূ’র হোক চাই। মেয়েদের স্বাধীনতা আর অধিকারের বিরু’দ্ধে কুৎ’সিত ষড়’যন্ত্র চিরকালের জন্য দূ’র হোক চাই।

তসলিমা নাসরিন: নির্বাসিত লেখিকা।