প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “তসলিমার বই পড়ার অপ’রাধে পীঠে দুটো বেত ভে’ঙ্গেছিল প্রিন্সিপাল”

“তসলিমার বই পড়ার অপ’রাধে পীঠে দুটো বেত ভে’ঙ্গেছিল প্রিন্সিপাল”

মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ

52

*২০০১ সাল। আমি ঢাকার উত্তরার বায়তুসসালাম মাদ্রাসার ছাত্র। মাদ্রাসায় আমাদেরকে কোরআন এবং হাদিস থেকে পাঠদান করা হচ্ছিল নারীর সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে। অবাধ্য স্ত্রীকে পে’টানো, নারীকে সম্পত্তিতে ঠ’কানো ইত্যাদির মধ্যেই রয়েছে নারীর চ’রম ও পরম সম্মান, এটাই তখন আমি জানতাম। একজন পুরুষ চাইলেই চারটে বিয়ে করতে পারে, পুরুষ চাহিবামাত্র তার স্ত্রীকে মুখের কথায় বিদায় করতে পারে, কারণ পুরুষদের আল্লাহ বলেছেন, নারীর উপরে রয়েছে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব। পুরুষদের নবী মোহাম্মদ বলেছেন, নারীর বুদ্ধি অসম্পূর্ণ। আল্লাহ কোরআনে নারীকে পায়’খানার সাথে তুলনা করেছেন, মোহাম্মদ নারীকে কুকুর ও গাধার সাথে তুলনা করেছেন।

*আর এ ধরনের তুলনার মধ্যেই রয়েছে নারীর জন্য সর্বোচ্চ সম্মান, এই-ই ছিল মাদ্রাসার প্রধানতম পাঠ্য। আমি তখন এসব কথা বিশ্বাস করতাম, কিন্তু আমার মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগতো যখন দেখতাম- আমাদের গ্রামের মহের আলী তার স্ত্রীকে নি’র্মমভাবে পে’টাত, আমার শিক্ষক মুফতি বশির আহমদ তার স্ত্রীকে প্রতিদিন শা’স্তি দিত। সমাজের সব পুরুষই নারীকে দমন করে রাখা তার জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে পালন করত। আমার মনে প্রশ্ন জাগত, সমাজের প্রত্যেক নারী কি পুরুষের দ্বারা এভাবে নিগৃ’হীত হতে থাকবে? নারী কি আসলেই মানুষ নয়? মা’র খাওয়াই কি তার নিয়তি?

*আমাদের শিক্ষকরা আমাদেরকে একজন মানুষ সম্পর্কে খুব সাবধান করতেন, তার বই পড়তে নিষেধ করতেন। সে মানুষটিকে আমাদের শিক্ষকেরা বহু রকমের গা’লি দিয়ে মজা পেতেন। বারবার নাম শুনতে শুনতে আমার কৌতূহল বেড়ে গেল, সে মানুষটির বই পড়তে আগ্রহী হলাম। বাবার দেয়া টিফিনের টাকা জমিয়ে নিলক্ষেত থেকে কিনলাম ‘নির্বাচিত কলাম’ ও ‘লজ্জা।’ বই পড়ে আমার মনে হতো লাগলো, আমি যা শিখছি, আমি আরবিতে লেখা যে সব বই পড়ছি, আমার আরবিতে লেখা বইয়ে নারীকে যে দৃষ্টিতে তুলে ধরা হয়েছে তারচে ভালো কথা আছে এই বাংলা বইয়ে।

*তবুও কেন যেন চিন্তার কারা’গার থেকে মুক্তি পাচ্ছিলাম না। বই পড়তাম। বই ভালো লাগতো, কিন্তু বই পড়া শেষে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে অভি’শাপ দিতাম। স্বভাবের কি এক বিচিত্র বৈপরীত্য!
একজন মাদক ব্যবসায়ী যেভাবে পুলিশের কাছ থেকে তার মাদককে লুকিয়ে রাখে আমাকেও তখন তসলিমা নাসরিনের বই সেভাবে লু’কিয়ে রেখে পড়তে হতো। আমি মনে করতাম, এ বই যেন বই নয়, এ যেন ভ’য়ঙ্কর মারি’জুয়ানা! এ বই যেন বই নয়, এ যেন ভ’য়ঙ্কর মার’ণাস্ত্র! ২০০১ সালের শেষদিকে তসলিমা নাসরিনের বই পড়ার কারণে হুজুরদের কাছে দো’ষী সা’ব্যস্ত হলাম। হুজুরদের সে কি ক্রো’ধ! সে কি উন্মা’দনা! আমাকে পারে তো কাঁচা চি’বিয়ে খায়! বই পড়ার অপরাধে আমাকে পি’টিয়ে দুটো বে’ত ভে’ঙ্গেছিল বাইতুস সালাম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল হাই।

*আজ আমার প্রিয় মানুষের জন্মদিন। তিনি চিরকাল তার কর্মময়তা দিয়ে বেঁচে থাকুন মানুষের মধ্যে। নিপাত যাক পুরুষতান্ত্রিকতা, ধরা পড়ুক ধর্মের ধ্যাষ্টামো, অবারিত হোক নারীর স্বাধীনতা।

মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ: ব্লগার।