প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “৯৯ ভাগ মানুষের তালেবানী শাসন গণতন্ত্র হতে পারে?”

“৯৯ ভাগ মানুষের তালেবানী শাসন গণতন্ত্র হতে পারে?”

সুষুপ্ত পাঠক

55

*বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষ শরীয়া আইন বা শাসন চান। স’হিংস উ’গ্রবাদবিষয়ক গবেষকদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ‘রিজলভ’ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের মতামত নিয়ে একটা জরিপ চালায় যেখানে জনগণ নিজেদের জন্য শরীয়া শাসন চায় বলে জানিয়েছিলো। জরিপের ফলাফলের উপর প্রবন্ধ লিখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিকস অ্যান্ড গভর্নমেন্টের বাংলাদেশী অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

*আলী রীয়াজের জ’ঙ্গিবাদের উপর প্রচুর লেখা আছে যেখানে তিনি মুসলমানদের জ’ঙ্গি হওয়ার জন্য আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদকেই দায়ী করেছেন। জ’ঙ্গিবাদের পিছনে ইসলাম ধর্মকে তিনি দায়ী করতে চান না। কথাটা এ জন্য বললাম কারণ জরিপের ফলাফলকে ইহুদী-নাসারাদের ষ’ড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না কারণ এরকম জরিপের সঙ্গে আলী রীয়াজ সম্পৃক্ত রয়েছেন। প্রথম আলোতে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এই জরিপের ফলাফল নিয়ে যে নিউজ ছাপা হয়েছিলো।

*না, এই জরিপের কথা বলার জন্য এই লেখা নয়। আমি আসলে বলতে এসেছি, এই যে একদল ‘গণভোটবাদী’ ইদানিং বের হয়েছে যারা যে কোন কিছুর উপর জনগণের মতামত নিতে গণভোটের আয়োজনের কথা বলেন। ইনারা আবার সবাই গণতন্ত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যদি গণতন্ত্র ও অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যা চাইবে সেটাই মেনে নিতে হবে। এই লোকগুলো হয় দুই শ্রেণীর, সাধারণ বোকাচিন্তাধারী, দুই- ফ্রড!

*কারণ গণতন্ত্র কখনই নিজের বি’নাশের ভার সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের উপর ছেড়ে দিবে না। যেমন গণতন্ত্র এমন কোন রাজনীতিকে এলাও করবে না যে ঘোষণা দিবে তারা ক্ষমতায় আসতে পারলে গণতন্ত্রকে হ’ত্যা করবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাও কখনই এমন কিছুকে সমর্থন করে না যা অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হ’ত্যা করে। যেমন ইমাম খোমিনি যখন ইরানে নারীদের অবাধ চলাচলের বিরুদ্ধে তার বাক স্বাধীনতা চালাচ্ছিল এবং ঘোষণা করছিলো অচিরে ইরানে নারীদের ইসলামী শরীয়াতে বাধ্য করা হবে- সেটা কোন শ্রেণীর বাক স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে?

*গণতন্ত্র বলতে মানুষ হ’ত্যা, সম্প্রদায়ের প্রতি জেনো’সাইড, নারীদের প্রতি স’হিংস হয়ে উঠার মত মতবাদ প্রচারের অবাধ সুযোগ বুঝায় না। যে কারণে পৃথিবীর সব সুস্থ গণতান্ত্রিক দেশে ন্যাৎসি’বাদ নি’ষিদ্ধ। ‘আমি তোমার সঙ্গে একমত নই তাই বলে কেউ যদি তোমার কন্ঠরো’ধ করতে আসে আমি তার টুটি চেপে ধরব’- এই আপ্তবাক্য কি একটি জাতিগোষ্ঠিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া মতবাদীদের পক্ষে বলা হয়েছে? এক সময় সাদা চামড়ার মানুষ আফ্রিকার কালো মানুষদের ধরে এনে দা’স বানিয়ে বিক্রি করত। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাদারা কালোদের দা’স করে রাখাকে সমর্থন করত। দাস প্রথা উঠিয়ে নিতে কেউ গণভোট আয়োজন করেনি।

*গণতন্ত্রের সঙ্গে ‘গণভোট’ জুড়ে দেয় ধা’ন্দাবাজরা যারা গণতন্ত্রের ছাতার নিচে থেকে প্রতিক্রিয়াশীল গু’টির চাল দেয়। বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষ শরীয়া চায় বলেই কি সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে? তাদের মতামতকে সন্মান জানাতে হবে? শরীয়া শাসনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে সন্মান জানাতে হলে দেশের ১১ শতাংশ অমুসলিম নাগরিককে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে অসন্মানের বিষয়টা এইসব ‘সন্মানবাদীরা’ কিভাবে মিটাবেন?

*কোন দেশের ৯৯ ভাগ মানুষ তালেবানী শাসন চাইলেই সেটা গণতন্ত্র বলে মানতে হবে? আপনি কি মনে করেন যে লোক প্রকাশ্যে মাইকে বলে, মহিলারা যখন ঘর ছেড়ে বাইরে বের হয় তখন তাদের সাথে সাথে শয়তান অনুসরণ করতে থাকে। সকল অনি’ষ্টের জন্য মহিলারাই দায়ী তাই তাদের ঘরের ভেতর থাকাই শ্রেয়’- এরকম মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি দিনরাত চিল্লান, তাকে বাক স্বাধীনতা বলে? আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, নবী কিংবা দেবতাতে বিশ্বাস করে, ময়ূরপঙ্খি, শাকচুন্নি, মামদোভূত, ড্রাগন, ডানাওয়ালা ঘোড়া- আপনার এই বিশ্বাস নিয়ে কোন কথা নেই। আপনার এই স্বাধীনতা আছে বিশ্বাস করার। যেমন আছে এগুলো অবিশ্বাস করার। কিন্তু আপনার কখনই কোন জাতি গোষ্ঠিকে শৃঙ্খলিত করার স্বাধীনতা নেই। আপনি নারীদের তু’চ্ছ মনে করেন পুরুষ থেকে- এমন মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি কালোদের নিগ্রো কিংবা কাইল্লা বলার বাক স্বাধীনতা রাখেন না। যদি না রাখেন তাহলে সেরকম প্রতিক্রিয়াশীল কোন মতবাদের অনুরাগীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই কেমন করে বৈধতা পাবে?

*স্পষ্ট করে শুনুন, জাকির নায়েকের কোন বাক স্বাধীনতা নেই। তাকে মালয়েশিয়ার সাতটি রাজ্য কথা বলতে নি’ষেধ করে দিয়েছে কারণ জাকির নায়েক যে মতবাদ প্রচার করেন তা বাক স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে না। আরে স্পষ্ট করে শুনুন, কুরআনের অনেকগুলো চ্যাপ্টার পুরোপুরি উঠিয়ে নিতে হবে কারণ এগুলোতে সরাসরি জাতি গোষ্ঠিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার আহ্বান করা হয়েছে। অমুসলিমদের মুসলিমদের চাইতে হীন, নারীদের প্রতি বৈ’ষম্য করার জন্য কুরআন ও হাদিসের প্রকাশনা বাতিল করা প্রয়োজন। যদি ন্যা’ৎসি প্রকাশনা বা’তিল হয় তাহলে কুরআন, বাইবেল, বেদের জাতি সম্প্রদায় ও নারীদের প্রতি চরম ঘৃ’ণ্য বি’দ্বেষের লেখাগুলো কেন বা’তিল হবে না?

*মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের ফ্রডরা চিরকাল বিভ্রা’ন্ত করেছে। পাকিস্তান গঠন করতে গণভোট করা হয়েছিলো। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা ভোট দিয়েছিলো পাকিস্তানের পক্ষে। যে ভোট জিতলে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দেশ ছাড়তে হবে- এরকম কোন সিদ্ধান্ত কেমন করে গণভোটের মাধ্যমে নেয়া সম্ভব? যদি একটি লোকেরও নিজ জন্মভূমি হারানোর কোন শংকা থাকে তাহলেই এরকম দেশভাগের সিদ্ধান্ত বাতিল করা উচিত সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশছাড়া হয়েছে গণভোটে…। গণভোট দিলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জামানত হারাতেন আর বিধবাবিবাহ লক্ষ লক্ষ হিন্দুর ভোট পেয়ে জিতে যেতো। আপনারা কি এমন কোন গণভোট দিতে চাইবেন যেখানে আপনাদের নিরাপদ আশ্রয় হারাবেন? প্রবাসে আমাদের বঙ্গভাষীরা যদি এমন কোন গণভোটের সম্মুখিন হন যেখানে তাদের সেদেশ থেকে বের করে দেয়া সিদ্ধান্ত হবে, মনে করেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয়নারা চান আপনাদের বের করে দিতে, আপনারা কি এই অমানবিক সিদ্ধান্তকে কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ জো’রে জিতে যাওয়াকে সন্মান জানাবেন?

*আমাদের মানবিক হতে হবে মানুষের জন্যই। আর এ কারণেই যারা মানুষের মাঝে বি’ভেদ হিং’সা জারি রাখে তাদের নিয়’ন্ত্রণ করতে আমাদের মাঝে মাঝে কঠর হতে হবে। পিস টিভি ব’ন্ধ করা উচিত কিনা এই প্রশ্নটা জটিল নয়। ‘গড’ নামের খ্রিস্টান টিভিতে কোন অখ্রিস্টানদের প্রতি ঘৃ’ণা বি’বাদ প্রচার হয়নি বা সেটা দেখে কেউ হলি আর্টিজেন ঘটায়নি। কাজেই ইসলাম প্রচারের টিভি চ্যানেল থাকা গণতান্ত্রিক অধিকার কিন্তু পিসের মত মডারেট জ’ঙ্গি তৈরির চ্যানেল ব্যান করতেই হয়। সেটাই ঘটেছে দেশে দেশে। আমাদের মানবিক হতে গিয়ে কেউ কেউ আতেঁল হয়ে যাচ্ছি কিনা সেটা মনে হয় মাঝে মাঝে আত্মসমালোচনা করে সংশোধন করা উচিত…।