প্রচ্ছদ শিক্ষাঙ্গন “শিক্ষক কর্তৃক মাদ্রাসার শিশুদের হাজারো ধ’র্ষণের ঘটনা”

“শিক্ষক কর্তৃক মাদ্রাসার শিশুদের হাজারো ধ’র্ষণের ঘটনা”

97

*ঘটনা-১: গত ২০ আগস্ট টাঙ্গাইল পৌর এলাকার কেন্দ্রীয় গোরস্থান মসজিদ দারুস সুন্নাহ এতিমখানা মাদ্রাসার ১০ বছরের এক ছাত্রকে ব’লাৎকারের অভি’যোগে গ্রেফতার হন প্রতিষ্ঠানটির আবাসিক শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম (৩০)। টাঙ্গাইল সদর থানায় মামলার এজাহারসূত্রে জানা যায়, প্রায় আট মাস আগে ওই ছাত্রকে তার বাবা এ আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন। এরপর থেকেই ছেলেটির ওপর শুরু হয় পাশ’বিক নি’র্যাতন। কাউকে কিছু বললে ছাত্রকে খু’ন করে ফেলার হু’মকি দিতেন শিক্ষক হাফিজুল। মাঝেমধ্যেই নি’র্যাতন স’হ্য করতে না পেরে মাদ্রাসা ছে’ড়ে পা’লিয়ে যেত ছাত্রটি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েই ওই শিশু ছাত্র পুরো ঘ’টনাটি তার মাকে খুলে বলে।

*ঘটনা-২: গত ৫ জুলাই ১০ বছর বয়সের এক ছাত্রীকে অফিস রুমে ডেকে নিয়ে ধর্ষ’ণের চেষ্টাকালে হাতেনাতে ধরা পড়েন নেত্রকোনা কেন্দুয়ার আঠারবাড়ি মা হাওয়া (আ.) কওমি মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল খায়ের বেলালী। স্থানীয়রা গণপি’টুনি দিয়ে তাকে পুলিশে সো’পর্দ করে। পরে অন্তত ৬ শিশু শিক্ষার্থীকে ধ’র্ষণের অ’ভিযোগ পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, ধ’র্ষণের পর অভি’যুক্ত অধ্যক্ষ বেলালী কাউকে কিছু না বলার জন্য কোরআন শরিফ হাতে দিয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের শপথ করাতেন। হোস্টেলে থাকা অপ্রাপ্ত বয়সের ছাত্রীদের যখন-তখন ডেকে নিতেন গা-হাত-পা টি’পে দিতে। এক পর্যায়ে সেই অবুঝ শিশুকে ধ’র্ষণ করতেন।

*ঘটনা-৩: নারায়ণগঞ্জের এলাকার দারুল হুদা আল ইসলামিয়া মহিলা মাদ্রাসা ও এতিমখানার চার ছাত্রীকে যৌ’ন নি’পীড়নের অভি’যোগে মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানকে (৩৪) গত ২৭ জুলাই আ’টক করে র‌্যাব। এর কিছুদিন আগে ৪ জুলাই ফতুল্লার মাহমুদপুর বায়তুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসায় এক ডজনেরও বেশি শিশু ছা’ত্রীকে ধ’র্ষণ ও যৌ’ন নি’র্যাতনের অভিযোগে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা আল আমিন র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন। এত গেল মাত্র কয়েকটি ঘটনা। বিশেষ করে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে শ্লী’লতাহানির অভি’যোগে মামলা দায়েরের ঘটনায় গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে হাত-পা বেঁ’ধে জী’বন্ত পুড়ি’য়ে হ’ত্যা করা হয়। এমন নৃ’শংস ঘ’টনায় দেশজুড়ে তোল’পাড় সৃষ্টি হয়।

*এক শ্রেণির নী’তিবিবর্জিত ল’ম্পট শিক্ষকের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বার বার বি’তর্কের মুখে প’ড়ছে মাদ্রাসাশিক্ষা। শিক্ষক নামের এসব ন’রপশুর পৈশা’চিকতা থেকে সন্তানতুল্য ছাত্রীরাই নয়, রেহাই পাচ্ছে না শিশু-কিশোর ছাত্ররাও। শুধু ধ’র্ষণ, ব’লাৎকার বা যৌ’ন হয়’রানিই নয়, অনেক সময় প্রমাণ লু’কাতে হ’ত্যা করা হচ্ছে ওই শিক্ষার্থীকে। এই পরিস্থিতিতে সন্তানকে মাদ্রাসায় পড়াতে চরম নিরাপ’ত্তাহীনতায় ভুগছেন অভিভাবকরা। অনেকেই মাদ্রাসা ছাড়িয়ে শিশুসন্তানকে নতুন করে স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। পৈশাচিকতার সীমা ছাড়ানো কিছু ঘটনা দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করার কারণে বিচারের আলো দেখলেও অধিকাংশ ঘটনা প্রকাশ্যেই আসছে না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করে আরও বিপ’দে পড়ছে ভুক্তভোগীর পরিবার।

*তবে শিক্ষক নামের এসব নর’পশুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান দেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আলেম-ওলামারাও। প্রতিটি মাদ্রাসায় নজরদারি বাড়ানোর দাবি করেছেন তারা। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, ঢাকার অধ্যাপক মুফতি আমজাদ হোসাইন হেলালী বলেন, অপ’রাধী যেই হোক তার কঠো’র শা’স্তি হতে হবে। এক বা গুটিকয় নৈতি’কতাবিবর্জিত ব্যক্তির কারণে এত বড় একটা শিক্ষাব্যবস্থা ক’লঙ্কিত হতে পারে না। এসব শিক্ষককে সর্বোচ্চ শা’স্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ বিধান করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটা’নোর সা’হস না করে।

*জানা গেছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ মাদ্রাসা শিক্ষা। কওমি মিলে শুধু ইবতেদায়ি পর্যায়েই শিক্ষার্থী প্রায় ৩৪ লাখ। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতিষ্ঠানের ধরণভেদে ২৫ থেকে ৬০ শতাংশ হলেও নারী শিক্ষকের হার খুবই ন’গণ্য। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশের ৬৫৫৩টি দাখিল মাদ্রাসায় মোট শিক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৫৯০ জন। সেখানে নারী শিক্ষার্থীই শুধু ৮ লাখ ২২ হাজার ৬৬৫ জন যা মোট শিক্ষার্থীর ৬০ দশমিক ৮২ শতাংশ।

*তবে নারী শিক্ষকের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৯৬ জন, যা মোট শিক্ষকের মাত্র ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র মিলে ইবতেদায়ি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ২০ লাখ ২৭ হাজার ৪৫৫ জন। নারী শিক্ষার্থী ১০ লাখ ১৫ হাজার ২৪১ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৫০ শতাংশের বেশি। তবে এখানে নারী শিক্ষকের হার মাত্র ১৮ শতাংশ। একইভাবে কওমি মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি পর্যায়ে শিক্ষার্থী প্রায় ১৪ লাখ। নারী শিক্ষার্থী ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। নারী শিক্ষক ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। সপ্তাহব্যাপী অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোতেই বেশিরভাগ যৌ’ন নি’পীড়নের ঘ’টনা ঘ’টেছে।

*সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা পরীক্ষায় ফেল করানো বা সর্বোচ্চ নম্বর পাইয়ে দেওয়া, অভিভাবকদের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ছাত্রীদের হেন’স্তা করা, বই-খাতার মধ্যে ন’গ্ন দৃশ্যাবলি, চ’টিবই বা কল্পিত প্রেমপত্র গুঁজে দিয়ে তা আবিষ্কার করা ইত্যাদি কৌশল ব্যবহার করে ছাত্রীদের ফাঁ’দে ফেলছে। কখনো নিজেকে মহান প্রমাণ করে ছাত্রীকে নিজের প্রতি দু’র্বল করে তুলেছে। পিতৃতুল্য শিক্ষকদের এসব জ’ঘন্য ক’র্মকান্ডে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা যেমন উ’দ্বিঘ্ন, তেমনি বি’ব্রত আদর্শবান শিক্ষকরা।

*বেশিরভাগ ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে মীমাংসা ও ধা’মাচাপা পড়ে যায়। শিক্ষকদের নামে যৌ’ন হয়’রানির অভি’যোগ তুলেও কোনো সুরাহা পান না ছাত্রীরা। বরং নানা কৌশ’লে অভিযোগকারী ছাত্রীদেরই হে’নস্তা করা হয়। অভিযোগকারী ছাত্রী স্কুল ও নিজ গৃহে প্রচ’ণ্ড মান’সিক চা’পের শি’কার হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার শিক্ষাজীবনেরও ইতি ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে আত্ম’হত্যার মধ্য দিয়েই নিজের সব গ্লা’নির চিরসমাপ্তি ঘটায় ভু’ক্তভোগী ছাত্রী। চলতি বছরেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, জয়পুরহাটসহ বেশ কয়েকটি জেলায় মাদ্রাসাছাত্রীদের আ’ত্মহত্যার ঘ’টনা ঘ’টেছে। যদিও সব আত্মহ’ত্যার পেছনের কারণ জানা যায়নি।

*জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালের খবর পর্যা’লোচনা করে দেখা গেছে, গত এক বছরে মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক কর্তৃক কয়েকশ ধ’র্ষণ, বলা’ৎকার ও যৌ’ন হয়’রানির ঘ’টনা সামনে এসেছে। এ সময় নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন ‘সিরিয়াল ধ’র্ষক মাদ্রাসা শিক্ষকের’ সন্ধা’নও মিলেছে। তাদের কেউ কেউ তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পড়ুয়া ডজনেরও বেশি ছাত্রীর ওপর মাসের পর মাস পাশবিক নি’র্যাতন চা’লিয়ে অবশেষে ধ’রা পড়েছেন। ব’লাৎকারকে কেন্দ্র করে অন্তত চারজন শিশু-কিশোর ছাত্রকে হ’ত্যার ঘ’টনা ঘ’টেছে। বর্বর’তার ফাঁদে এখনো আ’টকে আছে অসংখ্য ছাত্রী। ধ’র্ষক শিক্ষকদের লাল’সায় বহু শিক্ষাজীবন ধ্বং’স হয়ে গেছে, চুর’মার হয়ে গেছে সব স্বপ্ন। অনেকেই আত্মহ’ননের মাধ্যমে মুক্তির পথ খুঁ’জেছে।

*গত জুনে ৬ বছর বয়সী এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ধ’র্ষণচেষ্টার অভিযোগে আ’টক হন সাভার পৌর এলাকার গেন্ডা মহল্লার একটি বালিকা মাদ্রাসার শিক্ষক ইদ্রিস আলী। কান্নাকাটি করায় ওই শিক্ষকের হাত থেকে সে যাত্রায় বেঁচে যায় শিশুটি। গত ১ মে যশোরের শার্শা উপজেলায় পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যৌ’ন হ’য়রানি এবং সহায়তার অভিযোগে বাগআঁচড়া সাতমাইল মহিলা আলিম মাদ্রাসার সুপারসহ চার শিক্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ। মে মাসে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের মদিনা একাডেমি নূরানি মাদ্রাসায় ১১ বছরের এক ছাত্রকে ব’লাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক তৌহিদুল ইসলামকে (৩০) গ্রেফতার করে পুলিশ।

*এপ্রিলে রাজশাহীর পুঠিয়ায় শিলমাড়িয়ার মাদ্রাসায় এক ছাত্রকে ব’লাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (২৫) গ্রেফতার হন। একই মাসের ১৫ তারিখ ফেনীর দাগনভূঞায় ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে শহীদুর রহমান নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর পরদিন ১৬ এপ্রিল ফেনী সদরের আরেক মাদ্রাসার শিক্ষক মো. হারুন একই অভিযোগে গ্রেফতার হন। ২৩ এপ্রিল আবারও তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রকে ব’লাৎকারের অভিযোগে দাগনভূঞায় আবদুর রহমান (৩০) নামের আরেক মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার হন। গত জুলাইয়ে ফেনীর ছাগলনাইয়ায় ৮ বছরের এক শিশুকে ব’লাৎকারের চেষ্টার অভিযোগে মোহাম্মদ ফোরকান (২৬) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেফতার হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান, যিনি মাদ্রাসায় যৌ’ন নির্যা’তনের বিষয়ে গবেষণা করছেন।

*তিনি বলেন, মাদ্রাসাগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেখানে এত বেশি নারী শিক্ষার্থী পড়ছে, সেখানে নারী শিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম। এটা বাড়ানো দরকার। এ ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে নজ’রদারি ও পর্যবেক্ষণ করার মতো শক্তিশালী কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। মাদ্রাসা বোর্ডের অভিভুক্ত নয় অনেক মাদ্রাসা। সেসব প্রতিষ্ঠানে যৌ’ন হয়’রানি হলেও দেখার কেউ নেই। এ ছাড়া আইনেও ফাঁ’ক আছে। অনেক ছেলে শিশু বলা’ৎকারের শিকার হয়। এগুলোও ধ’র্ষণ। তবে আইনে সেগুলো ধ’র্ষণের সংজ্ঞায় পড়ে না।