প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত “ঈমাম বোখারিকে বা’তিল করলে জাকির নায়েক মুমিন থাকেন না”

“ঈমাম বোখারিকে বা’তিল করলে জাকির নায়েক মুমিন থাকেন না”

কায়সার আহমেদ

159

*একলক্ষ জাকের নায়েককে জোড়া দিলেও একজন ঈমাম বোখারির সমান ‘মুমিন’ কেউ হবে না। এরপরেও কিছু ত্যানা’বাজ ‘চুনো’পুটি’ মুমিন ইদানিং ঈমাম বোখারীকে তিনাদের সুবিধামতো ‘মিথ্যু’ক’ বলার দুঃসা’হস দেখাচ্ছেন। তিনাদের যুক্তি হচ্ছে, ঈমাম বোখারী হাদিস সংকলন করেছেন নবী মৃ’ত্যুর কমপক্ষে দুইশ বছর পরে। তাই যেসব ‘সহীহ’ হাদিসে আজ মুমিনদের লুঙ্গি খু’লে যাচ্ছে, সেগুলো শুনলেই তিনারা এসব যুক্তি প্রসব করেন। আবার বোখারির যেসব হাদিসে লুঙ্গির গিট্টু ঠিক থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বোখারী একজন ‘শ্রেষ্ট ঈমাম’?

*প্রশ্ন হলো, নবী মৃ’ত্যুর দুইশ বছর পরের যুক্তিতে যদি বোখারির ২০ পার্সেন্ট হাদীসকেও আপনারা ‘মিথ্যা’ বলতে চান! তাহলে চৌদ্দশো বছর পরের এসব ‘দুইনম্বরি’ মুমিনদের তথ্যগুলো ৯৯ পার্সেন্ট ‘মিথ্যা’ হওয়ারই কথা? কারণ আপনারা কথা বলেন আধুনিক যুগের ভ’ণ্ড ‘মডারেট’ প্র’তারক, ধর্ম ব্যবসায়ী জাকের নায়কদের ফলো করে। কিন্তু ঈমাম বোখারীরা কোনো ভ’ণ্ডকে ফলো করে হাদিস লিখেন নি। কারণ, এরা ছিলেন ইসলামের মূল ‘দলিল’ এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুমিনদের তালিকাভুক্ত ইসলামিক স্কলার। ফাইজলামী আর ত্যানাবা’জিরও একটা সীমা থাকা দরকার।

*আরবের পৌত্তলিকদের মধ্যেও ‘হজ্ব প্রথা’ চালু ছিল

*আরবের পৌত্তলিকদের মধ্যেও ‘হজ্ব প্রথা’ চালু ছিল। এরা দূর-দূরান্ত থেকে দলবেঁধে নিজ গোত্রীয়দের সাথে মক্কায় হজ্ব করতে আসতো। এরা কাবা ঘরের ভিতরে রক্ষিত তাদের ৩৬০টি পৌত্তলিক দেব-দেবীর মূর্তির পূজা করতো। মুসলমান হাজীরা আজকে যেরকম কাবা ঘরকে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। আরবের পেগানরাও ঠিক সেইভাবে কাবাঘর প্রদক্ষিণ করতো। ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা কালো পাথরকে কুরাইশ পৌত্তলিকরাও চুমু খেত।

*প্রশ্ন হলো, কাবাঘরের ৩৬০টি পেগান মূর্তিকে নবী মুহম্মদ ভে’ঙে গু’ড়িয়ে দিয়ে ইসলামকে একমাত্র ‘সঠিক’ ধর্ম হিসাবে মক্কা মদিনায় প্রতিষ্ঠা করেন। তাহলে পেগানদের প্রচলিত ধর্মীয় রীতির অনেকটাই তিনি নিজ ধর্মের জন্য ‘ধা’র’ করলেন কোন যুক্তিতে? পৌত্তলিকরা যে তরিকায় ‘রিচুয়াল’ পালন করতো দেব-দেবীকে খুশি করতে। ইসলামের নবী আল্লাহকে ‘সন্তুষ্ট’ করতে অনুরূপ রিচুয়ালের বেশির ভাগই রেখে দিলেন নিজ উম্মতদের জন্য? তবে কি পেগানদের দেবতা হুবাল, লাত, মানাত, উজ্জা- এরা সঠিক ছিল? এবং নবী মুহম্মদ ছিলেন তাদের থেকেই ‘ধার করা’ আরেক নতুন ‘আল্লাহ’র স্রষ্টা? জ্ঞানের কুমির মুমিনরা এই ব্যাপারে কি বলেন?

*সূরা আত-তাহরীম, প্রথম পাঁচ আয়াতের পিছনের ঘটনা

*নবীজির প্রিয় দা’সী মারিয়া কিবতিয়াকে নিয়ে ওমরের মেয়ে বিবি হাফসার বিছানায় নবী সহ’বত করার পরে আল্লাহ্পাক সূরা আত-তাহরীমে প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল করেন। এই ঘটনাটি রসূলের বিবিদের মধ্যে চরম ক্ষো’ভ এবং অশা’ন্তির জন্ম দেয়। ঘটনার দিন, বিবি হাফসার সাথে রসূলের মিলিত হওয়ার পালা ছিল। কিন্তু রসূল বিবি হাফসাকে তার পিতা ওমর ডেকেছেন বলে কৌশলে বাপের বাড়ি পাঠান। হাফসা বাপের কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন নবী ‘চালা’কি’ করে তাকে সেখানে পাঠিয়েছেন। তাই দেরি না করে হাফসা নিজের ঘরে ফেরত এসে নিজের বিছানায় দাসী মারিয়ার সাথে নবীকে ‘গো’পন কর্মে’ ধ’রে ফেলেন। হাফসা তখন চিৎকার করে বলেন, “শেষপর্যন্ত আমার বিছানায়? আমার বিছানায়?”

*রসূলের সকল বিবির মধ্যে আবুবকরের মেয়ে আয়শা এবং ওমরের মেয়ে হাফসা সঙ্গত কারণেই খুব প্রভা’বশালী ছিলেন। তাই নিম্ন মর্যাদার একজন দা’সীকে হাফসা নিজের বিছানায় স্বামীর সাথে দেখে খুব অপমা’নিত বোধ করেন। এতে নবীজি মারিয়াকে ‘হারাম’ করে করে দেন বিষয়টি আয়শাকে না জানানোর শর্তে। সূরা তাহরীমের এই আয়াতগুলোর পিছনে এটাই ছিল মূল ঘটনা। আয়াতগুলো খুব মনোযোগ সহকারে প্রথমে পড়ুন:

*১. হে নবী, আল্লাহ আপনার জন্যে যা হালাল করছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে খুশী করার জন্যে তা নিজের জন্যে হা’রাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।
২. আল্লাহ তোমাদের জন্যে কসম থেকে অব্যহতি লাভের উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাদের মালিক। তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

*৩. যখন নবী তাঁর একজন স্ত্রীর কাছে একটি কথা গোপনে বললেন, অতঃপর স্ত্রী যখন তা বলে দিল এবং আল্লাহ নবীকে তা জানিয়ে দিলেন, তখন নবী সে বিষয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন এবং কিছু বললেন না। নবী যখন তা স্ত্রীকে বললেন, তখন স্ত্রী বললেন: কে আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করল? নবী বললেন, যিনি সর্বজ্ঞ, ওয়াকিফহাল, তিনি আমাকে অবহিত করেছেন।
৪. তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁ’কে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বি’রুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখ আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তুত ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী।

*৫. যদি নবী তোমাদের সকলকে পরি’ত্যাগ করেন, তবে সম্ভবত তাঁর পালনকর্তা তাঁকে পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, এবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী।
ব্যাখ্যা: (কাসীর, আব্বাস, জালালাইন প্রমুখ শ্রেষ্ঠ তাফসীরকারকদের ব্যখ্যার সারসংক্ষেপ নিচে)-

*১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নবীকে বলছেন, দাসী মারিয়া কিবতিয়াকে যেহেতু নবীর জন্য ‘হালাল’ করা হয়েছে, তাহলে তিনি স্ত্রীদের ভয়ে সেই ‘হালাল’ জিনিষকে ‘হারাম’ করছেন কেন? অর্থাৎ নবীজি হাফসার বিছানায় সহবত অবস্থায় দেখার পরে হাফসাকে ‘কসম’ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, বিবি আয়শাকে যেন ঘটনাটি হাফসা না বলেন। প্রয়োজনে তিনি (নবী) দাসী মারিয়াকে তার জন্য ‘হারাম’ করে দিবেন। তাই আল্লাহ এই আয়াত দিলেন নবীকে মৃদু শাসনের সুরে। যাতে তিনি দাসী মারিয়ার ভো’গ সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চি’ত না রাখেন।

*২ নন্বর আয়াতে আল্লাহ নবীকে ‘কসম’ ভ’ঙ্গ করে নিজের অধিকারের ‘হালাল’ বস্তুকে ফেরত পেতে অসুবিধা নেই- এই ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ মারিয়া কিবতিয়াকে ভো’গ না করার যে ‘কসম’ নবী স্ত্রী হাফসাকে দিয়েছেন, সেটি ভ’ঙ্গ করলে দোষের কিছু নেই- এটাই এই আয়াতের বক্তব্য। অর্থাৎ এক্ষেত্রে নবীর কসম ভ’ঙ্গের ব্যাপারটিকে আল্লাহ ক্ষমা সুন্দর ভাবেই নিয়েছেন- এটাই আয়াতের মূলকথা।

*৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা হচ্ছে, বিবি হাফসা নবীর ‘কসম’ খাওয়ার ঘটনাটি ঠিকই আয়শাকে বলে দেন। নবী সেটা টের পেয়ে পুনরায় হাফসাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি বিষয়টি আইশার কাছে গো’পন করলে না কেন? হাফসা বলেন, আপনি জানলেন কেমনে যে আমি আয়শাকে বিষয়টি বলে দিয়েছি? নবী বললেন, আল্লাহ আমাকে ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন। কারণ আমি আল্লাহর রসূল। এটাই এই এই আয়াতের ফ্যাক্ট।

*৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নবীর দুইবিবি হাফসা এবং আয়শাকে হু’মকি দিচ্ছেন ‘তওবা’ করার জন্য এবং নবীর পক্ষে তিনি (আল্লাহ), জিব্রাইল, সৎকর্মশীল মুমিনরা এবং আসমানের ফেরেস্তারাও আছেন বলেও নবীর বিবিদের ভ’য় দেখাচ্ছেন।

*৫. নম্বর আয়াতে আল্লাহ্পাক সরাসরি নবীর বিবিদের পরিষ্কার হু’কুম দিলেন যে, যদি তারা নবীর (দাসীকে বিছানায় নেওয়ার) ঘটনাটি নিয়ে বেশি অশা’ন্তি করে, এতে নবী সকল স্ত্রীকে পরি’ত্যাগ করলেও নবীর পালনকর্তা (আল্লাহ) তাকে আরো বেশি উত্তম, আ’জ্ঞাবহ, পরহেজগার, অকুমারী ও কুমারী স্ত্রী উপহার দিবেন।

*সূরা তাহরীমের এই আয়াতগুলোর পিছনের প্রেক্ষাপট, কারণ এবং ব্যাখ্যার রেফারেন্স নিদৃষ্ট কোনো একক লিংক এর মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয়। এরজন্য আপনাদেরকে তাফসীর ইবনে কাসীর, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীর ইবনে আব্বাস, তাফসীরে তাবারী, সীরাত ইবনে ইসহাক এবং বোখারী, মুসলিমের অনেকগুলো হাদিস পড়তে হবে।

*অবশ্য, পরবর্তীতে কিছু ‘দুইনম্বরি’ মুমিন নবীজির লুঙ্গি বাঁচাতে এই ঘটনাকে হাফসার ঘরে নবীর দাসী মারিয়ার সঙ্গে ‘যৌ’ন সঙ্গ’মের’ পরিবর্তে “মধু খা’ওয়ার” মিথ্যা কাহিনি রচনা করেছেন। আমি কমপক্ষে ২০টি ‘সহীহ’ অথেন্টিক দলিল স্টাডি করেই ‘সত্য’ ঘটনাটির সারাংশ এখানে তুলে ধরেছি মাত্র। শুধুমাত্র সূরা তাহরীমের এই পাঁচটি আয়াতকে একশভাগ ‘পোস্টমর্টেম’ করলেই ধরা পড়ে যায় কোরান লেখার মূল গো’পন ‘রহস্য’ এবং একই সাথে পরিষ্কার হয়ে উঠে, একজন ধূ’র্ত লোকের কতোবড় ‘প্রতা’রণা’র ভিতর দিয়েই টিকে আছে গত চৌদ্দশো বছর ধরে একটি মিথ্যা আর ধোঁকাবা’জির ‘বিশ্বাস’।

কায়সার আহমেদ: প্রবাসী লেখক।

…………………………………………………………………………………….

মুক্ত মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত ও মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। shompadak.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে shompadak.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।