প্রচ্ছদ স্পটলাইট “স্থানীয়রা অ’সহায়, বাড়ছে অপ’রাধ, রোহিঙ্গা এখন গলার কাঁ’টা”

“স্থানীয়রা অ’সহায়, বাড়ছে অপ’রাধ, রোহিঙ্গা এখন গলার কাঁ’টা”

35

*প্রায় দুই বছরে গলার কাঁ’টা হয়ে গেল মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আ’শ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। একদিকে রোহিঙ্গা শি’বিরে অপ’রাধ কর্মকাণ্ড সী’মা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে সর্বনা’শা মা’দকের আঁতু’ড়ঘরে পরিণত হয়েছে ক্যাম্পগুলো। অনি’শ্চিত ভবি’ষ্যৎ নিয়ে থাকা একেকটি ক্যা’ম্প হু’মকি হয়ে দেখা দিচ্ছে আঞ্চলিক নিরা’পত্তার ক্ষেত্রে।

*ইতিমধ্যে সমূলে বি’নষ্ট হয়েছে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাহারঘেরা নয়নাভিরাম পরিবেশ-বৈচিত্র্য। এখন ন’ষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্প্রী’তি। স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের স’হিংস আচ’রণই যেন সেখানে ভবি’তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপ’দগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের প্রতি সবার আগে হাত বাড়ানো স্থানীয়রাই এখন কো’ণঠাসা। গত কয়েক দিন কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যা’ম্প ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

*রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বছর আগে মানবতার জন্য নজি’রবিহীন দৃষ্টা’ন্ত স্থাপন করেই সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। সেই দিন থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কোষাগার থেকে রোহিঙ্গাদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আসা রোহিঙ্গাদের আরও ভালো থাকার সুযোগ সৃষ্টির জন্য শত শত বিদেশি সংস্থাকেও কাজ করার অবারিত স্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘রোহিঙ্গা কূটনীতি’ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল শুরু করেছে নানা ধর’নের খেলা। অস্থায়ী ক্যাম্প চির’স্থায়ী করার এই খেলা রোহিঙ্গাদের দিন দিন বাংলাদেশের গলার কাঁ’টায় পরিণত করছে। ব’ন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায় সব ‘এক্সিট রুট’- বলছেন কূটনীতিকরা।

*কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা আছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে তারা এসে কক্সবাজারে আশ্র’য় নেয়। তাদের ফে’রত পাঠা’তে ২২ আগস্ট সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু তারা যেতে না চাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত বছর ১৫ নভেম্বরও আরেক দফা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষো’ভ-সমা’বেশের কারণে সে দফায়ও প্রত্যা’বাসন ভণ্ডু’ল হয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায়ও শুধু নিজ মুখে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে দেশে ফেরা থেকে বেঁ’চে যাওয়া এবং সে জন্য কোনো ধরনের চা’প অনুভব না করা রোহিঙ্গারা যারপরনাই খুশি। কক্সবাজারে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা অধ্যাপক আতাউর রহমান চৌধুরী মনে করেন, প্রত্যাবাসনের বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েও পরপর দুবারের ব্য’র্থতা রোহিঙ্গাদের স’হিংস স্বেচ্ছা’চারী আ’চরণে প্র’ভাব রেখেছে। এ কারণেই বাজার থেকে তুলে নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গু’লি করে হ’ত্যার মতো রো’মহর্ষক ঘ’টনা তারা ঘ’টিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

*শুধু তা-ই নয়, একসময় রোহিঙ্গাদের খাবার আর আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হওয়া কক্সবাজারের মানুষ এখন উ’দ্বিগ্ন ও বি’রক্ত। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব ছ’ড়াচ্ছে দা’বানলের মতো। প্রত্যাবাসন স্থগিত হওয়ায় ক্ষু’ব্ধ কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ভি’ড়ে এলাকার শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। হাট-বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও পরিবেশ বি’পন্ন হচ্ছে। মানুষ এ নিয়ে উদ্বি’গ্ন। অনেকে ভু’ল পরিচয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

*গবেষণায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের নেতিবাচক প্রভাব: বিভিন্ন স্বীকৃত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকটের বিভিন্ন রকম বি’রূপ প্র’ভাবের তথ্য উঠে এসেছে। ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে সরাসরি ক্ষ’তিগ্রস্ত হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া টেকনাফের শতভাগ এবং উখিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষ’তিগ্রস্ত। ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় ৫ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্র’য় দেওয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু চলতি বছর এপ্রিলের জরিপে তা বেড়ে ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

*এই বিপুলসংখ্যক মানুষ রোহিঙ্গাদের আশ্র’য় দেওয়াকে বড় ভু’ল বলছেন। ইউএনডিপি এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) গবেষণায় দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের জন্য টেকনাফ ও উখিয়ার দারিদ্র্য বৃ’দ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের সময়ের ৫০ শতাংশই ব্যয় করেন রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ফলে স্থানীয়রা সেবাবঞ্চি’ত হচ্ছেন।

*বনভূমি ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্য উজাড়: কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উখিয়া ও টেকনাফের সবুজ পাহাড়ে রোহিঙ্গারা ঝু’পড়িঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে। তাদের এই ঘর তৈরিতে কে’টে ফেলা হয়েছে পাহাড়ি ছোট-বড় অসংখ্য গাছপালা। একসময়ের সবুজ পাহাড় পরিণত হয় বৃক্ষশূন্যে। ফলে হু’মকির মুখে পড়েছে সেখানকার পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য। পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে গিয়ে ক্ষ’তিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ান হাতির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্রও। এ ছাড়া প্রতি মাসে রোহিঙ্গাদের রান্নাবান্নার কাজে ছয় হাজার ৮০০ টন জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা এই জ্বালানি কাঠগুলো পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে।

*গত মাসের ৩ জুলাই কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক দফতরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গার ঢল নামে। ওই সময় আসা এবং পুরনো ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, বালুখালী ঢালা, ময়নারঘোনা, থাইংখালী তাজনিমার খোলা, হাকিমপাড়া, জামতলি বাঘঘোনা, শফিউল্লাহ কাটা এবং টেকনাফের চাকমারকুল, উনচিপ্রাং, লেদা, মৌচনী, জাদিমুরা ও কেরানতলী এলাকাসহ বন বিভাগের গেজেটভুক্ত প্রায় ৬ হাজার ১৬০ একর বনভূমিতে বসতি স্থা’পন করে।

*বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের এভাবে বসতি স্থাপনের কারণে টাকার হিসাবে সৃজিত এবং প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি হয়েছে ৪৫৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। একইভাবে জীববৈচিত্র্যের ক্ষ’য়ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে বনজ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষ’তির পরিমাণ টাকার হিসাবে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

*দৃশ্যমান কুপ্রভাব রাস্তাঘাটে: শুধু বনভূমি বা জীববৈচিত্র্যে নয়, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা বসতি মা’রাত্মক প্রভা’ব ফে’লেছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কেও। ৭৯ কিলোমিটারের এই সড়কে স্থানীয়দের বহন করা গাড়ি চলছে। পাশাপাশি চলছে টেকনাফ স্থলবন্দরের পণ্যবাহী নিয়মিত পরিবহন। একই সঙ্গে এ সড়কে যাতায়াত করছে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও মালামাল বহনকারী শত শত ভারী যানবাহন। ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার অন্তত আড়াইশ গাড়িও এ সড়কে চলাচল করে। তাই সড়কে যানজট যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে সড়ক ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে যান চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।