প্রচ্ছদ জীবন-যাপন “মুফতি তাহেরীর বিত’র্কিত ক’র্মকাণ্ড”

“মুফতি তাহেরীর বিত’র্কিত ক’র্মকাণ্ড”

75

*ওয়াজ মাহফিলের নামে মুফতি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তাহেরী কোনো ভু’ল বার্তা দিচ্ছেন, নাকি বুঝে বা না বুঝে ধৃ’ষ্টতা দেখাচ্ছেন, এমন প্রশ্ন উঠেছে জো’রালোভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানারকম সমালো’চনায় বি’দ্ধ করা হচ্ছে তাকে। ভাইরা’ল হয়েছে তার ওয়াজের কয়েকটি ভিডিও। ইউটিউবেও তার ওয়াজের ভিডিও দেখছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ।

*তাহেরীকে নিয়ে সবার মধ্যেই জেগেছে এক ধরনের কৌ’তূহল- কে এই ইসলামিক বক্তা, কী তার পরিচয়; ধর্মের নামে তিনি যা করছেন প্রকৃতপক্ষে তা সাংঘ’র্ষিক কি-না- এমন প্রশ্ন রয়েছে অনেকের। ভাই’রাল হওয়া তার ভিডিও পর্যালোচনা করে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, ওয়াজ মাহফিলের নামে সমাজে বিষ’বাক্য ছড়া’চ্ছেন না তো তাহেরী!

*দাওয়াতে ঈমানী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাহেরীর বি’রুদ্ধে ধর্মীয় অ’নুভূতি ও মূল্যবোধের ওপর আঘাত সৃষ্টির অভিযোগে মামলার আবেদন করা হয়েছে গত রোববার। বাংলাদেশ সাইবার ট্রা’ইব্যুনাল আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালতে এ মাম’লার আবেদন করেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী সদস্য মো. ইব্রাহিম খলিল। মামলার বাদী ইব্রাহিম খলিল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তাহেরীর বি’রুদ্ধে পিটিশন মাম’লার আবেদন জমা দিয়েছি। ইসলাম ধর্মে ওয়াজ মাহফিলের মধ্যে নাচ-গান সমর্থন করে না। কিন্তু গিয়াস উদ্দিন তাহেরী তার মাহফিলে এমনটাই করছেন। ওয়াজ মাহফিলের নামে অশ্লী’লতা ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ইব্রাহিম খলিল।

*তাহেরীর ভাইরাল হওয়ার অন্যতম আলোচিত ভিডিও ‘ঢেলে দিই’? এক অনুষ্ঠানে ওয়াজ করার ফাঁ’কে চায়ে চুমুক দেন তিনি। এ সময় সামনে উপবিষ্ট দর্শক-শ্রোতাদের লক্ষ করে বলেন, ‘চা খাবেন? ঢে’লে দিই?’ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঢে’লে দেওয়ার ভঙ্গিও করেন তিনি। ‘চা খাব? খাই একটু? আপনারা খাবেন? ঢে’লে দিই?’ তাহেরীর এমন মন্তব্য হা’স্যরসের পাশাপাশি বি’ক্ষুব্ধ করেছে সাধারণ মানুষকে। দেশের ধর্মানুরাগী মানুষ ইমাম, মুফতি, মাওলানাদের বরাবরই সম্মান দেখিয়ে থাকে। তারা সাধারণের সঙ্গে ম’শকরা করবেন কিংবা উদ্ভ’ট পরি’স্থিতির সৃষ্টি করবেন- এমনটি কেউ প্রত্যাশা করে না। সাধারণ মানুষের ক্ষু’ব্ধ হওয়ার যৌ’ক্তিক কারণও রয়েছে। এক কাপ চা কতজন মানুষকে ‘ঢে’লে’ দিতে পারবেন তাহেরী? ইয়ার-দোস্তরা অনেক সময়ই এক কাপ চা দু’জনে ভাগ করে খায়, তাই বলে একজন ইসলামিক বক্তা কীভাবে ওয়াজ শুনতে আসা অসংখ্য মানুষকে বলতে পারেন ‘ঢে’লে দিই’? তার সঙ্গে দর্শক-শ্রোতাদের ঠা’ট্টা-মশ’করার সম্পর্কও নেই।

*তাহেরীর বিত’র্কিত আরও মন্তব্যের মধ্যে রয়েছে- ‘ভাই, পরিবেশটা সুন্দর না, কোনো হৈ চৈ আছে?’ আরেকটি বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘বসেন, বসেন, বইসা যান।’ গত বছর তার এমন বক্তব্য ফেসবুকে ব্যাপক আকারে ভাইরা’ল হয়। তার বলার মধ্যে ইয়া’র্কির সুর ব্য’থিত করেছে অনেককেই। ওয়াজ মাহফিলে আয়োজিত জিকির অনুষ্ঠানে ওই শব্দগুলো সুর করে বলেন তাহেরী।

*আরেক ওয়াজে তাহেরী বলেন, ‘তাহেরীর মুখ দিয়া যেইডা বাইর হয় হেইডই মার্কেট পায়। চিল্লাইয়া মার্কেট পাওন যাইব?’
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে যেমন নিজেকে তুলে ধরেছেন অন্যদিকে অন্যান্য ইসলামিক বক্তাকে কৌশলে হে’য় প্রতি’পন্ন করেছেন। তারা ওয়াজ মাহফিলের নামে ‘চিৎ’কার চেঁচা’মেচি’ করেন এমন ইঙ্গি’ত ছিল তাহেরীর সুরে।

*তার আরেকটি মন্তব্য হচ্ছে- ‘আমি কি কাউকে গা’লি দিয়েছি? কাহারো বি’রুদ্ধে বলতেছি? এরপর দেখবেন সকালে একদল লোকে বলবে তাহেরী ভালা না। আমিও বলি আমি তো ভালা না, ভালা লইয়াই থাইকো। কথা কি ক্লিয়ার না ভেজাল আছে?’
তার আরও দুটি মন্তব্য হচ্ছে- ‘বুঝলে বুঝপাতা না বুঝলে তেজপাতা!’; ‘শরীলে একটা ভাব আইসে না?’

*পৃথক ওয়াজে তাহেরী বলেন, ‘মাঝে মাঝে ডাইনে বামে না কইলে ঘুম আইয়া পড়ে। এক ব্যাটা সেদিন আমারে কইতাছে, হুজুর বিড়ি খাওয়ার দোয়া কোনডা? আমি কই, জীবনে কত দোয়া পড়ছি বাবা বিড়ি খাওয়ার দোয়া তো পাইছি না। হে কয় আল্লাহুম্মা বারেকলানা ফি মা বিড়িটানা। এইডা বলে বিড়ি খাওয়ার দোয়া। পাবলিক এহন মারা’ত্মক, বাংলা ইংলিশ মিলাইয়া দোয়া বানাইয়া লয়।

*এক ওয়াজে দর্শক-শ্রোতারা নিজেদের আসনে বসেই চি’ৎকার করে তাহেরীর প্রশংসা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘পাম দিস না, পাম দিস না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যা তোরা যত গা’লি দেস আমার অসু’বিধা নাই। আমার মন জানে আমি আসলে কী চাই।’
বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তাহেরী নাচ-গানের পাশাপাশি অশ্লী’ল অ’ঙ্গভঙ্গিও করেন। যা ধর্মীয় ভা’বগাম্ভীর্যের সঙ্গে খা’প খা’য় না।

*গত রোববার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মা’মলার আরজিতে ইব্রাহিম খলিল উল্লেখ করেন, আসা’মি একজন ভ’ণ্ড। তিনি নিজেকে মুফতি দাবি করলেও ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞান নিয়ে স’ন্দেহ আছে। ওয়াজ-মাহফিলে আসামি ভক্তদের নিয়ে নেচে গান গাওয়া শুরু করেন। ইসলাম ধর্মের পথপ্রদর্শক হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর আদর্শ ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ওয়াজ মাহফিলের মধ্যে নাচ-গান সমর্থন করে না। ইসলামের রীতিনীতি অনুযায়ী আসা’মির কর্ম’কাণ্ড মোনা’ফেকির শামি’ল। এক ব্যক্তির উক্তি দিয়ে তার বিড়ি খাওয়ার দোয়াটিও ইসলামের কোথাও নেই। তার এসব বক্তব্যে ইসলাম ধর্মকে ব্য’ঙ্গ ও অব’মাননা করা হয়েছে।

*ওয়াজ মাহফিলে নাচ ও গানের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মুফতি তাহেরী সাংবাদিকদের বলেন, এটা গান না। এগুলো করে আমি পোলাপাইনদের কৌ’শলে লাইনে আনি।
বিতর্কিত ধর্মীয় বক্তা তাহেরী আগে থেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজর’দারিতে ছিলেন। চলতি বছরের প্রথম দিকে যে কয়েকজন ধর্মীয় বক্তার বি’রুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স’তর্ক করা হয় তাদের মাঝে তাহেরীও ছিলেন।

*জানা যায়, তাহেরী নরসিংদীর রায়পুরার মাস্তানগঞ্জ নামক একটি মহল্লায় খাজা বাবার দরবার নাম দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি আ’স্তানা গড়ে তুলেছেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চাপাইর গ্রাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে ফাজিল ও কামিল পাস করেন। তাহেরীর বাবার নাম মাওলানা নজিবউদ্দিন। বাবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক। মা মোহছেনা বেগম গৃহিণী। পারিবারিক জীবনে তাহেরী দুই সন্তানের জনক। তার ৩ মাস বয়সী ছেলে ও ৫ বছর বয়সী একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। ছেলের নাম তাওফিক রেজা ও মেয়ের নাম তাবাসসুম। সন্তানদের তিনি হাফেজ বানাতে চান।

*প্রসঙ্গত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ৬ সুপারিশ হচ্ছে- ১. ওয়াজি হুজুররা যেন বাস্তবধর্মী ও ইসলামের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সঙ্গ’তিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন, সেজন্য তাদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বু’দ্ধকরণের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি পুলিশের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ।
২. যারা ওয়াজের নামে হাস্য’কর ও বি’তর্কিত বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ন’ষ্ট করার চেষ্টা চালান, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রো-অ্যাকটিভ উ’দ্বুদ্ধকরণ।

*৩. অনেক আলেমের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির মতো উচ্চশিক্ষা ব্যতীত যারা ওয়াজ করেন, তারাই জ’ঙ্গিবাদ ও বিভ্রা’ন্তি ছড়া’চ্ছেন। তাই মাদ্রাসায় উচ্চ শিক্ষিত ওয়াজকারীদের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা।
৪. অনেকেই আছেন, যারা হেলিকপ্টারযোগে ওয়াজ মাহফিলে যোগ দেন এবং ঘণ্টাচুক্তিতে বক্তব্য দিয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। তারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করেন কি-না, তা নজ’রদারির জন্য আয়কর বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মতৎ’পরতা বৃ’দ্ধি করা।

*৫. ওয়াজি হুজুরদের বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক সংরক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য বিশেষ ব্য’বস্থা নেওয়া এবং উ’স্কানিমূলক ও বিদ্বে’ষ ছড়া’নোর বক্তব্য দিলে তাদের সতর্ক করা। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে তাদের ওয়াজ করার অনুমতি না দেওয়া।
৬. সাম্প্র’দায়িক সম্প্রীতি ন’ষ্ট করা ও রাষ্ট্রবি’রোধী বক্তব্য প্রদা’নকারীদের আইনের আ’ওতায় আনা।

ভিডিও: