প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “গতকালের তসলিমা নাসরিনের লেখাটি পড়ার পর…”

“গতকালের তসলিমা নাসরিনের লেখাটি পড়ার পর…”

সুষুপ্ত পাঠক

58

*বাংলাদেশের কালের কন্ঠ শিরোনাম করেছিলো, ‘তসলিমা নাসরিন বিজেপির সুরে কথা বলছেন, তিনি ভারতে মুসলিম পারিবারিক আইন বা’তিল চান’। গতকাল তসলিমা নাসরিন এই বিষয়গুলো নিয়েই লিখেছিলেন। যেমন তার লজ্জ্বা উপন্যাস হচ্ছে বাংলাদেশের ৯০ দশকে হিন্দুদের উপর বাবরী মসজিদকে কেন্দ্র করে ঘটা সাম্প্রদায়িক হা’মলা ধ’র্ষণ নি’র্যাতনের এক আখ্যান। সেই উপন্যাস নিয়ে ভারতে বিজেপি উচ্ছ্বসিত ছিলো। তারা পাইরেটেড কপি ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিলি করেছিলো। তাতেই প্রগতিশীল, বামপন্থি, সেক্যুলার বলে স্বঘোষিতরা বলেছিলো, তসলিমা বিজেপি কাছ থেকে টাকা খেয়ে এই উপন্যাস লিখেছে।…

*ব্লগার হিসেবে তসলিমা নাসরিনের মত আমাকেও ঠিক একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। সেই একই স’ন্দেহের তীর, সমা’লোচনা। তসলিমা হিন্দু কিনা সে প্রশ্ন না উঠলেও আমাকে নিয়ে উঠেছে। যে ধর্মকে একদিন ঘৃ’ণাভরে ত্যা’গ করেছিলাম, সে পরিচয়ে নিজেকে স্বীকার করার প্রশ্নই আসে না। তাই এসব সমালোচনায় চুপ থাকাই শ্রেয় বলে মনে করি। কিন্তু আমাদের কথিত রাজনৈতিক কানেকশন নিয়ে কথা বলতেই হয়।

*তসলিমা নাসরিন বিজেপি করে আর আমি বিজেপি-আরএসএস-শিবসেনা-র’ এজেন্ট…। বিজেপি বাংলাদেশের হিন্দু নি’র্যাতন নিয়ে রাজনীতি করবে বলে আমরা সে নি’র্যাতন নিয়ে কথা বলব না? যদি আমাদের কথা প্রতি’বাদ বিশ্লেষণ বিজেপি বা অন্য কোন হিন্দুত্ববাদী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজে লাগায় তারজন্য বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিয়ে কথা বলব না? ভারতীয় মুসলিম নারীরা বহুদিন যাবত তিন তালাক, পুরুষদের বহুবিবাহ বিষয়ক মুসলিম পার্সোনাল আইন বা’তিলের জন্য আন্দোলন করছিলো। কিন্তু ভারতের সেক্যুলার দাবীদাররা মুসলমানদের জন্য মাদ্রাসা-মক্তব আর ইমাম ভাতা বাস্তবায়নে মনোযোগী ছিলো।

*ভোট নষ্ট হওয়ার ভয়ে মুসলিম সমাজকে আরো বেশি অন্ধকারে রাখাই তাদের রাজনীতি ছিলো। কিন্তু বিজেপি এসে এই অসভ্য নারী বিরোধী আইন বা’তিলের উদ্যোগ নিলে আমরা উচ্ছ্বসিত হয়েছি। আর এতেই প্রমাণিত হয়েছে আমরা বিজেপি করি? আমার লেখা ফেইসবুকে বহু হিন্দত্ববাদী পেইজে রিপোস্ট হয় শুনেছি। আমার তীব্রভাবে ইসলামী রাজনীতি ও বাংলাদেশী প্রগতিশীল বলে দাবীদার মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের হিপোক্রেসি তুলে ধরা লেখাগুলো যদি কেউ তাদের রাজনীতির কাজে লাগায় সেই ভ’য়ে আমি কি সত্য বলা থেকে বিরত থাকব?

*বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নি’র্যাতন সম্পর্কে বাংলাদেশী মুসলিম বামপন্থিদের বক্তব্য হচ্ছে, এখানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া প্রায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে। মূলত বুর্জোয়া শাসনের শো’ষণ নি’র্যাতনই এখানকার নিয়তি যার বেশির ভাগ ভো’গ করতে হয় মুসলমানদের, কারণ তারা এখানে ৯০ ভাগ। এছাড়া যে সামান্য হিন্দু বা সংখ্যালঘু সমস্যা ঘটে তার জন্য ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাই দায়ী, কারণ বাংলাদেশে হিন্দু নি,র্যাতনের খবর হলে তাদের রাজনীতি করতে সুবিধা হয়…। এই পার্ভাট বক্তব্যকে যখন খন্ডন করতে শুরু করি তখন থেকে আমাদের ফেইসবুক বিপ্লবীদের কাছে আমি ‘বিজেপি-আরএসএস-শিবসেনা’ হয়ে যাই!

*শুরুটা করেছিলো একদল নাস্তিক দাবীদাররা। আমাদের কয়েকজন ব্লগারকে নাম ধরে ধরে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ বলে আ’ক্রমন চা’লায়। এখানেও একই ফর্মূলা, কেন ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করি। আমাকে একবার ইসলামের নাম নিতে হলে নিয়ম করে একবার করে হিন্দু ধর্মের নামও নিতে হবে। তা না হলে ‘সহি নাস্তিকতা’ হবে না!

*ইসলামিস্টরা আমাকে বা তসলিমাকে বা আমাদেরকে কি বলে সেটা সকলের জানা। কিন্তু বাংলাদেশে ও ভারতে উদার সেক্যুলার লিবারালদের মতামতটা ইন্টারেস্টিং! মুসলমানদের দাবীদাওয়ার মিছিলে শ্লোগানে ‘আল্লাহো আকবর’ কেন আসে- এই প্রশ্ন করাটা তাদের কাছে ইসলাম বি’দ্বেষী। গতকাল কাশ্মিরে জুম্মার নামাজ শেষে মিছিল করেছে কাশ্মিরীরা। কেন জুম্মার নামাজের পরই তাদের আন্দোলন সূচনা করতে হয়? ডাইরেক্ট এ্যাক’শন ডেতে কোলকাতায় জুম্মার নামাজ শেষেই শুরু হয়েছিলো। কয়েকজন বামপন্থি ও অন্যান্য মতাদর্শের লিবারালদের জিজ্ঞেস করেছিলাম মুসলমানদের মুক্তি সংগ্রামই বলেন কিংবা দখ’লদারীর প্রতি’বাদ, সেখানে কলেমা, আল্লাহো আকবর… এরকম ধর্মীয় ব্যাপার আসে কেন, জাতীয়তাবাদ কিংবা দেশপ্রেম বাদ দিয়ে কেবলই ইসলাম কেন তাদের আইডেন্টি।

*এই সুধীজনদের প্রায় সবাই আমাকে উত্তরে বলেছিলেন, যেহেতু মধ্যপাচ্যের মুসলিমরা সেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশে কোনদিন থাকেনি, সেরকম শিক্ষাও তাদের নেই, আরব জাতীয়তাবাদ বলতে তাো মুসলিম ও ইসলামকে এক করে ফেলে…। বেশ ভালো কথা, তাহলে ভারতীয় মুসলমানরা কি ৫০ বছরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অভ্যস্থ হয়নি? বাংলাদেশের মুসলমানরা কি ৪৭ বছরে গণতন্ত্রে অভ্যস্থ হয়নি? তারা তো বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে দেশ স্বাধীনের দাবী করে- তারা কেন তাদের প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের মাথার উপর আরবীতে কলেমা লিখে রাখে? তাদের সংবিধান কেন ইসলামময়?… এরকম প্রশ্নের যেহেতু কোন উত্তর তাদের কাছে নেই তাই আমাকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলাটাই সব থেকে শ্রেয়…।

*বাংলাদেশে আমি সংখ্যাগরিষ্ঠদের একজন ছিলাম। তবু আমি হিন্দু, আদিবাসী পাহাড়ীদের পক্ষ নিয়ে দিনের পর দিন ব্লগে ফেইসবুকে লিখেছি। বাংলাদেশে ঘটা তাদের উপর জু’লুম অত্যা’চার নিয়ে সো’চ্চার হয়েছি। এটাই আমাকে নিয়ে সন্দ’হের কারণ। সবার ধারণা, হিন্দু হিন্দুর জন্য কাঁ’দবে, মুসলমান মুসলমানের জন্য কাঁ’দবে, চাকমা-মারমা চাকমা মারমার জন্য কাঁদবে। এরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের দোষ গোপন করবে এটাই তো স্বাভাবিক…। আমি যেহেতু এদের সকলের হয়ে কথা বলি আর মুসলমানদের হিপোক্রেসি নিয়ে সোচ্চার হই কাজেই আমি হিন্দু পাহাড়ী ইহুদীর দালাল ভারতের দালাল সাম্রাজ্যবাদীদের পেইড এজেন্ট…। মুসলমানরা নিজেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে ইসলামি রাষ্ট্র চাইবে আর সংখ্যালঘু হলে সেক্যুলার ব্যবস্থা- এই হিপোক্রেসির সমালোচনা করা মানে কি ভারতের সেক্যুলারিজমকে বাদ দিয়ে ‘হিন্দুত্ববাদী ভারত’ চাওয়া?

*কে কি বলল তাতে আমার কোন সমস্যা নেই। এই লেখাটার মানে হচ্ছে, আপনি যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের বাইরে গিয়ে নির্মো’হভাবে কথা বলবেন তখন আপনাকে এরকম আ’ক্রমনের শি’কার হতে হবে। বয়সে যারা তরুণ তারা এরকম সমালোচনায় ঘা’বড়ে যায়। এক সময় মনে হতে থাকে- আসলেই কি সে ইসলাম বিদ্বে’ষী, আসলেই কি সে অন্যা’য্যভাবে সংখ্যালঘুদের হয়ে কথা বলছে, যখন প্রগতিশীল দাবীদাররা লাগাতার মিথ্যাচারে একটা মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে চালায়- তার বিপরীত স্রোতে গিয়ে আসল সত্য বলাটা মানে সব পক্ষকে ক্ষ্যা’পিয়ে তোলা। ইসলামিকদের সমালোচনা, পিনিক ভট্টচার্যের কাছ থেকে ‘শিবসে’না’ খেতাব পাওয়া আমার জন্য কিছু নয়, আমার প্রেরণা বাংলাদেশী প্রগতিশীল (মুসলমান)দের তেলে-বেগুনে জ্ব’লে উঠা দেখে। আমার লেখায় সলিমুল্লাহ-কলিমুল্লাহদের গোমর ভাঙ্গছে…।

সুষুপ্ত পাঠক: ব্লগার।