প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য “কখনো ক’লংকমুক্ত হতে পারবে না বিএনপি”

“কখনো ক’লংকমুক্ত হতে পারবে না বিএনপি”

271

*বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অধীনে ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বিএনপি গড়ে তুলেছিলেন। আজ দলটির ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি একজন সৈ’নিক।… রাজনীতির সাথে আমার কোন স’ম্পর্ক নেই এবং আমাদের সরকার সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক।’

*এরপর ১৯৭৬ সালের মে মাসে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমি একজন শ্রমিক।’
একজন ‘শ্রমিক’ ও ‘সৈ’নিক’ কিভাবে একের পর এক সিঁড়ি পেরিয়ে ক্ষ’মতার শীর্ষে চলে যেতে পারেন, তার একটা চিত্রনাট্য আগেই লিখে রেখেছিলেন পাকিস্তানের সে’নাপতি আইয়ুব খান। জেনারেল জিয়া এ চিত্রনাট্য ধরেই এ’গুতে থাকেন এবং অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছে যান। মোটা দাগে বিএনপির সমা’লোচনা কখনো শেষ হবে না। যে দা’য় কখনো এড়াতে পারবে না। জামাত যেভাবে যু’দ্ধাপরাধের দায়ে অভি’যুক্ত তেমনি বিএনপিরও আছে একাধিক ক’লংক।

*জাতির পিতার হ’ত্যার সঙ্গে যেভাবে জিয়া জ’ড়িত: জেনারেল জিয়াউর রহমান যে বঙ্গবন্ধু হ’ত্যা চ’ক্রান্তের বি’ষয়ে জ্ঞা’ত ছিলেন তা সম্ভবত প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত বা প্রচারিত হয় ১৯৭৬ সনে বিলাতের আইটিভি চ্যানেলের World in Action প্রোগ্রামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসকে দেওয়া লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান এবং লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আব্দুর রশীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। এই সাক্ষাৎকারে ফারুক-রশীদ দাবি করে- যে বঙ্গবন্ধু হ’ত্যা চক্রা’ন্তের বিষয়ে ১৫ অগাস্টের বহু পূর্বেই জিয়াকে তারা অবহিত করে। ফারুক জানায়, “২০ শে মার্চ ১৯৭৫ সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটের দিকে সে জিয়ার বাসায় জিয়ার সাথে দেখা করে এবং তাকে বলে- The country required a change।

*উত্তরে জিয়া বলেন, “Yes, yes, lets go outside and talk”। তখন জিয়া ফারুককে নিয়ে বাইরে বাড়ির লনে যায়। সেখানে ফারুক পুনরায় বলে, “We have to have a change. We, the junior officers, have already worked it out. We want your support and leadership”। জিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট।
জিয়া বলে, “If you want to do something, you junior officers should do it yourself …” (Anthony Mascarenhas, Bangladesh – A Legacy of Blood, page 54, Hodder and Stroughton, London, 1986)

*জিয়ার সাথে ফারুক-রশিদের সাক্ষাৎ এবং আলোচনা যে আরও অনেকবার হয়েছে তার প্রমাণ মেলে রশীদের স্ত্রী জোবায়দা রশীদের বক্তব্য থেকে। তিনি বলেন, ‘একদিন রাতে ফারুক জিয়ার বাসা থেকে ফিরে আমার স্বামীকে (রশীদ) জানায় যে, সরকার পরিবর্তন হলে জিয়া প্রেসিডেন্ট হতে চায়। শুধু তাই নয়। জিয়া আরও বলে- If it is a success then come to me. If it is a failure then do not involve me.”

*একইভাবে, জিয়া বঙ্গবন্ধু হ’ত্যা চ’ক্রান্তের বিষয়ে অবহিত ছিলেন, কি ছিলেন না, তা বোঝার চে’ষ্টা করা যেতে পারে বঙ্গবন্ধু হ’ত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘন্টা পর কর্নেল শাফায়েত জামিল এবং জিয়ার কথোপকথন থেকে। তবে বিষয়টা বুঝতে হবে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই সকালে শাফায়েত জামিল জিয়ার সাথে দেখা করতে গেলে তাকে শেইভ করতে দেখেন। জামিল জিয়াকে বলেন, “The President has been killed, Sir. What are your orders?
উত্তরে জিয়া বলে, “If the President is no longer there, then the Vice President is there. Go to your headquarters and wait there”।

*তখন জামিলের দৃষ্টিতে জিয়াকে অনেক শান্ত দেখায়, “Evidently aware of what had happened” (Anthony Mascarenhas, Bangladesh– A Legacy of Blood, page 76, 1986)।
উপরের বিশ্লেষণ থেকে কয়েকটি বিষয় এখানে পরিষ্কার– বঙ্গবন্ধু হ’ত্যা চ’ক্রান্তের বিষয়ে জিয়া পূর্বেই অবহিত ছিল; চ’ক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা নেয়নি, বরঞ্চ চ’ক্রান্তকারীদের উৎসা’হিত করেছেন এবং সেই সাথে, আসন্ন পরিস্থি’তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লা’ভবান হওয়ার ই’চ্ছা পো’ষণ করেন।

*জিয়ার ক্ষ’মতা দ’খল, বিচা’র না করা: জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের হ’ত্যাকারীদের বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে চাকরি এবং তাঁদের পদো’ন্নতির ব্য’বস্থা করেছিলেন। বিভিন্ন ষ’ড়যন্ত্রমূলক ক’র্মকাণ্ড এবং দেশের ভেতরে অভ্যু’ত্থানের চে’ষ্টার সঙ্গে তাঁদের স’ম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তাঁদের বি’রুদ্ধে কোনো ব্য’বস্থা নেওয়া হয়নি।

*ক্ষমতায় এসে পাকিস্তান প্রেম: জিয়াউর রহমান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হলে দালাল আইন বা’তিল ও রাজা’কারদের পুনর্বাসন করতেন না। ১৯৭২ সালে লন্ডনে পা’লিয়ে গি’য়ে গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতি করার সুযোগ দিতেন না। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হলে তিনি কু’খ্যাত রাজা’কার শাহ্ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী ও আবদুল আলিমকে রেলমন্ত্রী করতেন না। আর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘো’ষণার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে নি’ষিদ্ধ করতেন না।

*সে’নাবাহিনীর একদল অফিসার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মকা’ণ্ডে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এজন্যই জিয়াকে হ’ত্যা করা হয়। তারা মনে করছিলেন, যে সব অফিসার এবং সৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আট’কা ছিলেন বা বাংলাদেশে আসতে অপা’রগ ছিলেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সে’নাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, জিয়াউর রহমান তাদের প্রতি বেশি সহানু’ভূতিশীল এবং তাদেরকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন। জিয়াউর রহমান ক্ষ’মতায় বসে পাকিস্তানের সঙ্গে স’ম্পর্ক গ’ড়েছিলেন।

*খালেদা হেঁটেছেন স্বামীর পথেই: খালেদা জিয়ার শাসনামলেও জাতির পিতার খু’নিচক্রের প্রধান রশিদকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটা’রবিহীন তথাকথিত নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির প্রার্থী হিসেবে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত করা হয়। বিরোধী দলের আসনে বসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সে সময় ফারুক-রশিদ ঢাকায় নানা ধরনের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন। এবং একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। অন্যদের মধ্যে ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী প্রমুখ খালেদা জিয়ার শাসনামলে (১৯৯১-৯৬) কেনিয়া, হংকং ও ব্রাজিলে রাষ্ট্রদূত বা কনসাল জেনারেল পদে নিযুক্ত ছিলেন।

*খু’নি চ’ক্রের এসব ক’র্মকাণ্ড থেকে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি জিয়া ও বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের সময় দেশে-বিদেশে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংসদ সদস্য হওয়া এবং স’ন্ত্রাসী কর্ম’কাণ্ডসহ সব কার্যক্রমের প্রকাশ্য সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর খু’নি চ’ক্র।

*যুদ্ধা’পরাধীদের ছায়াতলে বিএনপির আশ্র’য়: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘হরিহর আত্মা` হিসেবে অনেকের কাছে পরিচিত বিএনপি ও তার জোটসঙ্গী যু’দ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত জামায়াতে ইসলামী। বিশ বছর ধরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকা জামায়াত খালেদা জিয়ার মুক্তি দা’বিতে চলমান আন্দো’লন থেকেও দূরে রয়েছে। তবে বিএনপি বরাবরই জামাতের সাপো’র্ট টে’নেছে। এমনকি যুদ্ধা’পরাধের বিচারেও বিএনপি জামাতের হাত ছা’ড়েনি।

*স্বাধীতার ঘোষ’ক: ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাধীনতার ঘোষ’ণা প্রসঙ্গে স্বাধীনতা ঘোষ’ণার অনেক পরে বিত’র্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। জেনারেল জিয়া অবৈ’ধভাবে ক্ষ’মতা দ’খল করলেও নিজেকে কখনো স্বাধীনতার ঘো’ষক বলে দাবি করেননি। বরং বিচিত্রা পত্রিকায় এক নিবন্ধে তিনি লিখে গেছেন যে, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘো’ষণা অর্থাৎ ৭ই মার্চের বক্তব্য শোনার পর পরই তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উ’দ্বুদ্ধ হন।

*বয়োবৃদ্ধ বিএনপির যেসব বুদ্ধিজীবী বেগম জিয়ার শাসন আমলে, বেগম জিয়ার সরকারকে স্বাধীনতার ঘো’ষক হিসেবে মেজর জিয়াকে গ্রহণ করার দা’বি জানান সেই সব জ্ঞা’নপাপী বুদ্ধিজীবীদের ধারণা ছিল যে, ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপের মুখে জি’য়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার যে ঘো’ষণা দিয়েছিলেন, তাকেই স্বাধীনতার মূল ঘো’ষণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হিসেবে বিএনপি নেতা জিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

*তারেকের বেপরোয়া দুর্নীতি: বিএনপির রাজনীতিতে যখন তারেক রহমান নাম লিখিয়েছিলেন সেই ২০০১এর নির্বাচনের সময়, তখন দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ খুব আশান্বিত হয়েছিল। বিশেষ করে তাদের কেউ কেউ রাজনীতিতে তরুণ নেতার আগম’ন স্বাগত জানিয়েছিল এই ভেবে যে, অন্তত দুর্নীতির অভি’যোগমুক্ত একজন তরুণ ক্ষম’তাসীন দলের হা’ল ধ’রতে যাচ্ছেন।

*২০০১-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পরপরই তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে ওঠে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। দুর্নীতির আখড়া হিসেবেও দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিত লাভ করে ভবনটি। ইতিহাসের জ’ঘন্যতম হ’ত্যাকাণ্ড, ২১ আগস্টের গ্রে’নেড হা’মলার পরিকল্পনার ছ’ক আঁ’কা হয় এই ভবনে। সে অনুযায়ী খু’নিদের গ্রে’নেড সরব’রাহ এবং তাদের জন্য পাসপোর্ট তৈরি করিয়ে বিমানবন্দর দিয়ে পালি’য়ে যাওয়ার ব্য’বস্থাও করা হয়েছিল হাওয়া ভবনে বসেই। তারেক রহমান সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত বিষয় এবং রাজনৈতিক পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে য’ত্রতত্র ঘু’ষ চাওয়ার জন্য কু’খ্যাত। দুর্নীতিপ্রবণ সরকার এবং বাংলাদেশের স’হিংস রাজনীতির এক দৃষ্টা’ন্ত তিনি।

*২১ আগস্ট গ্রে’নেড হা’মলা: বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত নৃ’শংস স’হিংসতার যেসব ঘ’টনা ঘ’টেছে, ২১ আগস্টের গ্রে’নেড হা’মলার ঘ’টনা তার একটি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়া’বহ গ্রে’নেড হা’মলায় বিএনপি-জামায়াত সরকার জ’ড়িত ছিল যা প্রমাণিত। আক্রমণের লক্ষ্যটি সহজ ছিল শেখ হাসিনাকে হ’ত্যা করে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নি’র্মূল করা। এটি বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে ন্যাক্কা’রজনক সন্ত্রা’সী হা’মলার একটি ছিল। এটি ছিল সবচেয়ে ভ’য়ঙ্কর সন্ত্রা’সী হা’মলা, কারণ এটি রাষ্ট্রীয় মদ’দপুষ্ট ছিল এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের নি’র্মূল করার জন্যই এই হা’মলা চা’লানো হয়।

*সংক্ষেপে বলা যায়, হা’মলাটি চালা’য় হরকাতুল জিহাদ নামে একটি জ’ঙ্গি সংগঠন (হুজি)। এরসাথে বিএনপি’র তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি’র উপ-শিক্ষামন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, জামায়াতে ইসলামের সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিস চৌধুরী, গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং আইন প্রণয়নকারীরাও স’ন্ত্রাসী হাম’লার সাথে জ’ড়িত ছিলো।