প্রচ্ছদ অর্থ-বাণিজ্য “পরিবেশ নেই, অর্ধেক কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ”

“পরিবেশ নেই, অর্ধেক কমেছে বিদেশি বিনিয়োগ”

25

*এক বছরের ব্যবধানে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের ছন্দপ’তন ঘটেছে। পাশাপাশি অর্ধেকে নেমেছে দেশি বিনিয়োগও। এই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রস্তাবিত বা সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ধ’স নেমেছে। অথচ জাতিসংঘের শিল্প-বাণিজ্য সংস্থা আঙ্কটাডের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে ছিল। সে বছর বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১ হাজার ৩১ কোটি মার্কিন ডলার। আর সদ্য বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫২৫ কোটি মার্কিন ডলার।

*যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। অবশ্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার যে কারণ ছিল তা হলো- ঢাকা টোব্যাকোর শেয়ার প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন (১৫০ কোটি ডলার) ডলারে জাপান টোব্যাকোর কিনে নেওয়া। ফলে তা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে যোগ হয়। কিন্তু তা বাদ দিলেও গত অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ কম এসেছে প্রায় ৩২৫ কোটি ডলার। আলোচ্য এই সময়ে স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণও কমেছে আশ’ঙ্কাজনক হারে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধরনের ধ’স নেমেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

*গত অর্থবছরে কী পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে তার একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিডা। যা চূড়ান্ত করে প্রকাশে আরও কিছু সময় লাগবে। সেখানে এ তথ্যের সামান্য গর’মিল হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিডার কর্মকর্তারা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম বলেন, সারা বিশ্বে বিনিয়োগ পরি’স্থিতিতে ম’ন্দা চলছে। বৈশ্বিকভাবে গত বছর ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ পড়ে গেছে। তার প্রভাব সেন্ট্রাল এশিয়ায়ও পড়েছে। কিন্তু তারপরও আমরা গত বছর অনেক ভালো করেছি। এ বছরও ভালো যাচ্ছে। আঙ্কটাডের রিপোর্টও তা-ই বলেছে।

*চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এক বিলিয়নেরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। আশা করা হচ্ছে চলতি বছর শেষে চার বিলিয়ন ডলার আসবে। গত অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা শুধু অর্থবছর আর পঞ্জিকা বছরের কারণে হে’রফের হয়েছে। অর্থাৎ সময় গণনার ভিন্নতার কারণে মনে হবে বিনিয়োগ কমেছে। প্রকৃতপক্ষে বিদেশি বিনিয়োগ কমেনি। কেননা আগের চেয়ে দেশের ইজি অব ডুয়িং বিজনেস পরি’স্থিতি অনেক উন্নত। ফলে সামনের দিনগুলোর বিনিয়োগ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

*বিদেশি বিনিয়োগ কমার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) থেকে বলা হয়েছে, আগের বছর জাপান টোব্যাকো কর্তৃক ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকোয় ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করায় সে বছর অধিক হারে বেড়েছিল বিদেশি বিনিয়োগ। এ বছর এরকম কিছু না ঘটায় কম দেখাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ। তবে আগের বছরের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ (ডুয়িং বিজনেস) সূচকের ক্রমাবনতির কারণে বিদেশি উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারা’চ্ছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে হয়রানি ভো’গ করতে হয়। সহযোগিতার অভাবও রয়েছে। এক্ষেত্রে উন্নতি করতে না পারলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।

*বিডার হালনাগাদ তথ্যে জানা গেছে, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে ব্যাপক ধ’স নেমেছে গত এক বছরে। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশি ও যৌথ বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৭০টি প্রকল্পের বিপরীতে ৫২৫ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ছিল ৪৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর (২০১৭-১৮) জুন পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধিত হয়েছিল ১৬০টি প্রকল্পের বিপরীতে ১ হাজার ৩১ কোটি ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যা ছিল ৮১ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। বিদেশি বিনিয়োগের বাইরে স্থানীয় বিনিয়োগের নিবন্ধন হারও এই সময় কমে অর্ধেকে নেমেছে।

*২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ প্রকল্পের বিপরীতে ৮৪০ কোটি ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার। আগের অর্থবছরে (২০১৭-১৮) স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪৮৩টি প্রকল্পের বিপরীতে দেড় হাজার কোটি ডলার, স্থানীয় মুদ্রায় যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। এই বিনিয়োগের কর্মসংস্থান সম্ভাবনা বলা হয়েছিল দুই লাখ ৬০ হাজার ৫৫৫টি।

*২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) ২০১৮ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের দিক দিয়ে রেকর্ড পর্যায়ের অগ্রগতির বিষয়ে প্রশংসা করে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ৬৮ শতাংশ বেড়ে ৩৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ ও পোশাক শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ আকর্ষণের মধ্য দিয়ে এ অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়। আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০১৮ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। গড়ে সাড়ে ৩ শতাংশ বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি (৬৮ শতাংশ)।

*প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পোশাক কারখানাসহ শ্রমভিত্তিক শিল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এফডিআইর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। জাপান টোব্যাকো কর্তৃক ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকো অধিগ্র’হণের বিষয়টিকেও এক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের স্থানীয় কোম্পানি ঢাকা টোব্যাকো কেনার মাধ্যমে গত বছর ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে জাপান টোব্যাকো। এই বিনিয়োগ আকর্ষণের মূল কারণ হিসেবে বলা হয়, শিল্প উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আসা উদ্যোক্তা বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের হয়’রানির মুখে পড়েন। যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়।

*বিশ্বব্যাংকের ইজি অব ডুয়িং বিজনেস-২০১৯ বা সহজে ব্যবসা করার সূচক-২০১৯- এই ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৭৬তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে যা সর্বনিম্ন অবস্থান। এই সূচকে ভারতের অবস্থান ৭৭, চীন ৪৬, শ্রীলঙ্কা, ১০০, পাকিস্তান ১৩৬, মালদ্বীপ ১৩৯। এ সূচকটি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে সুষ্ঠু পরিবেশ। এরপর গ্যাস-বিদ্যুতের নিরা’পত্তা, পুঁজির নিরা’পত্তা সর্বোপরি যেখানে বিনিয়োগ করছি সেখান থেকে কী রিটার্ন পাব সে বিষয়টিকে আমলে নেন বিনিয়োগকারীরা। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিনিয়োগ পরিস্থি’তির উন্নতি ঘটানো বেশ কঠিন।